পাপিয়ার ধর্মবোন কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে জেলার ফারহানা আক্তারের দুর্ণীতি

গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে বাংলাদেশ যুব মহিলা লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী শামীমা নুর পাপিয়াকে কারাগারে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ মাদক সরবরাহ ও কারাবিধি বহির্ভূত সব রকম অবৈধ সুবিধাদানকারী জেলার ফারহানা আক্তার বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
বহাল আছেন জেলার ফারহানার অবৈধ কর্মকান্ডের সহযোগী ডেপুটি জেলার তাইয়্যেবা, মেট্টন, ফাতেমা, কারা গোয়েন্দা সাদিয়া ও নাসিমা। মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার লোভে পাপিয়ার সাথে ধর্ম বোনের সম্পর্ক গড়ে তোলেন জেলার ফারহানা। এতে করে ফারহানা কারাগারে কেস টেবিলের দায়িত্ব দেন শামীমা নূর পাপিয়াকে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাপিয়া বন্দীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করতে থাকেন। নতুন বন্দী কারাগারে আসা মাত্র পাপিয়ার চাহিদা মতো মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করতেন পাপিয়া।
পাপিয়ার সর্বনিম্ন টার্গেট ছিল ৭০ হাজার টাকা। চহিদাকৃত টাকা দিতে অস্বীকার করলেই বন্দীকে বেধড়ক পেটাত পাপিয়া। একদিকে পাপিয়া থেকে মাসে মোটা অঙ্কের টাকা উৎকোচ পান জেলার ফারহানা, অপরদিকে জেলার এবং পাপিয়া ধর্মবোন পাতিয়েছেন সেখানে সাধারণ বন্দীদের বিচার চাওয়া পাওয়ার সুযোগ আকাশ কুসুম মনে করেন বন্দীরা। সূত্র জানায়, জেলার ফারহানা প্রতিমাসে পাপিয়া থেকে ১২ লক্ষ টাকা ঘুষ গ্রহণ করতেন।
পাপিয়া ডিভিশন না পেলেও জেলার ফারহানা আক্তার পাপিয়াকে ডিভিশনের সকল সুবিধা দিয়েছেন। রাজনীগন্ধার-২ দ্বিতীয়তলায় থাকতেন পাপিয়া। নিজের রুম বিলাসবহলভাবে সাজিয়ে নিয়েছেন পাপিয়া। রাত দশটা পর্যন্ত লকাপের বাইরে থাকতেন পাপিয়া। জেলার ফারহানা ধর্মবোন পাপিয়াকে জেল সুপারের সাথে প্রেম করার সুযোগ করে দেন। যাতে করে কারাগারের সুবিধা দিতে আর কোন বাধা না থাকে।
সুপারের সাথে পাপিয়ার প্রেম বিষয়টি মহিলা কারাগারের সবারই জানা। শুধু তাই নয় ধর্ম বোন জেলার ফারহানা আক্তারকে একটি ব্যক্তিগত গাড়িও উপহার দিয়েছেন পাপিয়া। রুনা লায়লাকে মারধরের ঘটনার পর গাড়িটি তিনি আর সামনে আনছেন না। পাপিয়া থেকে যে টাকা ঘুষ নিতেন জেলার ফারহানা তা থেকে একটি ভাগ অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেওয়ার কারণেই বহাল আছেন জেলার ফারহানা আক্তার।
জেলার ফারহানা আক্তার, জান্নাতুল তাইয়্যেবা, মেট্টন ফাতেমা আক্তার, পিআইউ সাদিয়া, নাসিমা, মঞ্জ য়ারা, ক্যান্টিণ ম্যানেজার মার্জিয়া পাপিয়ার টাকায় রাতারাতি অনেক টাকার মালিক বনেছেন। মার্জিয়া প্রতিকেজি আম ৫শ’ টাকা ইলিশ ৪ হাজার টাকা কেজি, গরুর গোস্ত ২৬শ’ টাকা কেজি,মুরগী ১৬শ’ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে সে টাকা বড় অংশ জেলারকে দিয়েছেন বলে কারা সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, শিক্ষানবীশ আইনজীবী রুনা লায়লাকে কারাগারের সাধারণ ওয়ার্ডে নেওয়ার পর রুনার দেহ তল্লাশি করে কর্তব্যরত মেট্রন তাঁর কাছে ৭ হাজার ৪০০ টাকা পান। ওই টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য গত ১৯ জুন জেলার ফারহানার নির্দেশে পাপিয়া, ডেপুটি জেলার জান্নাতুল তাইয়্যেবা, মেট্টন ফাতেমা আক্তার, প্রিজন্স ইন্টিলিজেন্ট ইউনিট (পিআইইউ) সদস্য সাদিয়া ও নাসিমা মিলে শিক্ষানবিশ আইনজীবী রুনা লায়লাকে নগ্ন করে পিটিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে ফেলে রাখা হয়। হাসপাতালের বেডে সংবাদ মাধ্যমকে এসব তথ্য জানান, ভুক্তভোগী রুনা লায়লা। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে মহিলা কারাগারে অনিয়ম ও দুর্ণীতি বহিঃপ্রকাশ ঘটে ।
এ ঘটনা ধামাচাপা দিতে জেলার ফারহানা পাপিয়ার কাছে ২ কোটি টাকা দাবি করেন। এরমধ্যে পাপিয়া ৫০ লাখ টাকা জেলার ফারহানাকে দিয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। সূত্র জানায়, পাপিয়া কোর্ট থেকে আসার পর মাদক ভর্তি ব্যাগ জেলার ফারহানা আক্তারের রুমে রেখে পাপিয়া কারাগারে ঢুকে যেতেন। এরমধ্যে দায়িত্বরত কারারক্ষী ব্যাগ চেক করতে আসলে জেলার ফারহানা আক্তার বলতেন, “ এখন আমি বাথরুমে যাচ্ছি আমি এসে নিই এরপর চেক করো।” এরপর কারারক্ষীকে তাড়িয়ে দিয়ে সুবিধামতো সময়ে জেলার ফারহানা আক্তারের বিশ্বস্থ মেট্টন ফাতেমা আক্তার, পিআইইউ সদস্য সাদিয়া, নাসিমা এবং পাপিয়ার বিশ্বস্থ হাজতী রুক্সির মাধ্যমে পাপিয়ার রুমে পাঠানো হতো মাদকভর্তি ব্যাগ।
এসব সুবিধার বিনিময়ে জেলার ফারহানা আক্তার তার ধর্মবোন পাপিয়ার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে এসব সুবিধা নিয়েছেন। রুনা লায়লাকে নির্যাতনের ঘটনা তদন্ত করে কারা অধিদপ্তর। ওই তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকেই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবে কারা অধিদপ্তর। ছয়জনকে বদলি করা হলেও প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে কোন রকম ব্যবস্থা নেয়নি কারা অধিদপ্তর। বরং যারা এ ঘটনার ধারে কাছে নেই এমন ছয়জনকে কারা অধিদপ্তর গত রোববার কারারক্ষী মোছা. আলেয়া চৌধুরীকে লক্ষীপুর জেলা কারাগারে, শাম্মী আক্তারকে সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারে, মোছা. সোহেলা আক্তারকে ঝালকাঠি জেলা কারাগারে, সেলিনা আক্তারকে শেরপুর জেলা কারাগারে, ঝর্ণা আক্তারকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারাগারে এবং লাকী খাতুনকে কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারে বদলি করা হয়েছে।
অথচ বহাল তবিয়তে আছে পাপিয়াকে অবৈধ সুবিধাদানকারী জেলার ফারহানা আক্তারের সিন্ডিকেট। এই ছয় কারারক্ষীর কেউই মাদকের সাথে জড়িত নয়।শুধুমাত্র পাপিয়াকে অবৈধ সুবিধা দেওয়ার বিপক্ষে থাকার কারণে পাপিয়ার ঘটনা তারাই জেলখানার বাইরে প্রচার করেছে মনে করে তাদের উপর ক্ষুব্ধ হন কারা কর্তৃপক্ষ। আর এ ক্ষোভের বহিপ্রকাশ হিসেবে তাদের বদলি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। উল্লেখিত অভিযোগ সম্পর্কে জেলার ফারহানা আক্তারের সাথে কথা বললে তিনি এসব বিষয় না লিখার অনুরোধ করে। পরবর্তীতে আবারও ফোন করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অন্য এক সূত্র জানায়, কুমিল্লা কারাগারে পাপিয়াকে ঝাড়ুদারের কাজ দিলেও তিনি তা করছেন না । উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মফিজুর রহমান ও পাপিয়া দম্পতিকে আটক করা হয়। অস্ত্র আইনের মামলায় পাপিয়া ও তাঁর স্বামীকে ২৭ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। এই সিন্ডিকেটের মধ্যে পাপিয়াকে কারাগারে মাদক সরবরাহের অভিযোগে একই সাথে পাপিয়াকে অবৈধ সুবিধাদানের এবং শিক্ষানবীস আইনজীবী রুনা লায়লাকে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আরো পাঁচ কারা রক্ষীকে বদলি করা হয়েছে।
এদের মধ্যে শাম্মী আক্তারকে সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারে, মোছা. সোহেলা আক্তারকে ঝালকাঠি জেলা কারাগারে, সেলিনা আক্তারকে শেরপুর জেলা কারাগারে, ঝর্ণা আক্তারকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারাগারে এবং লাকী খাতুনকে কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারে বদলি করা হয়েছে। সূত্র জানায়, পাপিয়া কারাগারে অবৈধ সুবিধা করতেন দিতেন কিছু অসাধু কারারক্ষী।
তাঁদের মধ্যে অন্তত ছয়জনকে আজ রোববার তাৎক্ষণিক বদলির আদেশ দিয়েছে কারা অধিদপ্তর। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘কারাগারে পাপিয়াকে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ মাদক সাপ্লাই দিতেন কিছু অসাধু কারারক্ষী। তাঁদের মধ্যে এই ছয়জন অন্যতম। বিষয়টি কারা অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিরাও জানতেন। পাপিয়াকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তরের পর এবার এই ছয়জনকেও তাৎক্ষণিক বদলি করা হলো।’ এর আগে ৩ জুলাই এক কারাবন্দীকে নির্যাতন করার অভিযোগে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কারাবন্দী শামীমা নুর পাপিয়াকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।
