ফ্যাসিস্টের দোসর ডিপিডিসি’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল মজিদ এখন বিএনপি সেজে চালাচ্ছে লুটপাট

ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল মজিদকে ঘিরে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ, গুঞ্জন ও বিতর্ক ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। এক সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী ঘরানার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তাকে নিয়ে এখন প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন স্তরে উঠছে গুরুতর অভিযোগ।
রাজনৈতিক তোষণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রভাব খাটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ আঁকড়ে রাখা, বিতর্কিত ফেসবুক পেজের মাধ্যমে অপপ্রচার চালানো এবং রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রের আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন এই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী।
বিগত সরকারের পুরো সময়জুড়ে মো. আব্দুল মজিদ ছিলেন প্রভাবশালী মহলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন কর্মকর্তা। বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও রাজনৈতিক আয়োজনে অতিরিক্ত সক্রিয়তা দেখিয়ে তিনি তৎকালীন ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর আস্থাভাজনে পরিণত হন। অভিযোগ রয়েছে, ১৫ আগস্টের অনুষ্ঠানগুলোতে আবেগঘন ভাষণ, স্বরচিত কবিতা পাঠ এবং শেখ হাসিনা ও শেখ রাসেলের জন্মদিনে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নিয়ে তিনি রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রকাশ ঘটাতেন। বিনিময়ে বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও প্রভাবশালী দপ্তর নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রকৌশলীরা জানান, আব্দুল মজিদ ছিলেন ফ্যাসিস্ট দোষর আর ভোল পাল্টে এখন হয়ে গেলেন বিএনপি। এরইমধ্যে প্রকৌশলী মো. আব্দুল মজিদ নিজেকে বিএনপি’র একনিষ্ঠ বলে জাহির করতে শুরু করেছেন।
প্রকৌশলীরা অভিযোগ করে বলেন, যে সব প্রকৌশলীরা মজিদ বিরুদ্ধে সমালোচনা করলেই তাদের বিরুদ্ধে কুরুচি পূর্ণ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ফেজবুক পেজে চরিত্র হনন করে পোস্ট দেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা ও প্রকৌশলী অভিযোগ করেন, মো. আব্দুল মজিদ অত্যন্ত কৌশলী ও প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সবকিছু “ম্যানেজ” করতে সিদ্ধহস্ত। তাদের ভাষায়, “তিনি এমনভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন যেন কিছুই ঘটেনি। মুহূর্তের মধ্যে বিতর্ক চাপা দেওয়া, অবস্থান বদলানো কিংবা নতুন বলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা তার পুরোনো অভ্যাস।”
অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি নিজের অবস্থান বদলে ফেলেন তিনি। এক সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি, নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছবি এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার নানা পোস্টে সরব থাকলেও বর্তমানে সেসব পোস্ট ও ছবি রহস্যজনকভাবে উধাও। এখন তার ফেসবুক টাইমলাইনে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পোস্ট বেশি দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন ডিপিডিসির একাধিক কর্মকর্তা। তার ফেসবুক পুরনো পোস্টসহ নানা অনিয়মের তথ্য দিয়ে প্রকৌশলীদের সাক্ষরিত একটি আবেদন জমা দিয়েছেন দুর্নীতি দমন কমিশনে।
অভিযোগে বলা হয়, বর্তমানে নিজেকে বিএনপিপন্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন আব্দুল মজিদ। ডিপিডিসির নারায়ণগঞ্জ জোনের কয়েকজন কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে তিনি নতুন রাজনৈতিক বলয়ে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভ্যন্তরীণভাবে গুঞ্জন রয়েছে। একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ডিপিডিসিতে কি আর দক্ষ বা সৎ প্রকৌশলী নেই? কেন বারবার একই ব্যক্তিকে ঘিরেই প্রচারণা চালানো হয়? বিতর্কিত পেজে নিয়মিত গুণকীর্তন হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হয়েছে।”
যদিও এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল মজিদ। তিনি বলেন, “আমি ওই ফেসবুক পেজের সঙ্গে জড়িত নই। শুধু কয়েকটি পোস্টে মন্তব্য করেছি। এ কারণেই হয়তো অনেকে সন্দেহ করছেন।” তার বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সাফাই ওই পেজে প্রচারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার জানা নেই।” আমি শিক্ষাজীবনে ছাত্রদল করতাম। এখন কোন দল করেন এমন প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে বলেন, আমি তো ছাত্রদলেই ছিলাম।
ডিপিডিসির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানে নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছে। ফলে প্রকৃত যোগ্য, নিরপেক্ষ ও ত্যাগী কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এতে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক প্রশাসনিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা ও ক্ষোভ।
প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা বর্তমান সরকারের সংস্কার উদ্যোগের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার, তোষণনীতি ও প্রশাসনিক অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত হবে। একইসঙ্গে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় এনে ডিপিডিসিকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গ্রাহকবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে।
