স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানায় চাকরিচ্যুতি নিয়ে বিতর্ক

বরখাস্ত ২ কর্মকর্তার পুনর্বহাল আবেদন ঘিরে প্রশাসনিক অনিয়ম, আর্থিক সুবিধা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিত: মে ২১, ২০২৬ ২০:৩৫:১১

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা-এ ২০২৩ সালের সাবেক কার্যনির্বাহী কমিটির সময়ে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগে দুই কর্মকর্তাকে বরখাস্তের ঘটনাক করা হয়েছিল। বরখাস্ত হওয়া হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা নুসরাত আলম এবং স্টোর অফিসার মোঃ আলমগীর হোসেন বালী কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ কমিটির পরিবর্তন হওয়া সুবাধে তারা পুনর্বহালের আবেদন করলে বিষয়টি নিয়ে নথিপত্র পর্যালোচনায় একাধিক অসঙ্গতি উঠে আসে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০২২ সালের ১০ অক্টোবর দায়িত্ব গ্রহণের পর তৎকালীন কার্যনির্বাহী কমিটি কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিলেন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা নুসরাত আলম, যার বিরুদ্ধে দানের টাকা মানি রশিদের মাধ্যমে গ্রহন করলেও এতিমখানার ফান্ডে জমা না দেওয়া এবং স্টোর অফিসার মোঃ আলমগীর হোসেন বালী উচ্চতর পদে নিয়োগ না পেলেও উচ্চ পদে ভূয়া নিয়োগ পত্র দেখিয়ে ২০০৭ সাল হতে ২০২২ পর্যন্ত বকেয়া বেতন উত্তোলনের মাধ্যম এতিমদের অর্থ আত্মসাত ক্ষরা সবচেয়ে বেশি আলোচিত।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাবেক হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা নুসরাত আলমকে ব্যবস্থাপনা কমিটি কর্তৃক একাধিকবার ক্যাশের টাকার হিসাব বুঝিয়ে দিতে বললে তিনি পালিয়ে যান এবং কমিটি একাধিকবার নোটিশ করেও থাকে ফেরত আনা যায়নি। ২০২৩ সালের ৮ জুলাই থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে ১৭ আগস্ট সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, এ সিদ্ধান্ত কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতির অনুমোদন ছাড়াই নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অফিসিয়াল নথিপত্রে দেখা যায় উক্ত সময়ে সভাপতি পদে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক উপকমিটির সদস্য ও মেহেরপুর ১ আসনের এমপি প্রার্থী আবদুর শুকুর ইমনকে সমাজসেবা অধিদফতর হতে সুপারিশের ভিত্তিতে দায়িত্ব দেয়া হয় অথচ নিয়ম অনুযায়ী প্রতিষ্ঠাতা স্যার সলিমুল্লাহ বাহাদুরের বংশধর হতে সভাপতি হওয়ার বিধান রয়েছে। পরবর্তীতে উক্ত অবৈধ সভাপতিকে এতিমদের খাবার, শিক্ষা, বস্ত্র খরচ বন্ধ করে দেয়ার কারনে গঠনতন্ত্রের বিধান মোতাবেক কমিটির সকল সদস্য অনাস্থা প্রস্তাব আনেন এবং সাধারন সভার মাধ্যমে ইমনকে সভাপতি পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল যা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়কে লিখিত ভাবে অবহিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে সহ-সভাপতি সুমি আলমকে সর্বসম্মতিক্রমে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছিল। গঠনতন্ত্র মোতাবেক এতিমখানার অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত সাপেক্ষে এবং অডিট ফার্মের অডিটের রিপোর্টের ভিত্তিতে ৮ অক্টোবর নুসরাত আলমকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়।

এদিকে বরখাস্তকালীন সময়ে সভাপতি ইমন (বরখাস্ত কৃত) ছুটিতে ছিলেন বলে পরে দায়িত্বে ফিরে নুসরাত আলম বকেয়া বেতন-ভাতার জন্য সভাপতির কাছে আবেদন করেন। যা সাবেক সভাপতি ইমন, দুর্নীতিবাজ নুসরাত ও সমাজসেবা অধিদফতর এর কতিপয় স্বার্থান্বেষী কর্মকর্তাদের যোগসাজশে করা হয়েছে মর্মে অভিযোগ রয়েছে। কারন, সাবেক হিসাব রক্ষক নুসরাত আলম যখন মানি রশিদের প্রায় ৫৬ লক্ষ টাকা ব্যাংক একাউন্টে জমা প্রদান করেননি, ঐ সময়ে এডহক কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন শহর সমাজসেবা কার্যালয়ের ( ইউসিডি-৫) এর সমাজসেবা অফিসার মোঃ জহির উদ্দিন। জানা যায়, জহির উদ্দিনই নুসরাত আলমকে হিসাবরক্ষক পদে নিয়োগ দিয়েছেন এবং মানি রশিদের টাকা ব্যাংক একাউন্টে জমা হলো কিনা তা যাচাই করার দায়িত্ব সমাজসেবা অফিসার জহির উদ্দিনের। সুতরাং, উক্ত টাকা আত্মসাৎ এর ঘটনার সঙ্গে জহিরের সংশ্লিষ্টতা থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

এসকল অভিযোগের বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরে তদন্তের আবেদন করা হলেও তদন্তে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা মেলেনি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। যেহেতু সমাজসেবা অধিদফতর এর একাধিক অফিসার অর্থ আত্মসাতের ঘটনার সঙ্গে জড়িত বিধায় উক্ত অধিদফতর থেকে গঠিত কমিটি স্বাভাবিকভাবেই সহকর্মীদের বাঁচানোর চেষ্টা করবেন এটা স্বাভাবিক।

একই সঙ্গে এতিমখানার তত্ত্বাবধায়কের দায়ের করা মামলাও আদালতে খারিজ হয়ে যায়। কারন তত্ত্বাবধায়ক মোঃ হারুনকে এসকল সিন্ডিকেট অর্থের বিনিময়ে আদালতে সি.আর মামলায় বৈষম্য বিরোধী মামলায় নাম জড়িয়ে দেয়। এখানেই চক্রটি থেকে ছিলো না বরং এই মামলার ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে যা দেশের প্রধান পত্রিকাগুলোর শিরোনাম ছিল। পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক মোঃ হারুন কে গ্রেফতার করিয়ে কারারুদ্ধ করে রাখা হয় এবং নুসরাতের মামলায় যেনো মোঃ হারুন হাজিরা না দিতে পারে সেজন্য সকল প্রচেষ্টা সমাজসেবা অফিসার জহির, নুসরাত ও সাবেক ষ্টোর কিপার আলমগীর গং রা অব্যাহত রাখে। ফলে অর্থ আত্মসাতের মামলাটিতে বাদী মোঃ হারুন অর রশিদ হাজিরা দিতে না পারায় মামলাটি খারিজ হয় এবং দুর্নীতিবাজ গং রা দাবি করেন মামলাটি নিষ্পত্তি হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তা হয়নি এবং বর্তমান প্রশাসক আজমল হোসেন বাদী হিসেবে বর্তমান হিসাব রক্ষক মোঃ আল আমিন শাওনকে দায়িত্ব প্রদান করেন ও সিআইডি মামলাটি তদন্ত করছেন।

অন্যদিকে সমাজসেবা অধিদফতর এর দায়সারা ও প্রভাবিত তদন্তে স্টোর অফিসার মোঃ আলমগীর হোসেন বালীর চাকুরী জীবনের নথিপত্রে একাধিক পদায়ন ও গ্রেড পরিবর্তনের তথ্য উঠে এসেছে। তিনি ১৯৯৯ সালের ১৮ অক্টোবর হাউজ টিউটর পদে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে নিয়োগ আদেশ বাতিল করে তাকে অস্থায়ী ভিত্তিতে ক্যাশ সহকারী পদে নেওয়া হয় এবং ২০০১ সালে আলমগীরের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে ১১তম গ্রেডে স্থায়ীকরণ করা হয়।

পরবর্তীতে তিনি পুনরায় হাউজ টিউটর পদের বেতন স্কেল দাবি করলে তৎকালীন সম্পাদক জি.এ খান তাকে ১০ম গ্রেডে পদায়ন করেন যা সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূত। কারন পদোন্নতি ছাড়া কখনও বেতন গ্রেড পরিবর্তন হয় না, পদায়ন হচ্ছে সম-গ্রেডের অন্য পদে দায়িত্ব পালনের আদেশ। পরবর্তীতে দুর্নীতিবাজ আলমগীর সম্পূর্ন বেআইনি ও অনৈতিক ভাবে ৯ম গ্রেডে বেতন দাবি করে আবেদন করলে তৎকালীন সম্পাদক জিএ খান তাকে ৯ম গ্রেডেও পদায়ন দেখিয়ে বেতন প্রদান করেন। তবে পরবর্তীতে ওই আদেশ বিধিসম্মত নয় বিবেচনায় তা বাতিল করা হয় এবং তিনি পুনরায় ১০তম গ্রেডে বহাল থাকেন।

এরপর ২০২০ সালে তত্ত্বাবধায়ক বডি তাকে সহকারী স্টোর অফিসার পদে ১১তম গ্রেডে পদায়ন করে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসক নিয়োগের পর পূর্বের তথ্য গোপন করে তিনি পুনরায় ৯ম গ্রেডের আদেশ নেন এবং বকেয়া বেতন-ভাতা বাবদ ৬ লাখ ৯০ হাজার ৩৪ টাকা উত্তোলন করেন। এসকল কাজ নিয়ম বহির্ভূতভাবে করতে পেরেছেন কারন আলমগীর তৎকালীন সম্পাদক জিএ খানের বাসার কেয়ারটেকার ছিলেন বলে এতিমখানা সূত্রে জানা গিয়েছে।

এ ঘটনায় ২০২৩ সালে কার্যনির্বাহী কমিটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন এবং তদন্তে আলমগীরের এসকল অনিয়মের সত্যতা খুঁজে পান এবং তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কমিটি তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন এবং সাত দিনের মধ্যে অতিরিক্ত গ্রহণ করা অর্থ ফেরতের নির্দেশ দেয়। কিন্তু তিনি অর্থ ফেরত না দেওয়া ও লিখিত ব্যাখ্যা জমা না দেওয়ায় ২০২৪ সালের ৩০ মে তাকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয়।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, পুরো ঘটনায় পূর্ববর্তী ১৯৯৯-২০১২ সাল পর্যন্ত কমিটি সমূহের প্রশাসনিক দুর্বলতা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অনুমোদনবিহীন সিদ্ধান্ত এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এছাড়াও ২০২০-২০২২ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকা সমাজসেবা অধিদফতর হতে গঠিত এডহক কমিটির সদস্যদের দায়িত্বে অবহেলা ও হিসাবরক্ষক নুসরাতের যোগসাজশে এতিমদের অর্থ আত্মসাত, রাতের অন্ধকারে এতিম শিশুদের উপর নির্যাতন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী, ছোট ছোট ছাত্রদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানোর স্পর্শ কাতর বিষয় গুলোর তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা এতিমখানার সাবেক ছাত্রবৃন্দ ও এলাকাবাসর দাবি। পুনর্বহালের আবেদনকে কেন্দ্র করে এখন এতিমখানার অতীত প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নতুন করে আলোচনায় এসেছে।