গণপূর্তের তৈমুর আলম: প্রকৌশলী না ঠিকাদার?

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মে ১৩, ২০২৬ ১৫:২৯:৩৯

গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. তৈমুর আলমের প্রকৃত পরিচয় কী তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনি কী প্রকৌশলী না-কি প্রকৌশলীর নামধারী ঠিকাদার-এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে পুরো অধিদপ্তর জুড়ে। এমন অনৈতিক একজন প্রকৌশলী আগামী ডিসেম্বরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইএম শাখার সর্বোচ্চ পদধারী অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হতে যাচ্ছেন। যিনি প্রায় আট বছর এ দায়িত্বে থাকবেন।

ঢাকা রাজধানীর গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রিক্যাল–মেকানিক্যাল (ই/এম) সার্কেল–৪–এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. তৈমুর আলমকে ঘিরে একের পর এক দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে থেকে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানো এবং কোটি কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এসব অনিয়মের নেপথ্যে তার আপন ছোট ভাইয়ের সম্পৃক্ততার দাবিও তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ই/এম সার্কেল–৪–এর অধীনে পরিচালিত অধিকাংশ বড় প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে পেয়ে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৌশলী তৈমুর আলম তার প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে দরপত্রের শর্তাবলি এমনভাবে সাজাতেন যাতে তার পছন্দের বাইরে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারে। নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে তিনি মোটা অঙ্কের কমিশন নিতেন বলে দপ্তরের ভেতরেই গুঞ্জন রয়েছে।

তৈমুর আলমের দুর্নীতির বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে তার পরিবারের সদস্যদের নাম। বিশেষ করে তার ছোট ভাই অংকুরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, ভাইয়ের প্রশাসনিক পদমর্যাদাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি ঠিকাদারি কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করতেন। অনেক ক্ষেত্রে অংকুরই ঠিকাদার ও প্রকৌশলীর মধ্যে ‘মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে কাজ করতেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।

সরকারি বদলি নীতিকে তোয়াক্কা না করে তৈমুর আলম ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডিভিশনে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। বছরের পর বছর একই এলাকায় দায়িত্বে থাকায় তিনি একটি দুর্ভেদ্য প্রভাব বলয় তৈরি করেছেন, যা তাকে অনিয়ম চালিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তৈমুর আলমের বিরুদ্ধে কেবল প্রশাসনিক অভিযোগই নয়, বিষয়টি গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। প্রাপ্ত নথিতে দেখা যায়, ঢাকার একটি আদালতে (সিআর মামলা নং–১১৮/২০২৫) সরকারি তহবিল তছরুপ, প্রকল্প বরাদ্দে অনিয়ম ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগে তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন পর্যায়ে রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে মো. তৈমুর আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে তার আইনজীবীরা দাবি করেছেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং প্রশাসনিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ। তাদের মতে, কোনো অভিযোগই এখন পর্যন্ত বিচারিক বা দাপ্তরিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। অন্যদিকে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তদন্ত সাপেক্ষে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরে বর্তমান ১৫তম বিবিএস-এর প্রকৌশলীরা চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই অবসরে যাবেন। সে কারনে আগামী ডিসেম্বরের ২৪ তারিখে তিনি অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হবেন। এমন একজন অনৈতিক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে একটি পদে থাকবেন যা খুবই বেমানান। তিনি হয়তো তার প্রভাব খাটিয়ে পুরো প্রকৌশল সিস্টেমকে ব্যাবসায় পরিণত করে ফেলবেন। পদোন্নতির আগে তাঁর এসব বিষয়ে নিবিড় অনুসন্ধান হওয়া উচিত এবং কর্তৃপক্ষের উচিত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।