সিন্ডিকেট ও জালিয়াতিতে বিপন্ন সড়কখাত
আ.লীগের কাদের সিন্ডিকেটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মনিরুজ্জামানের দুর্নীতির নেটওয়ার্ক

সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, টেন্ডার জালিয়াতি এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের অত্যন্ত বিশ্বস্ত এবং বিশেষ সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। কক্সবাজার থেকে শুরু করে মুন্সিগঞ্জ, রংপুর ও রাজশাহী-যখনই যেখানে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের গভীর ক্ষত রেখে এসেছেন। রাজনৈতিক ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বর্তমানে তিনি রাতারাতি নিজের খোলস পালটে বিএনপি সমর্থক সেজেছেন এবং নিজেকে হবু প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে প্রচার করে বেড়াচ্ছেন।
বর্তমানে অধিদপ্তরের জনবল নিয়ন্ত্রণ ও বদলি শাখার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেকশন প্রশাসনে অদৃশ্য প্রভাব বজায় রেখে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণ ও সুবিধাজনক স্থানে ট্রান্সফার পোস্টিং করছেন। সাধারণত যেকোনো সরকারের আমলে অত্যন্ত বিশ্বস্ত ও রাজনৈতিকভাবে পরীক্ষিত কর্মকর্তাদেরই এই প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়, যা মনিরুজ্জামানের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহলের সঙ্গে তার গভীর যোগসাজশের প্রমাণ বহন করে। প্রধান কার্যালয়ের এই প্রভাবশালী চেয়ারে বসে তিনি পুরো অধিদপ্তরের ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়া ও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটিকে সুকৌশলে নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে সওজ সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের দেওয়া তথ্যে এক ভয়ংকর ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির খতিয়ান উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মো. মনিরুজ্জামান যখন কক্সবাজার সড়ক বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তখনই তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে প্রাক্কলন বা এস্টিমেট অস্বাভাবিক বাড়িয়ে দেখিয়ে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যায়। তৎকালীন সময়ে সমুদ্র উপকূলীয় ও পর্যটন এলাকার সড়ক উন্নয়নের নামে বরাদ্দকৃত অর্থ কাজ শেষ না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে ছাড় করার মতো ঘটনা সেখানে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তীতে রাজনৈতিক খুঁটির জোরে রাজশাহী জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর তাঁর দুর্নীতির ব্যাপ্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, রাজশাহী অবস্থানকালে তিনি নির্দিষ্ট ৪-৫ জন বিশেষ ঠিকাদারের সমন্বয়ে একটি ‘কোর সিন্ডিকেট’ গড়ে তোলেন। সাধারণ ঠিকাদারদের লিখিত অভিযোগ, মনিরুজ্জামানের সবুজ সংকেত এবং নির্ধারিত পার্সেন্টেজ বা কমিশন অগ্রিম নিশ্চিত করা ছাড়া সেখানে কোনো ঠিকাদারের পক্ষে টেন্ডারে অংশ নেওয়া বা কাজ পাওয়া ছিল সম্পূর্ণ অসম্ভব। এরপর মুন্সিগঞ্জ সড়ক বিভাগে দায়িত্ব পালনের সময়ও সড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকা সরকারি কোষাগার থেকে উত্তোলন করা হলেও, বাস্তব কাজের মান ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। ফলে বর্ষা নামার আগেই বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত সেই সড়কগুলো চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে পড়ে এবং খানাখন্দের সৃষ্টি হয়, যা নিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল।
দুদক থেকে প্রাপ্ত এক অভিযোগের কপিতে দেখা গেছে, রংপুর ও রাজশাহী জোনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ‘আমিনুল ইসলাম কনস্ট্রাকশন’সহ নির্দিষ্ট কয়েকটি বিশেষ লাইসেন্সধারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অনৈতিক ও লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্কের সুনির্দিষ্ট তথ্য মিলেছে। সরকারি ক্রয় বিধিমালা বা পিপিআর লঙ্ঘন করে টেন্ডার আইডি ও শর্তাবলি এমনভাবে তৈরি করা হতো যাতে নির্দিষ্ট ওই সিন্ডিকেট ছাড়া অন্য কেউ প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারে। এই টেন্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং বিনিময়ে প্রতিটি কার্যাদেশ থেকে একটি বড় অঙ্কের কমিশন পকেস্থ করার বিষয়টি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সদর দপ্তর থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ে ওপেন সিক্রেট হিসেবে পরিচিত। এমনকি মুন্সিগঞ্জ সড়ক বিভাগে কর্মরত থাকাকালীন বিভিন্ন পদের জনবল নিয়োগ ও আউটসোর্সিং প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, জালিয়াতি ও কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেনের লিখিত অভিযোগ সওজ সদর দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে জমা পড়েছিল। যদিও সে সময় প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে থাকা তাঁর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের প্রভাবে তিনি লোকদেখানো তদন্তের আশ্বাস দিয়েছিলেন, কিন্তু বাস্তবে সেই তদন্তের কোনো ফলাফল কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। সওজের একাধিক কর্মকর্তার দাবি, নিজের অবৈধ অর্থ ও ওপর মহলের প্রভাব খাটিয়ে তিনি সবসময়ই এসব তদন্ত ফাইল ধামাচাপা দিয়ে এসেছেন।
বর্তমানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা ও উন্নয়ন উইংয়ে মো. মনিরুজ্জামানের ভূমিকা আরও বেশি বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতাধীন প্রতিটি প্রকল্পের প্রশাসনিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত অনুমোদনের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৮ শতাংশ কমিশন অগ্রিম নিশ্চিত না করে কোনো ফাইল সই করেন না। দেশের সড়ক অবকাঠামো খাতের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের সাম্প্রতিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে গড়ে ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের তথ্য প্রকাশ করেছে। খাত সংশ্লিষ্ট ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মনিরুজ্জামানের মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গড়ে তোলা প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেটই সড়ক খাতের এই সামগ্রিক দুর্নীতির প্রধান কারিগর ও নিয়ন্ত্রক। ঠিকাদারদের কাছ থেকে অগ্রিম বিপুল অঙ্কের কমিশন গ্রহণের কারণে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ও বিটুমিন ব্যবহার জেনেও তিনি চোখ বন্ধ করে চূড়ান্ত বিল অনুমোদন করেন। যার ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলো নির্মাণের মাত্র এক থেকে দুই বছরের মধ্যেই পুনরায় সংস্কারের তালিকায় চলে যায়, যা একদিকে যেমন রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার অপচয় ঘটাচ্ছে, অন্যদিকে জনগণের যাতায়াত ও জননিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে।
এই প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ক্রয় প্রক্রিয়া ও প্রকল্প বাস্তবায়নে যে একটি পদ্ধতিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেট কাজ করছে, তা আমাদের বিভিন্ন গবেষণায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে। কোনো একক কর্মকর্তার পক্ষে এত দীর্ঘ সময় ধরে দেশজুড়ে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধ সম্পদ অর্জন করা সম্ভব নয়, যদি না এর পেছনে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উচ্চপর্যায়ের যোগসাজশ থাকে। বর্তমান সময়ে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যদি এই ধরনের সুনির্দিষ্ট জালিয়াতি ও শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অভিযোগ ওঠে, তবে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের স্বার্থে অবিলম্বে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের উচিত তাঁর অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা, কারণ এ ধরনের দায়হীনতা পুরো প্রশাসনিক চেইন অফ কমান্ডকে ধ্বংস করে দেয় এবং দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ফরিদপুর জেলায় আদি বাড়ি থাকা এই প্রকৌশলী গত এক দশকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঢাকা, ফরিদপুর ও রাজশাহীতে অবৈধ সম্পদের এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, তিনি ফরিদপুর সদরে এবং তাঁর গ্রামের বাড়িতে বিপুল পরিমাণ কৃষি ও অকৃষি জমি, বাণিজ্যিক প্লট এবং স্থাবর সম্পত্তি ক্রয় করেছেন, যার বাজারমূল্য শতকোটি টাকার ওপরে। কেবল পৈতৃক অঞ্চলেই নয়, রাজশাহী জোনে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে তিনি নিজের এবং আত্মীয়-স্বজনদের নামে-বেনামে একাধিক মূল্যবান বাণিজ্যিক প্লট ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ক্রয় করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। রাজধানীর রাজউক ও অভিজাত এলাকাগুলোতে তাঁর সম্পদের খতিয়ান আরও দীর্ঘ। ঢাকার অত্যন্ত ব্যয়বহুল এলাকা বনানী ও গুলশানের কনকর্ড টাওয়ারে তাঁর নামে আলিশান ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ‘ডি’ ব্লকে বহুতল ফ্ল্যাট এবং নিকেতন হাউজিং সোসাইটি এলাকায় প্রায় ১০ কাঠার একটি অতি মূল্যবান বাণিজ্যিক প্লট রয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। তাঁর ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের নামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিপুল অঙ্কের এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রের সন্ধান মিলেছে। একজন সরকারি বেতনভুক্ত গ্রেড-৩ বা গ্রেড-২ পদমর্যাদার কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সঙ্গে তাঁর এই বিলাসী জীবনযাত্রার মান এবং এই বিপুল বৈভবের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক লক্ষ্য করা গেছে। গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট মহলে অভিযোগ রয়েছে, দেশের ভেতরে সম্পদ গড়ার পাশাপাশি হুন্ডির মাধ্যমে তিনি তাঁর এই অবৈধ আয়ের একটি বড় অংশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও দুবাইতে পাচার করেছেন, যার আন্তর্জাতিক মানিলন্ডারিং আইনে সুষ্ঠু অনুসন্ধান হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
ইতোমধ্যেই এই বিপুল অবৈধ সম্পদের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে এবং কমিশনের গোয়েন্দা ইউনিট প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ শুরু করেছে। দুদকের দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে, মনিরুজ্জামানের ব্যাংক হিসাবসমূহের লেনদেন, ঢাকার অভিজাত এলাকার ফ্ল্যাট ও প্লটের মালিকানা সংক্রান্ত নথিপত্র এবং তাঁর নিজ জেলা ফরিদপুরে কেনা জমির দলিল যাচাইয়ের কাজ চলছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে তাঁর ঘোষিত আয়ের সঙ্গে বাস্তব সম্পদের বিশাল অসঙ্গতি মিলেছে এবং হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়টিও দুদকের মানিলন্ডারিং শাখার নজরে এসেছে। এই বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার টেন্ডার বাণিজ্যের একটি অভিযোগ কমিশনে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আমরা ইতিমধ্যেই তাঁর নামে-বেনামে থাকা সম্পদের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করেছি এবং এর সপক্ষে বেশ কিছু নথিপত্র আমাদের হাতে এসেছে। খুব দ্রুতই কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী একজন অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে এবং দোষী প্রমাণিত হলে তাঁর সম্পদ ক্রোকসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মনিরুজ্জামানের এই একচ্ছত্র আধিপত্য, অনৈতিক আচরণ এবং রাতারাতি রাজনৈতিক খোলস পরিবর্তনের কারণে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সৎ, যোগ্য ও পেশাদার কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও হতাশা বিরাজ করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সওজের একজন জ্যেষ্ঠ অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মো. মনিরুজ্জামানের মতো দুর্নীতিপরায়ণ ও সুযোগসন্ধানী কর্মকর্তাদের কারণে পুরো সড়ক ও জনপথ বিভাগের দীর্ঘদিনের সুনাম ও ভাবমূর্তি এখন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এরা কোনো নিয়ম-নীতি বা চেইন অফ কমান্ডের তোয়াক্কা না করে নিজস্ব সিন্ডিকেট ও বিপুল অবৈধ অর্থ দিয়ে মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে পুরো অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রণ করছেন। এর ফলে সৎ কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন এবং মাঠ পর্যায়ে কাজের গুণগত মান বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে ঠিকাদারদের মধ্যে যারা এই অশুভ সিন্ডিকেটের বাইরে রয়েছেন, তাঁরা ই-জিপি সিস্টেমে কারিগরি গ্যাঁড়াকলের কারণে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারছেন না এবং চরম ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে বাজার থেকে ছিটকে পড়ছেন।
যোগাযোগ ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার টেকসই স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হলে এবং জনগণের ট্যাক্সের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে মনিরুজ্জামানের মতো সিন্ডিকেটবাজ কর্মকর্তাদের দ্রুত জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উচিত অবিলম্বে তাঁর নামে ও বেনামে থাকা দেশ-বিদেশের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা এবং তাঁর দায়িত্বাধীন সময়ে অনুমোদিত ও বাস্তবায়িত মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি ও ফরেনসিক অডিট কমিটি গঠন করা।
এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগ, দুদকের অনুসন্ধান এবং টেন্ডার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানের সাথে তাঁর দপ্তরে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে তাঁর নির্ধারিত সিটে পাওয়া যায়নি। এরপর তাঁর বক্তব্য গ্রহণের জন্য তাঁর ব্যক্তিগত মুঠোফোনে বারবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি, এমনকি অভিযোগের বিষয়ে খুদে বার্তা বা মেসেজ পাঠানো হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া বা উত্তর পাওয়া যায়নি। তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র, ভুক্তভোগী সাধারণ ঠিকাদারদের ক্ষোভ এবং নথিপত্রে প্রাপ্ত তথ্যাদি তাঁর এই এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতার বিপরীতে ভয়াবহ এক অনিয়মের চিত্র তুলে ধরছে। দেশের যোগাযোগ খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনার স্বার্থে এই বিতর্কিত প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রশাসনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি বা অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং দুদকের অনুসন্ধান চলমান থাকার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট লিখিত তথ্য পাওয়া গেলে মন্ত্রণালয় শূন্য সহনশীলতা নীতি বা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করবে। অতীতে কে কোন সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন বা বর্তমানে কে কী পরিচয় দিচ্ছেন, সেটি বিবেচ্য নয়। মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত সেল কাজ করতে পারে এবং দুদকের পক্ষ থেকে কোনো তথ্য চাওয়া হলে মন্ত্রণালয় তা সরবরাহ করে আইনগত প্রক্রিয়া সচল রাখতে পূর্ণ সহযোগিতা করবে। দেশের চলমান বাস্তবতায় টেকসই সড়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং জনগণের অর্থের অপচয় রোধে যেকোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে সরকার বদ্ধপরিকর।
