দুদকের তদন্ত চললেও সক্রিয় স্বাস্থ্য খাতের ‘মাফিয়া ঠিকাদার’ জাহের উদ্দিন

স্টাফ রিপোর্টার
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬ ২০:৩৯:০৭

স্বাস্থ্যখাতে আলোচিত ঠিকাদার ও বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানির মালিক জাহের উদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক মামলা চলমান থাকলেও তিনি নতুন নামে ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, স্বাস্থ্যখাতে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার পর তিনি  বিভিন্ন নামে নতুন প্রতিষ্ঠান খুলে আবারও স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন দপ্তরে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ল্যাবরেটরি আইটেম ও ওষুধ সরবরাহের করছে। ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে  চিকিৎসা সরঞ্জাম, ল্যাবরেটরি আইটেম ও ওষুধ সরবরাহের কাজও তিনি পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

বিগত বছরগুলোতে স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক ঠিকাদারি ব্যবস্থায় ঘুরেফিরে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেটের যে অভিযোগ ওঠে, তাতে জাহের উদ্দিনের কোম্পানির নামটিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে আলোচিত হয়। এছাড়া, স্বাস্থ্য খাতে বড় দুর্নীতির অভিযোগ ও অনিয়মের কারণে বিতর্কিত ঠিকাদারদের কার্যক্রম প্রায়শই বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরে আনে।

দুদকের একটি সূত্র দাবি করেছে, জাহের উদ্দিন সরকারকে পলাতক হিসেবে উল্লেখ করা হলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, তিনি বর্তমানে দেশেই অবস্থান করছেন এবং রাজধানীর পুরানা পল্টনে একটি কার্যালয় থেকে নিয়মিত ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, স্বাস্থ্যখাতে যন্ত্রপাতি সরবরাহের নামে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন জাহের উদ্দিন। দেশে-বিদেশে তাঁর নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, গাড়ি ও ব্যাংক আমানতের তথ্য রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি।

দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট নথিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ ও সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র সরবরাহের নামে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে জাহের উদ্দিন সরকার ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোম্পানি, মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও ইউনিভার্সেল ট্রেড করপোরেশন।

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজে যন্ত্রপাতি সরবরাহসংক্রান্ত ১৩২ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করেই বিদেশে অর্থ পাচার করা হয়েছে। একই সঙ্গে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ২০১৮ সালের যন্ত্রপাতি কেনাকাটার দরপত্রে জাহের উদ্দিন সরকারের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের মালিকানাধীন কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয় বলে দুদকের নথিতে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পরস্পরের যোগসাজশে সাজানো দরপত্রের মাধ্যমে নিম্নমানের ও ব্যবহার অনুপযোগী যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।

দুদকের তথ্যানুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যখাতের ১৯টি প্রকল্প ও হাসপাতালের কেনাকাটায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে জাহের উদ্দিন সরকার ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ১৬৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় দুদক ১৯টি মামলা করেছে।

নথিপত্র অনুযায়ী, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল, রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পাবনার শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ এবং চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে যন্ত্রপাতি সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।

পাবনার শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি মামলায় ২০২০ সালের ৯ আগস্ট দুদক মামলা দায়ের করে। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন। এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জাহের উদ্দিন সরকারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে চাননি।