পাহাড়ী বন উজাড়ে সক্রিয় শক্তিশালী সিন্ডিকেট
বান্দরবান বন বিভাগে ডিএফও তৌফিক ও এসিএফ রিটা আকতার এর দুর্নীতির রাজত্ব (পর্ব ১)

বান্দরবান বন বিভাগ এখন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও ঘুষ বাণিজ্যের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) তৌফিকুল ইসলাম এবং সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) রিটা আকতারের সরাসরি নেতৃত্বে এখানে প্রতিটি সেবার বিপরীতে নির্দিষ্ট হারে ঘুষের 'রেট' নির্ধারণ করা হয়েছে। বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা এই শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও সরকারি সম্পদ লুটপাট হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। অনুসন্ধান ও বন বিভাগের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, টিপি (পরিবহন অনুমতি) প্রতি যে ১৫ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়া হয়, তার সিংহভাগ চলে যায় ডিএফও ও এসিএফের পকেটে। প্রতিটি টিপি থেকে ডিএফও তৌফিকুল ইসলাম পান ৪ হাজার টাকা এবং এসিএফ রিটা আকতার পান ২ হাজার টাকা। এছাড়া স্টক চেকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রতি ঘনফুটে নির্ধারিত ১৫ টাকা ঘুষের মধ্যে ডিএফও ৮ টাকা এবং এসিএফ ৩ টাকা গ্রহণ করেন। জোত পারমিটের ক্ষেত্রেও চিত্রটি আরও ভয়াবহ; প্রতি ঘনফুটে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা ঘুষের মধ্যে ডিএফও ২১ টাকা এবং এসিএফ ১০ টাকা হারে ভাগ পাচ্ছেন। ফার্নিচার পরিবহনের অনুমতি দিতে আইটেম ভেদে ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছে এই সিন্ডিকেট।
এসিএফ রিটা আকতারের অতীত পর্যালোচনায় জানা যায়, ২০২১ সালে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে ৩৮তম বিসিএস (বন) ক্যাডার হিসেবে তিনি চট্টগ্রাম অঞ্চলের পটিয়া রেঞ্জ ট্রেনিং-এ যোগ দেন। পটিয়া রেঞ্জে থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে কাঠ আটক করে ছেড়ে দেওয়া, 'বিশেষ লাইন' দেওয়ার মাধ্যমে অবৈধ আয় এবং 'সুফল' প্রকল্পের বাগান সৃজনে অনিয়ম করে অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ ওঠে। এমনকি তার সময়েই সুফল প্রকল্পের আওতায় ক্রয়কৃত হোন্ডা চুরির ঘটনা ঘটে এবং বিভিন্ন বিট থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। পরবর্তীতে তিনি রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অধিদপ্তরের বদলি নীতি তোয়াক্কা না করে অবৈধ উপার্জনের উদ্দেশ্যে বান্দরবান বন বিভাগে পোস্টিং ভাগিয়ে নেন।
বর্তমানে বান্দরবান বন বিভাগের অধীনে সদর, রুমা, টংকাবতী, থানচি, পাইন্দু, সেকদু ও খ্যায়াচলং রেঞ্জ রয়েছে, যার অধিকাংশ এলাকা অত্যন্ত দুর্গম। নিয়ম অনুযায়ী, জোত পারমিট ইস্যু করার ক্ষেত্রে খাড়া গাছের ৫০ শতাংশ এসিএফ এবং ১০ শতাংশ ডিএফও সরেজমিনে পরিদর্শন করার কথা। কিন্তু অত্যন্ত হাস্যকর বিষয় হলো, রিটা আকতার নারী কর্মকর্তা হওয়ার অজুহাতে এই দুর্গম এলাকাগুলোতে না গিয়ে জেলা শহরে ঘরে বসেই দায়িত্ব পালন করছেন। ডিএফও তৌফিকুর রহমানের সাথে আঁতাত করে সরেজমিনে ফিল্ড চেক না করেই মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তারা বনের কাঠ পাচার ও জোত পারমিটকে বৈধতা দিচ্ছেন।
এই সিন্ডিকেটের আশীর্বাদেই সাঙ্গু রিজার্ভ থেকে অবৈধভাবে কাঠ পাচারের ‘লাইন’ সচল রয়েছে। এমনকি থানচির ইটভাটাগুলোতে বনের কাঠ পোড়ানোর জন্য মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তারা অলিখিত অনুমতি দিয়েছেন। বন্যপ্রাণী পাচার ও শিকারি চক্রের সাথেও এই কর্মকর্তাদের পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সম্প্রতি হরিণের মাংসসহ পাচারকারী চক্র ধরা পড়লেও রহস্যজনক কারণে মূল হোতারা পার পেয়ে যাওয়ায় জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন, একাধিক অভিযোগে অভিযুক্ত ও বিতর্কিত এসব কর্মকর্তা কীভাবে সংরক্ষিত পাহাড়ি এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন এবং তাদের এই দুর্নীতির পাহাড় দেখেও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কেন নীরব ভূমিকা পালন করছে। এতেই প্রমাণিত হয় যে, বন রক্ষার নামে এই কর্মকর্তারা আসলে পকেট ভারী করতেই ব্যস্ত।
