জনজীবন ঝুঁকির মুখে

নকশা বহির্ভূত বহুতল ভবন নির্মাণে বনশ্রীতে উত্তপ্ত আবাসিক এলাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: মে ৩, ২০২৬ ১৬:৩৪:১৩

রাজধানী ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা বনশ্রীর রোড-০৯, ব্লক-সি, কদীতে একটি বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভবনটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর অনুমোদিত নকশার সম্পূর্ণ বাইরে গিয়ে নির্মিত হচ্ছে। ভবনের চারপাশে প্রয়োজনীয় সেটব্যাক বা রাস্তা ছাড়া না রেখে, পর্যাপ্ত সেফটি মার্জিন না মেনে ঝুঁকিপূর্ণভাবে কাজ চলছে বলে তারা দাবি করছেন। এলাকাবাসীদের মতে, আবাসিক এলাকার মধ্যে এমন অনিয়মিত নির্মাণ তাদের দৈনন্দিন জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

সম্প্রতি স্থানীয় একজন স্টাফ রিপোর্টার জাহিদুল আলম রাজউক চেয়ারম্যান বরাবর একটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, আব্দুল বাতেনের মালিকানাধীন এই বহুতল ভবনটি রাজউকের নিয়ম-কানুন সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে নির্মাণ করা হচ্ছে। ভবনের চারদিকে যতটুকু খোলা জায়গা বা রাস্তা ছাড়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা মানা হয়নি। ফলে আশেপাশের বাসিন্দারা প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, নির্মাণস্থলে প্রয়োজনীয় সেফটি ব্যবস্থা না থাকায় যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, যা পুরো এলাকার জন্য মারাত্মক হয়ে উঠবে।

ঘটনাস্থলে সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনটির নির্মাণকাজ পুরোদমে চলছে। বাঁশের স্ক্যাফোল্ডিং, ইটের গাঁথুনি, রড-সিমেন্টের স্তূপ এবং শ্রমিকদের কর্মতৎপরতা স্পষ্ট। ভবনের সামনে টাঙানো বড় ব্যানারে “সেমি রেডি ফ্ল্যাট বিক্রয় হইবে” লেখা রয়েছে। সেখানে চার বেডরুম, চার বাথরুম, তিন বারান্দা, ড্রয়িং, ডাইনিং ও কিচেনসহ ফ্ল্যাট বিক্রির প্রচার করা হয়েছে। দুটি মোবাইল নম্বরও দেওয়া আছে-০১৭২১ ৬২০ ৭৭৪ এবং ০১৮৪২ ৬৬৯ ৩৬১। পুরনো সাইনবোর্ডে “ব্লক-সি, রোড-৯” উল্লেখ দেখা যায়। আশেপাশে বিভিন্ন পোস্টার ও নোটিশে এলাকার চিত্র ফুটে উঠেছে।

এই ভবন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে। বিশেষ করে ঢাকা আইডিয়াল স্কুলের একজন শিক্ষক আব্দুল বাতেনকে যখন এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি সরাসরি উত্তর না দিয়ে মঞ্জু নামের আরেক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে বলেন। পরে মঞ্জুকে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, “আমি আগে মালিক ছিলাম, এখন আমার ফ্ল্যাট বিক্রি করে দিয়েছি।” নিয়ম-বহির্ভূত নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল বাতেন বলেন, “আমরা সব ম্যানেজ করেই কাজ করছি।” তাঁর এমন বক্তব্যে এলাকাবাসীর মধ্যে আরও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, নিয়ম লঙ্ঘন করে “ম্যানেজ” করার মানসিকতা পুরো এলাকার নিরাপত্তাকে বিপন্ন করছে।

আশপাশের কয়েকজন এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে ভয়াবহ চিত্র। পাশের বাড়ির বাসিন্দা মো. রহিম বলেন, “আমাদের রাস্তা এমনিতেই সরু। ভবনটি আরও কাছে এসে গেছে। শিশুরা স্কুলে যাওয়া-আসা করতে ভয় পায়। যদি কোনো ইট বা রড পড়ে, তাহলে কী হবে?” আরেক প্রতিবেশী আয়েশা খাতুন জানান, “রাতে শ্রমিকরা কাজ করে। বাঁশ-কাঠের শব্দে ঘুম হয় না। সেফটি বলতে কিছুই দেখি না। ভূমিকম্প হলে তো পুরো এলাকা ধসে পড়বে। রাজউক কেন এখনো কিছু করছে না?” স্থানীয় যুবক কামরুল হাসানের অভিযোগ, “ফ্ল্যাট বিক্রির ব্যানার টাঙিয়ে টাকা কামাচ্ছে, কিন্তু আমাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। এটা কোনো আইন মানার নিয়ম নয়।”

এলাকাবাসীদের মতে, বনশ্রী একসময় শান্ত আবাসিক এলাকা ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরে অনেক ভবন নির্মাণের নামে নিয়ম লঙ্ঘন বেড়েছে। রাজউকের নিয়ম অনুসারে প্রতিটি ভবনের জন্য নির্দিষ্ট সেটব্যাক, ফায়ার সেফটি, স্ট্রাকচারাল সেফটি ও পরিবেশগত ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার মতো ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় নকশা বহির্ভূত নির্মাণ ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) এবং রাজউকের মাস্টার প্ল্যান লঙ্ঘন করলে জরিমানা থেকে শুরু করে কারাদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজউক বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অভিযান চালিয়েছে এবং অবৈধ অংশ ভেঙে দিয়েছে।

এ বিষয়ে রাজউকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে চাইলে তারা জানান, “এই ভবনটি নিয়ে একাধিক অভিযোগ এসেছে। খুব শিগগিরই অভিযান চালানো হবে। সাইট পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” কর্মকর্তারা আরও বলেন, রাজউক নিয়মিতভাবে নকশা বহির্ভূত নির্মাণের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে থাকে। তবে এলাকাবাসীরা মনে করেন, অভিযোগ পাওয়ার পরও দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়ায় সমস্যা আরও জটিল হয়ে উঠছে।

ভবন নির্মাণের সঙ্গে জড়িতদের “সব ম্যানেজ করেই কাজ করছি” ধরনের বক্তব্য এলাকায় আরও অসন্তোষ বাড়িয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, “ম্যানেজ” বলতে কী বোঝানো হয়েছে? টাকার বিনিময়ে নিয়ম লঙ্ঘনকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে কি না? স্থানীয়রা দাবি করছেন, রাজউক যেন অবিলম্বে সাইটে গিয়ে পরিদর্শন করে নির্মাণকাজ বন্ধ করে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়। একই সঙ্গে ভবনের নকশা যাচাই করে প্রয়োজনে অবৈধ অংশ ভেঙে ফেলার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ ধরনের ঘটনা ঢাকার অনেক আবাসিক এলাকায়ই দেখা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত নগরায়ণের চাপে অনেকে লাভের আশায় নিয়ম মানছেন না। ফলে শহরের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও পরিকল্পিত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বনশ্রীর এই ঘটনা যদি দ্রুত সমাধান না হয়, তাহলে এলাকাবাসীর মধ্যে অস্থিরতা আরও বাড়বে। জাহিদুল আলমসহ অনেকেই আশা করছেন, রাজউকের তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এলাকাবাসীদের কাছে এখন একটাই প্রশ্ন—তাদের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে? শুধু ফ্ল্যাট বিক্রির ব্যানার টাঙিয়ে লাভ করলেই চলবে না, জীবনের নিরাপত্তাও জরুরি। রাজউকের দ্রুত হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।