ফ্যাসিস্ট মন্ত্রীর প্রভাবে মহাজন, এরপর কোটি টাকার হরিলুট বালিজুড়ী রেঞ্জারের পৈশাচিকতায় ধ্বংস হচ্ছে বন

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৯, ২০২৬ ১৭:১১:০২

বন অধিদপ্তরের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়ের নাম ফরেস্ট রেঞ্জার মো: সুমন মিয়া। ২০২০ সালের ১ নভেম্বর রাজনৈতিক প্রভাব ও সাবেক বিতর্কিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আশীবাদ নিয়ে বন বিভাগে যোগদানের পর থেকেই শুরু হয় তার সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতা। নিজেকে অধিদপ্তরের অলিখিত ‘অধিপতি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি মরিয়া হয়ে ওঠেন এবং মন্ত্রীর প্রভাব খাটিয়ে একের পর এক লোভনীয় পোস্টিং বাগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাধ্য করেন। তার বিরুদ্ধে সুফল প্রকল্পের অর্থ তছরুপ, বনের জমি অবৈধভাবে হাতবদল এবং গাছ চুরির মতো গুরুতর সব অভিযোগ থাকলেও রহস্যজনক কারণে তিনি বরাবরই থেকে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ক্ষমতার দাপটে তিনি অধীনস্থদের ওপর নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালান; এমনকি তার অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে জুটে অকথ্য গালিগালাজ ও প্রতিহিংসামূলক বদলি।

২০২৪ সালের মার্চ মাসে ৩৫ লক্ষ টাকার বিশাল অংকের বিনিময়ে বালিজুড়ী রেঞ্জ কর্মকর্তার পদটি বাগিয়ে নেওয়ার পর তার দুর্নীতির ডালপালা আরও বিস্তৃত হয়। সেখানে কাঠ ব্যবসায়ীদের নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি। সুমন মিয়ার প্রতিহিংসার সবচাইতে নির্মম শিকার হয়েছেন মরহুম রবিউল ইসলাম। অনুসন্ধানে দেখা যায়, পোস্টিং নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে সুমন মিয়া অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে রবিউলের ওপর প্রায় ৯ কোটি ৩১ লাখ ৮৭ হাজার ৭৯৫ টাকা আত্মসাতের মিথ্যা অপবাদ চাপিয়ে দেন।

প্রকৃতপক্ষে রবিউল ইসলাম লটের বকেয়া প্রায় ৬ কোটি টাকার কথা বারবার ডিএফও-কে জানালেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। উল্টো সুমন মিয়া নিজের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লট ক্রেতাদের থেকে ৩ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা আদায় করে তা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করেন এবং সেই দায়ও রবিউলের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত ও বিভাগীয় শাস্তির মুখে ঠেলে দেন। সুমনের পৈশাচিকতা এখানেই থেমে থাকেনি; নিজের অপরাধ ঢাকতে তিনি রবিউলের বিরুদ্ধে থানায় মামলা এবং দুদকে অভিযোগ দায়ের করেন। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না পাওয়া এবং এই চরম অপদস্থের শিকার হয়ে রবিউল দিশেহারা হয়ে ভারতে প্রবেশের সময় মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন। একজন সহকর্মীর প্রতি সুমনের এমন আচরণ কেবল অমানবিকই নয়, বরং চাকরি বিধিমালারও চরম লঙ্ঘন। 

সুমন মিয়ার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে যে, তিনি গভীর রাত পর্যন্ত বন অফিসে বহিরাগতদের নিয়ে বিদেশি মদ, ইয়াবা ও গাঁজার আসর বসান। তার দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় এক বন প্রহরীকে যেমন হয়রানিমূলক বদলি করা হয়েছে, তেমনি এক স্টাফকে টানা ১২ ঘণ্টা হ্যান্ডকাফ পরিয়ে রাখার মতো মধ্যযুগীয় নির্যাতনের ঘটনাও ঘটিয়েছেন তিনি, যার শোকে ওই স্টাফের বাবা স্ট্রোক করে মারা যান। ব্যক্তিগত জিপ গাড়ির জ্বালানি ও চালকের বেতন বাবদ মাসে খরচ করা প্রায় ৭৫ হাজার টাকার যোগান আসে বনের গাছ ও জমি বিক্রির কালো টাকা থেকে। এমনকি নিষিদ্ধ ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের সাথে সম্পৃক্ত থাকা এই কর্মকর্তা বর্তমানে ঊর্ধ্বতন মহলেও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন।

ঢাকা অঞ্চলের বন সংরক্ষক এ.এস.এম. জহির উদ্দিন আকন তার প্রভাবে এতটাই নতিস্বীকার করেছেন যে, তিনি ডিএফও-র প্রশাসনিক আদেশ পর্যন্ত বাতিল করে দিয়েছেন, যা বন বিভাগের চেইন অফ কমান্ডকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, সুমন মিয়ার ‘আপনজন’ হিসেবে পরিচিত বন সংরক্ষক এ.এস.এম. জহির উদ্দিন আকন গত ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ১৮/পি নম্বর অফিস আদেশের মাধ্যমে সুমন মিয়াকে ঢাকা বন বিভাগে বদলি করেছেন, যা প্রচলিত বদলি নীতিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বর্তমানে সুমন মিয়া ঢাকা বন বিভাগের কালিয়াকৈর রেঞ্জ ও কালিয়াকৈর ফরেস্ট চেক স্টেশনের মতো অত্যন্ত লোভনীয় পদে বসার জন্য বিভিন্ন মহলে জোর লবিং চালাচ্ছেন। একজন চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ও সহকর্মীর মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তির এমন দাপুটে পদায়ন বন বিভাগের সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করেছে। অপরাধের এই মহোৎসব বন্ধ না হলে বন বিভাগ তার অস্তিত্ব হারাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।