বন বিভাগের ‘মাফিয়া’ সুমন মিয়ার ক্ষমতার দাপট: নির্বাচন কমিশনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি ও কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হরিলুট

বন অধিদপ্তরের চেইন অফ কমান্ড ধ্বংসকারী বিতর্কিত কর্মকর্তা ফরেস্ট রেঞ্জার মো: সুমন মিয়ার অপকর্মের ফিরিস্তি যেন শেষ হয়েও হচ্ছে না। প্রথম পর্বে তার যোগদানের নেপথ্যে থাকা ফ্যাসিস্ট শক্তি ও সহকর্মী রবিউল ইসলামের রহস্যজনক মৃত্যুর পেছনে তার ভূমিকার কথা উঠে এলেও, দ্বিতীয় পর্বের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরও ভয়াবহ ও নজিরবিহীন দুর্নীতির আখ্যান। বিশেষ করে দেশের নির্বাচনী নীতিমালা ও একটি অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকে নিজের হাতের পুতুলে পরিণত করেছেন এই ক্ষমতাধর রেঞ্জার।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে সুমন মিয়া নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী, নির্বাচনের ১৫ দিন পর থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলির ক্ষেত্রে বিশেষ বিধিনিষেধ রয়েছে যদি কোনো কেন্দ্রে গোলযোগ বা সংশয় থাকে। এই নিয়মকে যথাযথ সম্মান জানিয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএ্ফও) কাজী মুহাম্মদ নুরুল করিম গত ৪ মার্চ ২০২৬ তারিখে ২৩ নম্বর অফিস আদেশের মাধ্যমে সুমন মিয়াকে বালিজুড়ী রেঞ্জ থেকে উথুরা রেঞ্জে বদলি করেন। কিন্তু বিধি মোতাবেক হওয়া এই বদলি আদেশটিই যেন সুমন মিয়ার অহংবোধে আঘাত হানে। নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবা এই কর্মকর্তা তার ক্ষমতার খুঁটির জোর প্রদর্শন করতে শুরু করেন এক নজিরবিহীন জালিয়াতি ও লবিংয়ের খেলা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, বদলি ঠেকাতে সুমন মিয়া শেরপুর জেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেনকে মোটা অংকের উৎকোচ ও ওপর মহলের চাপ প্রয়োগ করে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পত্র লেখান। নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে একটি অধিদপ্তরের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা শুধু ক্ষমতার অপব্যবহারই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গরিমা নষ্ট করার শামিল। মূলত নির্বাচন পরবর্তী ১৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার যে নীতিমালার কথা সুমন মিয়া ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন, তা ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের অপকৌশল। এই ধুরন্ধর কর্মকর্তার প্রভাবে ঢাকা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) এ.এস.এম. জহির উদ্দিন আকন মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে ডিএফও-র দেওয়া সেই ন্যায়সঙ্গত বদলি আদেশটি স্থগিত করেন। বন অধিদপ্তরের ইতিহাসে একজন নিম্নপদস্থ কর্মকর্তার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এভাবে নতিস্বীকার করা এবং প্রশাসনিক আদেশ স্থগিত করাকে চরম লজ্জাজনক ও নজিরবিহীন বলে মনে করছেন খোদ বন বিভাগের কর্মকর্তারা।
সুমন মিয়ার দুর্নীতির শিকড় বালিজুড়ী রেঞ্জে এতটাই গভীরে যে, তিনি সেখানে লট ক্রেতাদের সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন এক অভেদ্য ‘সিন্ডিকেট’। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বনের মূল্যবান কাঠ বিক্রির ক্ষেত্রে তিনি সরকারি মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্য দেখিয়ে লট ক্রেতাদের নীল নকশা বুঝিয়ে দিতেন। বিনিময়ে প্রতিটি লট থেকে তিনি ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ব্যক্তিগত কমিশন গ্রহণ করতেন। নিজের পকেট ভারী করতে গিয়ে তিনি দিনের পর দিন সরকারকে বিশাল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করেছেন। তার এই অনিয়ম ও সরকারি সম্পদ চুরির ফলে কয়েক বছরে সরকারের কয়েক কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। বালিজুড়ী রেঞ্জে তার আমলে বিক্রিত প্রতিটি লট পুনরায় তদন্ত করলে বন বিভাগের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করেছেন বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা।
শুধুমাত্র লট সিন্ডিকেটই নয়, বাগান সৃজনে ভুয়া বিল-ভাউচার, বনের জমি টাকার বিনিময়ে প্রভাবশালী দখলদারদের হাতে তুলে দেওয়া এবং লট ক্রেতাদের নির্ধারিত সীমার বাইরে অতিরিক্ত গাছ কাটার সুযোগ করে দিয়ে সুমন মিয়া গত কয়েক বছরে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন। একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মন্তব্য অনুযায়ী, এই স্বল্পকালীন চাকরিতেই তিনি প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। আর এই বিশাল অংকের টাকার একটি বড় অংশ চলে যায় তার ছাতা হিসেবে পরিচিত সিএফ জহির উদ্দিন আকনের পকেটে। জানা গেছে, জহির উদ্দিন আকনের যাবতীয় অবৈধ লেনদেন ও ক্যাশ কালেকশন নিয়ন্ত্রিত হয় এই সুমন মিয়ার মাধ্যমে। সিএফ-এর একান্ত প্রিয়ভাজন হওয়ার সুযোগে তিনি বর্তমানে ঢাকা অঞ্চলের সবচেয়ে লোভনীয় পদ ‘কালিয়াকৈর রেঞ্জ’ বাগিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। একজন চিহ্নিত অপরাধী ও সহকর্মীর মৃত্যুর জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী ব্যক্তির হাতে কালিয়াকৈরের মতো গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ তুলে দিলে তা বন বিভাগের জন্য কফিন ঠুকে দেওয়ার সমান হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এই মাফিয়া চক্রের লাগাম এখনই টেনে ধরা না গেলে বনের অস্তিত্ব ও প্রশাসনের মর্যাদা ধূলিসাৎ হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
