ময়মনসিংহ বন বিভাগে দুর্নীতির 'আলাদীনের চেরাগ' ও আব্দুল করিমের সাম্রাজ্য, কাজী মুহাম্মদ নরুল করিম, ডিএফও এর নিরব ভূমিকা 

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: এপ্রিল ২৭, ২০২৬ ১৫:৫৩:৪৬  আপডেট :  এপ্রিল ২৭, ২০২৬ ১৬:০৮:৫৩

ময়মনসিংহ বন বিভাগের রাংটিয়া রেঞ্জে কর্মরত ডেপুটি রেঞ্জার মোঃ আব্দুল করিম যেন হাতে পেয়েছেন এক অলৌকিক চেরাগ। একজন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী হয়েও তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়, যা হার মানিয়েছে রূপকথার গল্পকেও। অভিযোগ উঠেছে, চাকরিতে প্রবেশকাল থেকেই তিনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন।

শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতির ভাতকুচি গ্রামের বাসিন্দা হয়েও জন্মস্থান ময়মনসিংহ গোপন করে এবং কিশোরগঞ্জে নিজের কোনো স্থায়ী ঠিকানা না থাকা সত্ত্বেও ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে তিনি কিশোরগঞ্জের কোটায় থানা বনায়ন প্রকল্পে প্লান্টেশন সহকারী পদে চাকরি বাগিয়ে নেন। এই জালিয়াতির মাধ্যমে শুরু হওয়া ক্যারিয়ারে তিনি আর পেছনে ফিরে তাকাননি। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে একই সার্কেলে অবস্থান করে বন অধিদপ্তরের বদলি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলেছেন তিনি। ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের ১৯নং ওয়ার্ডের বলাশপুরে ৫ কাঠা জমিতে ৫ তলা এবং ধোপাখোলায় ৬ কাঠা জমিতে ৪ তলা আলিশান বাড়িই প্রমাণ দেয় তার অঢেল অবৈধ সম্পদের।

আব্দুল করিমের এই প্রতাপের মূলে ছিল রাজনৈতিক প্রভাব। তার আপন ভাতিজা ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, যার নাম ব্যবহার করে তিনি বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের (ডিএফও) জিম্মি করে রাখতেন। জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার মামলায় বর্তমানে সেই ভাতিজা ভারতে পলাতক থাকলেও করিমের প্রভাব কমেনি। বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সময় তিনি সুফল প্রকল্প, গাছ পাচার এবং বনভূমি জবরদখলে সহায়তা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। মধুটিলা রেঞ্জে থাকাকালীন সুফল প্রকল্পের কোটি টাকা লোপাট এবং জামালপুর এসএফএনটিসি-তে থাকাকালীন ভুয়া টিপি (ট্রানজিট পাস) দিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ইতিহাস তার পিছু ছাড়ছে না। এমনকি সরকারি বিধিমালা লঙ্ঘন করে তিনি তার ভাতিজা মোঃ আরিফের নামে খাড়া গাছের লট নিলামে নিয়ে পর্দার আড়ালে কাঠের ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

বর্তমানে রাংটিয়া রেঞ্জে কর্মরত এই কর্মকর্তার দুর্নীতির শেকড় এতটাই গভীরে যে, বদলি ঠেকাতে তিনি নির্দ্বিধায় অসত্য তথ্য উপস্থাপন করেন। সম্প্রতি ডিএফও তাকে রসুলপুর রেঞ্জে বদলি করলেও নির্বাচন ডিউটি না থাকা সত্ত্বেও মিথ্যা অজুহাত ও প্রভাব খাটিয়ে বন সংরক্ষকের মাধ্যমে সেই আদেশ বাতিল করান। বছরের পর বছর একই এলাকায় থাকার সুবাদে স্থানীয় গাছ চোর সিন্ডিকেটের সাথে তার গড়ে উঠেছে গভীর সখ্য।

অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর তিনি এখন ভোল পাল্টে বিএনপি ঘরানার এক সাবেক সংসদ সদস্যকে ম্যানেজ করে বালিঝুরী রেঞ্জে পোস্টিং পাওয়ার জন্য ডিএফও-র ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই প্রকাশ্য দুর্নীতির বিষয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নুরুল করিমের ভূমিকা নিয়ে খোদ বন বিভাগেই নানা গুঞ্জন রয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, আপন ভাতিজাকে দিয়ে সরকারি মূল্যের চেয়ে কম দামে কাঠ বিক্রি এবং বনভূমি বেদখলের মতো বিষয়গুলো ডিএফও-র জানা থাকলেও তিনি অদৃশ্য কারণে নীরবতা পালন করছেন। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধারণা, মাসোয়ারা বা বড় অংকের উৎকোচের বিনিময়েই আব্দুল করিমকে সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে।

বন অধিদপ্তরের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতির জন্য নীতি-নির্ধারকদের এই আপোষকামী মনোভাবকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। উসমান গনির মতো দুর্নীতিবাজদের কারণে বন বিভাগ যে কলঙ্কিত হয়েছিল, আব্দুল করিমরা সেই ধারাকে আরও বেপরোয়া করে তুলছেন। এখন জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—দুদক বা টিআইবি-র মতো সংস্থাগুলো কেন এই 'আলাদীনের চেরাগ' পাওয়া কর্মকর্তার হিসাব নিতে এগিয়ে আসছে না? বন বিভাগকে এই লজ্জাজনক অবস্থা থেকে বাঁচাতে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে পরিশুদ্ধ করতে আব্দুল করিমের মতো দুর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।