গণপূর্তের সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে বদলী বানিজ্যের গুরুতর অভিযোগ

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: এপ্রিল ২০, ২০২৬ ১৯:৫৯:৫৩

গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মুহাম্মদ সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে বদলী বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দায়ের করা একটি লিখিত অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলী প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, আর্থিক লেনদেন এবং সিন্ডিকেট গঠনের মাধ্যমে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক বদলী আদেশ স্থগিত করেছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে মার্চ ২০২৬ সালে জারিকৃত অর্ধশতাধিক প্রকৌশলীর বদলী আদেশ নিয়মবহির্ভূত বলে চিহ্নিত করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

দুদকের অভিযোগপত্র অনুসারে, সারোয়ার জাহান ২০২৫ সালের শেষভাগ থেকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংস্থাপন শাখায় তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বদলী প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম শুরু করেন। বিভিন্ন অফিস আদেশে তাঁর স্বাক্ষর দেখা যায় ২০২৫ সালের শেষার্ধ থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত। এ সময়ে তিনি অসংখ্য প্রকৌশলী ও কর্মকর্তার বদলীতে জড়িত ছিলেন। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মার্চ ২০২৬-এ একদিনেই অর্ধশতাধিক প্রকৌশলীর বদলী আদেশ জারি হয়, যেখানে সংস্থাপন শাখার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য।

এসব বদলীর ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে একই স্টেশনে দুই বছরের কম সময় কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও বদলী করা হয়েছে, যা সাধারণত নিয়মবিরুদ্ধ। লোভনীয় পোস্টিংয়ের বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়া, নিয়মবহির্ভূত বদলী অনুমোদন এবং কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন একই স্টেশনে থাকা কর্মকর্তাদের হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। মন্ত্রণালয় পরবর্তীতে এসব বদলী স্থগিত করে এবং নিয়মবহির্ভূত আদেশগুলো বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করে। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের নির্দেশে মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে বড় আকারের বদলী বা পদোন্নতির ফাইল অগ্রসর না করার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে জামানতের টাকা অবৈধভাবে ক্যাশ করার অভিযোগ আগেই প্রমাণিত হয়েছে। ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট গণপূর্ত অধিদপ্তর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও পরবর্তীতে তাঁকে কোনো শাস্তি ছাড়াই বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে অফিস আদেশ জারি করে এই অব্যাহতি দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের মতে, এই অব্যাহতি প্রক্রিয়ায়ও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।

দুদকের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে নিয়োগ ও বদলী বাণিজ্যের পাশাপাশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় তাঁর নামে বা পরিবারের নামে একটি বাড়ি রয়েছে, যা তাঁর বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এছাড়া বিদেশে অর্থ পাচার এবং অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়, গণপূর্ত অধিদপ্তরে ‘মাফিয়া চক্র’ ও টেন্ডার সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করছেন। দুদক ইতোমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকৌশলীর অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান শুরু করেছে এবং সারোয়ার জাহানসহ সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে তদন্ত চলছে।

সংস্থাপন শাখায় দায়িত্ব নেওয়ার পর সারোয়ার জাহান বদলীকে একটি বাণিজ্যিক প্রক্রিয়ায় পরিণত করেছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন। লোভনীয় পদায়নের বিনিময়ে আর্থিক লেনদেন, নিয়মবহির্ভূত বদলী অনুমোদন এবং কিছু কর্মকর্তাকে হয়রানির মাধ্যমে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। যাদের বদলী স্থগিত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে একই স্টেশনে দুই বছরের কম সময় কর্মরত কয়েকজন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলীর নাম রয়েছে। মন্ত্রণালয় এসব অনিয়মের কারণে সামগ্রিক বদলী প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করছে এবং নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ না করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে বদলী-পদায়ন, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং জামানতের অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসছে। সারোয়ার জাহানের ক্ষেত্রে আগের জামানত কেলেঙ্কারি প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও শাস্তি না হওয়ায় অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। অভিযোগকারী ইকবালুর রহিম, প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার এবং গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলেছেন, এসব অনিয়ম অত্যন্ত গুরুতর, যা সরকারি প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় অর্থের সুরক্ষার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তিনি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর নিকট বিনীত আবেদন জানিয়ে সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সকল অভিযোগের তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করেছেন। বিশেষ করে তাঁর অবৈধ সম্পদ (বিশেষ করে মোহাম্মদপুরের বাড়ি) জব্দ এবং বিদেশে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদাররা সারোয়ার জাহানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে সত্যতা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুদক ও মন্ত্রণালয়ের যৌথ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি স্বচ্ছভাবে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। না হলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সেবার মান আরও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠবে। বর্তমান মন্ত্রণালয় এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের নির্দেশে বদলী ও পদায়নের ক্ষমতা সংশোধন করা হচ্ছে এবং নীতিমালা লঙ্ঘন করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, সারোয়ার জাহান সংস্থাপন শাখায় দায়িত্ব নেওয়ার আগে প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী ২৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার আগেই সারোয়ার জাহান একাধিক বদলী ও পদোন্নতির আদেশ জারি করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ সময়ে তিনি অনেকগুলো বদলী আদেশ প্রক্রিয়াকরণ ও অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যার মধ্যে নিয়মবহির্ভূত অনেক আদেশ রয়েছে। মার্চ-এপ্রিল ২০২৬-এ জারিকৃত অর্ধশতাধিক বদলী আদেশেও সংস্থাপন শাখার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

এ বিষয়ে সারোয়ার জাহানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, বদলীর আদেশ আমি একা করি না, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সংস্থাপন) ও নির্বাহী প্রকৌশলী (সংস্থাপন)সহ আমরা মিটিং করে বদলী বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকি। অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব অভিযোগ মিথ্যা।

গণপূর্ত অধিদপ্তরে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। বিগত বছরগুলোতেও বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি, টেন্ডার সিন্ডিকেট এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ বেশ আলোচিত। তবে সারোয়ার জাহানের ক্ষেত্রে জামানত কেলেঙ্কারি প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও শাস্তি না হওয়া এবং পরবর্তীতে সংস্থাপন শাখায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়া অনেককে হতাশ করেছে। অভিযোগকারীরা আশা করছেন, দুদকের তদন্তে সত্য উদঘাটিত হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রায়শই বলে থাকেন, দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলেও শুধু বদলি, অব্যাহতি বা চাকরিচ্যুতি যথেষ্ট নয়। দোষীদের আইনি বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় দুর্নীতি উৎসাহিত হয়।