গণপূত অধিদপ্তরের প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদের টেন্ডার বানিজ্য করে কোটি টাকা লোপাট

জুলাই আন্দোলনের পরে দেশে সংস্কারের হাওয়া বয়ে গেলেও সরকারি দপ্তরগুলোতে তেমন কোনো সংস্কারই হয়নি। পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে সরকারি চাকুরীরত অবস্থায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত সরকারি কর্মকর্তারা ধরাছোঁয়ার বাহিরেই রয়ে গেছেন। তারা অনিয়ম দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে, কমিশণ ও টেন্ডার বাণিজ্য করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। তেমনই অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নগর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে। নিজেকে প্রধান প্রকৌশলী চিন্তা করা ও অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হয়ে উঠার জন্য তিনি এই বাণিজ্য করে অর্থের ব্যবস্থা করছেন বলে জানা যায়।
জানা যায়, ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগের গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপন অমান্য করে কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে এপিপি বরাদ্দের ৮০ শতাংশ দরপত্রের কাজ এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে আহবান করেছেন। কাজগুলোর আইডি নাম্বারগুলো হচ্ছে আইডি নং ১০৫৬১৪১, ১০৫৬১৪৩, ১০৫৬১৪৪, ১০৫৬১৪৭, ১০৫৭৮১৩, ১০৫৭৯৪৪, ১০৫৭৯৪৬, ১০৬০৩৫৮, ১০৬২৩৮৫, ১০৬২৩৯৬, ১০৬২৬৪৭, ১০৬২৬৪৮, ১০৬২৬৪৯, ১০৬২৬৫১, ১০৬২৬৫২, ১০৬২৬৫৩, ১০৬২৬৫৪, ১০৬২৬৭১, ১০৬২৬৭২, ১০৬৮৮৫১, ১০৬৮৮৫৯, ১০৬৮৮৬০, ১০৬৮৮৬৩, ১০৬৮৮৬৪, ১০৬৮৮৬৫, ১০৬৮৮৭০, ১০৬৮৮৯৬, ১০৬৮৯০১, ১০৬৯১৭৩, ১০৬৯৪৬২, ১০৬৯৮৯৯, ১০৬৯৯০০, ১০৬৯৯০১, ১০৭০৭২৯, ১০৭১২৭১, ১০৭১৭৬৬, ১০৭১৭৭৮, ১০৭১৭৭৯, ১০৭১৭৮০। এই কাজগুলো পছন্দের ঠিকাদারদেরকে দিয়ে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা বলে অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরেও এপিপি বরাদ্দের ৯০ শতাংশ দরপত্র এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহবান করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া আবুল আলাম আজাদ ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এ থাকাকালীন ২০২৩-২০২৪ অর্থ বছরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বরাদ্দের প্রাপ্ত কাজগুলো ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহবান করেছেন এবং কাজগুলো আওয়ামী সরকারের লোকজন দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আওয়ামী ঠিকাদারদের মধ্যে অন্যতম ২০ নং ওয়ার্ড কমিশনার রতনকে দেয়া হয়েছিল মোট পাঁচ কোটি টাকার কাজ। এই কাজের সম্পূর্ণ টাকাই রতন কমিশনার ২৪-এর জুলাইয়ে ছাত্র-জনতা হত্যায় কাজ লাগিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এদিকে কথিত আছে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের ৫ তারিখের আগ পর্যন্ত রতন কমিশনার আবুল কালাম আজাদ এর মধ্যে মামা ভাগ্নে সম্পর্ক ছিল। ছাত্র-জনতায় আবুল কালাম আজাদ যে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন তা এই রতন কমিশনারের মাধ্যমেই দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে তেজগাঁওয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ভবন নির্মাণেও ঠিকাদারের সাথে যোগসাজশে অগ্রীম বিল প্রদানের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের আগেই ২০২৩ সালের জুন মাসে ঠিকাদারকে বিল প্রদান করেছেন তিনি। এখানেও মোটা অংকের টাকার লেনদেন হয়েছে।
এছাড়াও আবুল কালাম আজাদ বিসিএস পরীক্ষায় তার ব্যাচে প্রথম হয়েছেন বিধায় তার গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। তিনি প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছেন বলে গণপূর্ত সংশ্লিষ্টরা জানান। তারা বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হতে সরকারের বিভিন্ন স্তরে বিপুল পরিমাণ টাকা ঘুষ দিতে হয়। আর আবুল কালাম আজাদ এই ঘুষের টাকাই এখন থেকে ব্যবস্থা করে নিচ্ছেন যাতে পরে তার টাকার জন্য তার পদায়ন না আটকায়।
এবিষয়ে নগর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার মুঠোফোনে ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও তিনি প্রতিউত্তর দেননি। এমনকি তার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্ঠা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
এদিকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতির ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ও গণমাধ্যমের মুখ বন্ধ করার জন্য নতুন পন্থা অবলম্বন করছেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলেই সংবাদের সত্যতা তদন্ত না করে গণপূর্ত অধিদপ্তর সংবাদের প্রতিবেদককে হলুদ সাংবাদিক ও পত্রিকার ডিক্লিয়ারেশন বাতিল করার জন্য বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল বরাবর আবেদন করছে। অথচ গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এই সংবাদপত্রেই প্রকাশিত তাদের দুর্নীতির সংবাদ আমলে নিয়ে সেই দুর্নীতির তদন্ত করে সত্যতার প্রমাণ পেয়েই গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলামকে তিরষ্কার ও গত ০৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ তারিখে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুজ্জামান সাময়িক বরখাস্ত করেছে।
