গণহত্যায় আর্থিক সহায়তাকারী গণপূর্তের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইলিয়াস আহম্মেদ এখনও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে

বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত জুলাইয়ে ছাত্র-জনতা হত্যাকারী ছাত্রলীগের একনিষ্ঠ ও চিহ্নিত ছাত্রলীগের কর্মীরা এখনো প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারা তাদের স্থান থেকে পতিত আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নের অপচেষ্টায় আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরকম চিহ্নিত ও পরীক্ষিত ছাত্রলীগ কর্মী গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ইলিয়াস আহম্মেদ। তিনি ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সদস্য হয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি করে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এই অবৈধ টাকা তিনি জুলাইয়ের ছাত্র-জনতা হত্যা করার জন্য তার দল ছাত্রলীগের কর্মীদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। গণহত্যায় আর্থিক সহায়তা করার জন্য তার বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলাও দায়ের হয়েছে। কিন্তু এতকিছুর পরেও তিনি রয়েছেন বহাল তবিয়তে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সিলেট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে এখনো দাপটের সাথেই চাকুরি করে যাচ্ছেন।
মো. ইলিয়াস আহম্মেদের ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সাথে গভীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ হিসেবে তার সোশ্যাল মিডিয়ার একাউন্টের কিছু স্ক্রিনশট এসেছে দৈনিক আজকের সংবাদের কাছে। ছবিগুলো তার ব্যাক্তিগত ফেইসবুক প্রোফাইল থেকে নেওয়া হয়েছে। একটি স্ক্রিনশট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালে আনিসুজ্জামান ইমন নামে এক প্রকৌশলী নিজের ফেইসবুকে পোস্ট করে জনতার কাছে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন। প্রশ্নটি ছিল "ছাত্রলীগ করাই কি আজন্ম পাপ?” সেই পোস্টে মন্তব্য করতে গিয়ে ইলিয়াস আহমেদ নিজেকে আওয়ামী আদর্শের দাবী করেন। তিনি আরও বলেন, আদর্শ বিচ্যুত হন না বলেই নাকি উপর মহল তাকে (সাবেক ছাত্রলীগ) ভালো কর্মকর্তার স্বীকৃতি দেয়নি।
ভালো কর্মকর্তার স্বীকৃতি না পেয়েও ইলিয়াস আহম্মেদ গণপূর্ত অধিদপ্তরের দাপুটে পদেগুলোতে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। বিগত আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার সাথে সাথেই তিনি নারায়নগঞ্জ থেকে বদলী হয়ে ঢাকা নগর গণপূর্ত বিভাগের রমনা-১ উপবিভাগে বদলি হয়ে আসেন। গণপূর্তে কথিত আছে যে তিনি তৎকালীন পূর্ত প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট মান্নান খানের ডান হাত খ্যাত ইকবালকে কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে রমনা-১ এর সাব-ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বদলি হন। এরপর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে প্রথমেই মহাখালী গনপূর্ত বিভাগে পোষ্টিং বাগিয়ে নেন। সেখান থেকে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের মন্ত্রিত্বকালে ঢাকা বিভাগ-২ এর পোস্টিং বাগিয়ে নেন ইলিয়াস। অভিযোগ রয়েছে তিনি মোশাররফের এপিএস নুর খান এর সাথে ব্যাপক সখ্যতা গড়ে তুলে কয়েক কোটি টাকার বিনিময়ে সেই পোস্টিং বাগিয়ে নিয়েছিলেন। জানা যায়, ঢাকা বিভাগ-২ এ ব্যাপক অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টাকা বকেয়া করায় তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান মুন্সী তাকে দূর্নীতির দায়ে নড়াইলে শাস্তি মূলক বদলী করেন। পরবর্তীতে মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হলে তাকে আবার ঢাকা ডিভিশন-২ এ বদলি করে আনেন। এসময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তৎকালীন ডিজি অ্যাডমিন কবির বিন আনোয়ারের সাথে নিবির সম্পর্ক গেড়ে তোলেন। পরে আজিমপুর গণপূর্ত বিভাগে আবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকার কাজ আসলে তিনি সেখানে বদলী হন। আজিমপুর ডিভিশনে নিয়ম বহির্ভুতভাবে তিনি টানা ছয় বছর থেকে তিনটি ফেসে প্রকল্পের টেন্ডার বানিজ্যের একক নিয়ন্ত্রন হাতিয়ে নিয়েছিলেন। বিল দিয়েছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার। আজিমপুর গণপূর্তে থাকাকালীন তিনি সাবেক পূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকারের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেন। শহীদুল্লাহ খন্দকারের ছেলের বিয়েতে সমস্ত খরচ ইলিয়াস বহন করেছেন মর্মে জনশ্রুতি রয়েছে। এজন্য ভরা মাহফিলে শহীদুল্লাহ ইলিয়াসের প্রশংসাও করেছেন। এ সময় তার বিরুদ্ধে মূল ধারার একাধিক গনমাধ্যমে ধারাবাহিক দুর্নীতির অভিযোগ আসলেও রাজনৈতিক যোগাযোগের কারনে তিনি বহাল তবিয়তে ছিলেন। এছাড়াও সেই সময় জিকে শামীম কান্ডে দুদকে অভিযুক্ত ছিলেন। দুদকের অনুসন্ধান থেকেও বিপুল পরিমাণ টাকা ঘুষ দিয়ে নিজের নাম প্রত্যাহার করেছেন বলেও অভিযোগ আছে।
আরো অভিযোগ আছে যে তিনি ২০১৮ সালে সরাসরি পিরোজপুরের শ ম রেজাউল করিমের জনসভায় যোগ দিয়েছিলেন তার সঙ্গে নির্বাচন প্রচারনায় অংশ নিতে। সেই সব প্রচারনার ছবিও তিনি তার ব্যাক্তিগত ফেইসবুক প্রোফাইলে শেয়ার করেছিলেন। একই ভাবে তিনি শাহে আলম মুরাদের নির্বাচনী প্রচারনায়ও বিপুল অর্থ দিয়েছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ. ফ. ম বাহাউদ্দিন নাসিম, আব্দুর রহমান, শ ম রেজাউল করিম, শরীফ আহমেদ সহ ডজন খানেক আওয়ামীলীগ নেতার নির্বাচনে তিনি অর্থ ঢেলেছেন বলে অভিযোগ আছে।
তার আরেকটি ফেইসবুকের ছবিতে তিনি সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুর রহামানকে নিজের অভিভাবক হিসেবে দাবি করেছেন। ছবিতে দেখা যায় তিনি স্বশরীরে আব্দুর রহমানকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের নিজস্ব সিন্ডিকেট সহকারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানানোসহ সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী আবুল হোসেনের মৃত্যুতেও গভীর শোক জানিয়েছেন তার ব্যাক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়াতে।
অভিযোগ রয়েছে মেয়েকে কানাডায় উচ্ছশিক্ষায় ভর্তি করিয়ে অফশোর ব্যাঙ্কিং এর মাধ্যমে কানাডার বেগম পাড়ায় বিপুল সম্পত্তি ক্রয় করেছেন। তিনি অবৈধ অর্থের জোরে অত্যন্ত বিলাসী জীবন-যাপন করেন। তিনি ধানমন্ডির আবাহনী ক্লাব, অফিসার্স ক্লাব, ঢাকা ক্লাব, গুলশান ক্লাব, বনানী ক্লাবসহ ঢাকার বিলাসবহুল ক্লাবের সদস্য।
এসকল বিষয়ে মো. ইলিয়াস আহম্মেদের মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
