খুঁটির জোর সিসিএফ-সিএফ

কোটি কোটি টাকা লোপাট ও জাদুকরী টিপি জালিয়াতির পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে লামার ‘বনখেকো’ রেঞ্জার কবির

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২৬ ১৩:৩৫:২০

​বান্দরবানের লামা উপজেলার রূপসীপাড়া আর্মি ক্যাম্পের সতর্ক নজরদারিতে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অবৈধ কাঠবোঝাই দুই ট্রাক জব্দের ঘটনায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও রহস্যজনকভাবে এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন মূল অভিযুক্ত লামা সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা (ডেপুটি রেঞ্জার) কে এম কবির উদ্দিন। জহির প্রকাশ ‘জামাই জহির’ ও শফিক সিন্ডিকেটের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা উৎকোচ নিয়ে অবৈধ চলাচল পাশ দেওয়া, সচল ট্রাকে কাঠ মেপে ‘জাদুকরী’ ইউডিওআর মামলা সাজানো এবং একই কাঠের গায়ে সর্বোচ্চ নয়বার পর্যন্ত হাতুড়ির (হ্যামার) সিল মেরে তথ্যপ্রমাণ লোপাট করার মতো নজিরবিহীন ও গুরুতর অপরাধের পরও তাঁর বিরুদ্ধে সিসিএফ ও সিএফ কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন নাই, যা খোদ বন বিভাগের সৎ কর্মকর্তা ও সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি করেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২০ সালের দিকে কে এম কবির উদ্দিন চট্টগ্রাম অঞ্চলে বদলি হয়ে আসার পর থেকেই মূলত এক অদৃশ্য শক্তির ছায়া পাচ্ছেন; তিনি একের পর এক বর্তমান প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) কে সরাসরি ব্যবহার করে লোভনীয় ও সুবিধাজনক ‘প্রাইজ পোস্টিং’ ভাগিয়ে নিয়েছেন এবং এই বিশেষ সম্পর্কের কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তিনি সবসময়ই রয়ে গেছেন সম্পূর্ণ ধরাছোঁয়ার বাইরে। ইতিপূর্বে বান্দরবান বন বিভাগে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সদর রেঞ্জের রেঞ্জ সহযোগীর পাশাপাশি রুমা রেঞ্জের  দায়িত্ব পালন এবং ভুয়া জোত পারমিটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সরকারি কাঠ পাচার করার নজির রয়েছে তাঁর। পরবর্তীতে সিসিএফ-এর সরাসরি সুপারিশে ও মোটা অঙ্কের অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে ফরিদ মিয়াকে দিয়ে সদর রেঞ্জের দায়িত্ব পালনকালে একাধিক দুর্নীতির খতিয়ান বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রচারিত হলেও রহস্যজনক কারণে কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয় নাই। এরপর কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের জোয়ারিয়ানালা রেঞ্জের দায়িত্বে থাকাকালীন ৮৭২.০ হেক্টর সুফল প্রকল্পের  বনায়ন ও নার্সারি না করেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে সরকারের প্রায় ৪ কোটি টাকা সরাসরি আত্মসাৎ করেন কবির, যেখানে তাঁর ‘রক্ষা কবজ’ হিসেবে আবির্ভূত হয়ে ততকালীন ডিএফও আনোয়ার হোসেন সরকার। টাকার বিনিময়ে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত ধামাচাপা দিয়ে কবিরের সীমাহীন দুর্নীতি আড়াল করেছিলেন।

​বর্তমানে লামা বন বিভাগে সেনাবাহিনীর হাতে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকার কাঠসহ ট্রাক জব্দের ঘটনায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলেও টাকার কাছে কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ পরাস্ত হয়ে আক্ষরিক অর্থেই কবির উদ্দিনকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে, যেখানে সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মাসুদ আলম স্বয়ং চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দো এর সুনির্দিষ্ট নির্দেশে সরাসরি এই মিশন সফল করার দায়িত্ব পালন করছেন। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে যে, বিভিন্ন প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে লামা বন বিভাগের ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান লোকদেখানো ও মানুষের চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য এসিএফ মাসুদ আলমকে আহ্বায়ক, খন্দকার আরিফুল ইসলামকে সদস্য এবং এ.কে.এম আলতাফ হোসেনকে সদস্য সচিব করে যে তিন সদস্যের তদন্ত টিম গঠন করেছিলেন, সেই তদন্ত কমিটি ট্রাকে থাকা কাঠের প্রকৃত জাত, পরিমাপ, ডিজিট ও হ্যামার চিহ্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই আগে থেকে রেঞ্জার কবিরের তৈরি করে রাখা কাল্পনিক জব্দ তালিকার সাথে হুবহু মিল রেখে একটি সাজানো প্রতিবেদন বা সাইজ লিস্টে চোখ বন্ধ করে স্বাক্ষর করে দিয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো—কবির কর্তৃক জহির-শফিক চক্রকে বাঁচানোর জন্য জালিয়াতি করে ইস্যুকৃত টিপিতে উল্লেখিত সাইজ লিস্ট, আদালতে জমা দেওয়া ভুয়া জব্দ তালিকা এবং তদন্ত কমিটি কর্তৃক দাখিলকৃত চূড়ান্ত প্রতিবেদনের কাঠের বিবরণ ও সাইজ লিস্ট সম্পূর্ণ এক ও অভিন্ন, যাহা মূলত আইন ও বাস্তবতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কবিরের ‘অলৌকিক ও জাদুকরী’ দুর্নীতির ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ।

কবিরের চাতুরতার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে লামার স্থানীয় নামকরা কাঠ ব্যবসায়ী বাবুল হোসেন স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, কবির মূলত বড় মাপের একজন চরম দুর্নীতিবাজ কর্মচারী এবং তাঁর চতুর বুদ্ধির কাছে যেকোনো সৎ বা লোলুপ কর্তৃপক্ষ পরাস্ত হতে বাধ্য; তিনি কাঠ ব্যবসায়ী শফিকের কাছ থেকে ১০ লক্ষ টাকা নিয়ে অবৈধ কাঠের টিপি ইস্যু ও লোডিং এর সরাসরি অনুমতি প্রদান করেন এবং এই কাজে নিজের বিশ্বস্ত দুই বন প্রহরী আমিরুল ইসলাম ও জুলহাস উদ্দিনকে লোডিং পয়েন্টে পাহারায় রাখেন। ব্যবসায়ী বাবুল হোসেন আরও ফাস করেন যে, শফিকের ভুয়া টিপি অনুযায়ী অস্থায়ী কাঠের ডিপোটি রূপসীপাড়া আর্মি ক্যাম্প হতে প্রায় ৬ থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এবং সেখান থেকে গাড়ি লোডিং হয়ে আর্মি ক্যাম্পের সামনে আসার কোনো ভৌগোলিক সুযোগই নাই, অথচ বাস্তব ক্ষেত্রে যে এলাকায় অবৈধ কাঠ লোডিং হয়েছে তা আর্মি ক্যাম্পের মাত্র ৫০০ মিটারের মধ্যে অবস্থিত, যাহা লোড করার পর সেনা ক্যাম্প অতিবাহিত করতেই হবে এবং এই টাকার খেলায় এসিএফ মাসুদ আলম ও রেঞ্জার কবিরের একটি সুগভীর ও বড় সিন্ডিকেট সরাসরি জড়িত।

​অন্যদিকে ঘটনা প্রসঙ্গে ফেঁসে যাওয়া কাঠ ব্যবসায়ী শফিক নিজে মিডিয়ার সামনে অকপটে স্বীকার করে জানিয়েছেন যে, তিনি আইনের বাইরে যা কিছু করেছেন তা সম্পূর্ণভাবে লামা রেঞ্জ কর্মকর্তা কবির উদ্দিনের অনুমতি সাপেক্ষে এবং তাঁরই সরাসরি নির্দেশনায় করেছেন, যার বাস্তব প্রমাণ হলো কবিরের নির্দেশে লোডিং পয়েন্টে বন প্রহরী পাঠানো এবং ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে তড়িঘড়ি টিপি প্রদান করা। একই সাথে ব্যবসায়ী শফিক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন যে, তাঁর কাঠের কোনো প্রকার আর্থিক বা আইনি ক্ষয়ক্ষতি হলে তার সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব রেঞ্জার কবিরকেই নিতে হবে। তিনি আরও জানান আমি কোর্টের দারস্থ হয়েছি এবং ইস্যুকৃত টিপি বলে কাঠ ফেরত পাব।

অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় বনাঞ্চলের কাঠ পাচারে রেঞ্জার কবিরের এই প্রত্যক্ষ যোগসাজশ ও দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণ পাওয়ার পর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) স্বয়ং কবির উদ্দিনকে কৈফিয়ত তলব করে চিঠি দিলেও কবির ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনই মনে করেন নাই, এমনকি এই বিষয়ে আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সিএফ মিহির কুমার দো কে অনুলিপি পাঠানো হলেও সেই ফাইল আজ মোটা অঙ্কের টাকা ও পুরোনো পারসেন্টেজ বাণিজ্যের সম্পর্কের অতল গহ্বরে আড়াল হয়ে গেছে, যার ফলে লামার পাহাড়ী জনপদ ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এখন দেশের বনজ সম্পদ রক্ষায় সংঘবদ্ধ সিএফ, এসিএফ ও রেঞ্জার কবির সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে মহামান্য আদালতের বিচার এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সরাসরি হস্তক্ষেপের জোর দাবি তুলছেন।