প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আবুল কালাম ধরাছোয়ার বাইরে

বিআইডাব্লিউটিএ’র বাস্তবায়নাধীন চিলমারী নদীবন্দর স্থাপন প্রকল্পে হরিলুট ॥ দেখার কেউ নেই

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ১৬, ২০২৬ ১৯:২৩:০২

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) বাস্তবায়নাধীন প্রায় ৩৩৫ কোটি টাকার চিলমারী নদীবন্দর স্থাপন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটির দায়িত্বে থাকা প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ মোল্লাসহ কয়েকজন ঠিকাদার, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সরকারি অর্থ লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটির প্রাথমিক ডিপিপি ছিল প্রায় ২৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। পরে সংশোধিত ডিপিপির মাধ্যমে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকায়। অভিযোগ রয়েছে, ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রকল্পে বিভিন্ন খাতে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি ও আওয়ামী লীগপন্থী ঠিকাদারদের সমন্বয়ে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রকল্পটির বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করত। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে ছিলেন প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম আজাদ মোল্লা। এছাড়া সাবেক প্রতিমন্ত্রীর এপিএস বাশার, ডি.জি. বাংলা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী আরশাদ পারভেজ এবং ডিপন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সজল চন্দ্র দত্তের নামও অভিযোগে উঠে এসেছে।

সাইট ডেভেলপমেন্টে ‘ভূতুড়ে বিল’? অভিযোগ রয়েছে, সাইট ডেভেলপমেন্টের নামে কোটি কোটি টাকার বিল উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে প্রয়োজনীয় বালু ভরাট করা হয়নি। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি দাবি করেন, কাজ সম্পন্ন না করেই ভুয়া বিলের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

ভবন নির্মাণে নকশা লঙ্ঘনের অভিযোগ: স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের আওতায় নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনায় অনুমোদিত নকশা অনুসরণ করা হয়নি। বিশেষ করে পাইলিংয়ের কাজে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এতে ভবনগুলোর স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পাইলিং কাজে বড় ধরনের জালিয়াতির অভিযোগ: নথি অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট পাইলিংয়ের জন্য ৫০০ মিমি ব্যাস, ৪০.৫০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৬ মিমি রডের ১০টি বার ব্যবহারের কথা থাকলেও বাস্তবে ৩০০ মিমি ব্যাস, প্রায় ২৩ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৭টি বার ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালকের নির্দেশনায় পৃথক ড্রয়িং ব্যবহার করে কম উপকরণ দিয়ে কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়। ফলে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

বিল পরিশোধ নিয়ে নতুন প্রশ্ন: অনুসন্ধানে আরও অভিযোগ উঠে এসেছে যে, কাগজপত্রে কাজের ঠিকাদার হিসেবে একটি যৌথ উদ্যোগ প্রতিষ্ঠানের নাম থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে অন্য প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে পেমেন্ট সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও বিল পরিশোধ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এছাড়া কাজ না করেই নির্দিষ্ট কিছু আইটেমের বিল উত্তোলন এবং সেই অর্থ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, এ সংক্রান্ত কিছু নথি ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য তাদের কাছে রয়েছে।

ভূমি অধিগ্রহণেও অনিয়মের অভিযোগ: সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের ক্ষেত্রেও নানা ধরনের অনিয়ম ও জালিয়াতি হয়েছে। তারা বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

কর্মকর্তাদের দাবি: প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল প্রকল্প: বিআইডাব্লিউটিএর একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ঠিকাদার এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিলেন যে, তাদের সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো কর্মকর্তা কার্যত মতামত দেওয়ার সুযোগ পেতেন না।

বক্তব্য পাওয়া যায়নি: অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদ মোল্লার সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তদন্তের দাবি: অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রকল্পের আর্থিক অনিয়ম, টেন্ডার প্রক্রিয়া, বিল পরিশোধ, ভূমি অধিগ্রহণ ও নির্মাণকাজের মান পরীক্ষা করতে একটি স্বাধীন ও উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা উদঘাটন হলে প্রকল্পে সংঘটিত সম্ভাব্য অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।