ঠিকাদারের সাথে আঁতাত করে মোটা কমিশন গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে

গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মাসুদ রানা বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাত

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০২৬ ২০:৩৪:১৪

গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো: মাসুদ রানার বিরুদ্ধে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে ঠিকাদারের সাথে আঁতাত করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। কাজ সম্পন্ন না করেই গত অর্থ বছরের জুন ক্লোজিংয়ে বিল পরিশোধ করে এই অর্থ আত্মসাত করেছেন বলে জানা যায়। এছাড়াও পছন্দের ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নিয়ে তিনি কাজ পাইয়ে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

গত ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪ থেকে বেশ কিছু সরকারি বাসভবন ও বাসভবন সংলগ্ন বেশ কিছু কাজের দরপত্র আহবান করা হয়। এর মধ্যে ১২৩৫৭০৬ নং আইডি-এর দরপত্রটির কাজের মূল্য ছিল প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকার। এই দরপত্রে কাজ ছিল ‘ঢাকা বেইলি রোডের সরকারি কর্মকর্তা কোয়ার্টারের এশিয়ান, গুলফিশান ও কাহকাশান ভবনের ছাদ মেরামত, নিষ্কাশন ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, রাস্তা ও সীমানা প্রাচীর মেরামত এবং অন্যান্য মেরামত কাজ’।

সরেজমিনে অনুসন্ধান করে দেখা যায়, এই কাজ কোনরকমভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। কাজের মান খুবই নিম্নমানের। এই নিম্নমানের কাজের উপরেই মাসুদ রানা সম্পূর্ণ অর্থের বিল দিয়েছেন বলে জানা যায়। এইদিকে একই কাজ মাসুদ রানা দুইবার করার জন্য দরপত্র আহবান করেছেন। ১২৩৫৭০৬ দরপত্রের মধ্যেই ঢাকা বেইলি রোডের সরকারি কর্মকর্তা কোয়ার্টারের এশিয়ান, গুলফিশান ও কাহকাশান ভবনের সকল মেরামতের কথা উল্লেখ থাকলেও তিনি সরকারি কর্মকর্তা কোয়ার্টার গুলফিশান-এর ৭ নম্বর ফ্ল্যাটের জন্য আরেকটি মেরামতের দরপত্র লিমিটেড টেন্ডার মেথড-এ আহবান করেছেন। সেই দরপত্রের আইডি নং ১৩০৩৪৯১। কাজের মূল্য প্রায় ১২ লাখ টাকা। এখানে মাসুদ রানা বিগত অর্থ বছরে বকেয়া দেখিয়ে নতুন অর্থ বছরে এই দরপত্রটি আহবান করেছেন। একই কাজের জন্য দুই ধরনের দরপত্রে আহবান করাকে অর্থ আত্মসাতের আরেকটি কৌশল বলছেন গণপূর্তের কিছু ঠিকাদারেরা। তারা বলেন, এই কাজ আহবান করা হয়েছে সম্পূর্ণ টাকা আত্মসাতের জন্যই। কারণ এখানে কাজ করার কিছুই থাকবে না। কাজ আগের দরপত্রেই হয়ে গেছে। শুধুমাত্র করা কাজকেই আবার করা হয়েছে দেখিয়ে বিল উত্তোলন করবেন নির্বাহী প্রকৌশলী ও ঠিকাদার। পরে এই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিবেন।

গত অর্থ বছরের আরেকটি দরপত্র আইডি নং ১২৩৬১৩০ এর কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই গত অর্থ বছরের ক্লোজিংয়ে মাসুদ রানা বিল দিয়ে দিয়েছেন বলে জানা যায়। দরপত্রের কাজ ছিল ‘ইস্কাটন গার্ডেন সরকারি কর্মকর্তা কোয়ার্টারের সোনালী-রূপালী ক্যাম্পাসের সম্মুখভাগের জরাজীর্ণ সীমানা প্রাচীর পুনর্নির্মাণ’। সরেজমিনে সরকারি কর্মকর্তা কোয়ার্টারের সোনালী-রূপালী ক্যাম্পাসের সম্মুখভাগে গিয়ে দেখা যায় যে, সীমানা প্রাচীরের কাজ ৫০ শতাংশের মতো হয়েছে। এই সম্পন্ন ৫০ শতাংশ কাজের মধ্যেও আবার কিছু কিছু জায়গায় সীমানা প্রাচীর পুনর্নির্মাণ না করে পুরাতন সীমানা প্রাচীরই রেখে দেওয়া হয়েছে। দরপত্রটির কাজের মূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা। কাজ না করে এই সম্পূর্ণ বিল দিয়ে দেওয়াকে অনেকেই অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার বিনিময় বলছেন। অনেকে বলছেন, বিল না দিলে সরকারি অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত চলে যাবে এইজন্যই হয়ত বিল দিয়েছেন।  গণপূর্ত সংশ্লিষ্টরা বলেন, কাজ না হলে বিল সরকারি কোষাগারে ফেরত চলে যাবে। কাজ সম্পন্ন হলে আবার সেই বিল কোষাগার থেকে এনে দিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু সরকারি বিল কোষাগারে ফেরত চলে যাবে বলেই অসম্পূর্ণ কাজের উপর সম্পূর্ণ বিল দিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি।

এছাড়াও প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপন অমান্য করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪  এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ মাসুদ রানা এলটিএমের পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে প্রায় ৬৩টি দরপত্র আহবান করেছেন। দরপত্র আইডি নং গুলো হলো: ১২৯৫৬৫১, ১২৭৪২০৫, ১২৯৫৬৪৪, ১২৮২৩৫০, ১২৮২২৫৩, ১২৮১১৭৪, ১২৮২১৩৩, ১২৮৪৫৮৯, ১২৮৪৩৯৭, ১২৮২৩৪৮, ১২৯৬২৬০, ১২৭৬৮২২, ১২৭৫২৬৯, ১২৮৩৩৭৭, ১২৭৫৬৩২, ১২৭৫৪৭৮, ১২৮৪৫৯৭, ১২৮৩৫৬৮, ১২৮৩৭২০, ১২৮৩৭৫১, ১২৭২৮৩৮, ১২৮৪২৯৮, ১২৭৫৪০২, ১২৭৫৫২৮,  ১২৭৫৪২৯, ১২৭৫৬১২, ১২৭৫৫৭০, ১২৭৫৩৭১, ১২৭২৮১৮, ১২৭২৭৭৭, ১২৭২৮৩৩, ১২৭২৭৩, ১২৩৬৪১৯, ১২৪৪৯০৯, ১২৪৭৯৯৯, ১২৪৪৪৬১, ১২৩৬০৭৫, ১২৫২৭২৩, ১২৫২৩১০, ১২৪৮০২৩, ১২৩৫৭০৬, ১২৩৬২৩৯, ১২৫২৮৯৮, ১২৫২৭৫৪, ১২৫২৯২৯, ১২৪৭৯৮৯, ১২৪৮০০৪, ১২৫৮০১৮, ১২৪৮০১৯, ১২৪৭৭০৩, ১২৪৭৬৪৯, ১২৪৪৪৪৭, ১২১৯৫৯৮, ১২৪৫৭৪২, ১২১৭৬১৯, ১২১৯৬১০, ১২১৯৫৭৯, ১২১৯৬০৩, ১১৮৩৮০৫, ১২০২৭২৪, ১২০২৭১৮, ১২০২৭২৫, ১১৬৩৬২২। এই সকল দরপত্রই মো. মাসুদ রানা মোটা কমিশনের বিনিময়ে নিজের পছন্দের ঠিকাদারদেরকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।