তদন্ত ধামাচাপা দিতে সিএফ এর ছায়া! লামার ‘বনখেকো’ রেঞ্জার কবিরের খুঁটির জোর কোথায়?

​লামা (বান্দরবান) প্রতিনিধি
​লামা (বান্দরবান) প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ২৯, ২০২৬ ২০:৪২:৪৬

সেনাবাহিনীর হাতে রূপসীপাড়া ক্যাম্পে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অবৈধ কাঠবোঝাই দুই ট্রাক জব্দের ঘটনায় প্রথম পর্বের চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলেও রহস্যজনক কারণে এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন মূল অভিযুক্ত লামা সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা (ডেপুটি রেঞ্জার) কে এম কবির উদ্দিন। জহির প্রকাশ ‘জামাই জহির’ ও শফিক সিন্ডিকেটের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা উৎকোচ নিয়ে অবৈধ চলাচল পাশ দেওয়া, সচল ট্রাকে কাঠ মেপে ‘জাদুকরী’ ইউডিওআর মামলা সাজানো এবং একই কাঠের গায়ে সর্বোচ্চ নয়বার পর্যন্ত হাতুড়ির (হ্যামার) সিল মেরে তথ্যপ্রমাণ লোপাট করার মতো গুরুতর অপরাধের পরও তার বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বরং অপরাধ ধামাচাপা দিতে তাকে দেওয়া হচ্ছে এক অদৃশ্য শক্তির ছায়া। অথচ লামা বন বিভাগের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, ঠিক একই ধরণের গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে বিগত ২০২৩ সালেও তৎকালীন তৈন রেঞ্জের রেঞ্জার খান জুলফিকার আলী, বিট কর্মকর্তা মোজাম্মেল হোসেন সহ আরও দুই কর্মচারীকে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সদর রেঞ্জার কে এম কবির উদ্দিনের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন নীতি ও নজিরবিহীন নমনীয়তা প্রদর্শন করা হচ্ছে, যা নিয়ে খোদ বন বিভাগের সৎ কর্মকর্তা ও সাধারণ কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।

​অনুসন্ধানে জানা গেছে, রেঞ্জার কবিরের এই অস্পৃশ্য থাকার নেপথ্যে রয়েছে বন অধিদপ্তরের সর্বোচ্চ মহলের আশীবার্দ ও গভীর প্রটেকশন। গত ২৫ জুন ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দো লামা বন বিভাগ পরিদর্শনে গিয়ে আলোচনা সভায় টিপি জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার পরও কবিরের ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের দাবি, সিএফ মিহির কুমার দো কবিরের পূর্বপরিচিত ও অত্যন্ত নিকটবর্তী হওয়ায় এবং তাদের মধ্যে বড় অঙ্কের অনৈতিক লেনদেনের সম্পর্ক থাকায় তিনি মূলত কবিরের এই মহাসংকটে তার পাশে দাঁড়াতে এবং অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করতেই লামা সফর করেছিলেন। সিএফ মিহির কুমারের এই প্রত্যক্ষ ছত্রছায়াতেই কবির উদ্দিন বর্তমানে আইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে সমস্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন।

​অভিযোগ রয়েছে, সিএফ মিহির কুমার দো’র এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ‘ছাতা’ বা ছায়া দিয়ে রাখার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ ও পুরোনো। তিনি যখন খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন, তখনও সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সাবেক ডিএফও ড. আবু নাছের মোহাম্মাদ মহাসিন এর যাবতীয় বড় বড় কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতি আড়াল করার বিনিময়ে ২০% হারে পারসেন্টেজ বাণিজ্যে লিপ্ত ছিলেন। তৎকালীন সময়ে সুন্দরবনের ডলফিন প্রকল্প, সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্প ও সুপেয় পানির জন্য পুকুর খনন প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা নয়ছয় করে সিএফ মিহির কুমার দো’কে নিয়মিত নির্দিষ্ট হারে পারসেন্টেজ দিতেন ওই ডিএফও। যার ফলে একাধিক জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় সচিত্র অনুসন্ধানী নিউজ প্রকাশের পরেও সেই দুর্নীতিবাজ ডিএফও স্বয়ং সিএফ মিহির কুমারের দুর্ভেদ্য সুরক্ষায় বহাল তবিয়তে রক্ষিত ছিলেন। শুধু তাই নয়, পতিত আওয়ামী স্বৈরাচার সরকারের একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতার সাথে মিহির কুমারের গভীর রাজনৈতিক সক্ষতা ও দহরম-মহরম থাকায় তার এবং তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দাখিল করার পরেও সুন্দরবনের সাধারণ জেলেরা কোনো সুরাহা বা বিচার পায়নি; বরং প্রতিবারই পার পেয়ে গেছেন এই বন কর্মকর্তা।

​খুলনার পর এবার চট্টগ্রাম অঞ্চলেও মিহির কুমার দো’র একই কৌশলে অপরাধীদের আশকারা দেওয়ার নীতি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। খোদ লামা এলাকার এক প্রভাবশালী কাঠ ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন যে, রেঞ্জার কবিরের ওপর আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগ বা তাকে স্পর্শ করবে এমন কোনো মহল বর্তমানে চট্টগ্রাম অঞ্চলে নেই, কারণ কবির নিজেই বিভিন্ন মহলে দম্ভোক্তি করে বেড়ান যে স্বয়ং প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) তাকে সরাসরি মোবাইল ফোনে কল দিয়ে কথা বলেন এবং তার সব বিষয় দেখেন।

​এদিকে বিভিন্ন প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে লামা বন বিভাগের ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমান একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে বাধ্য হন। কে এম কবির কর্তৃক দাখিলকৃত ইউ.ডি.ও.আর বন মামলা নং-৪৮ ও ৪৯/লামা অব ২০২৫-২০২৬ এর কাঠ ও জব্দ তালিকা নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া রহস্যের প্রকৃত সত্য উদঘাটনে গঠিত এই তিন সদস্যের কমিটিতে সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মাসুম আলমকে আহ্বায়ক, তৈন রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা (ডেপুটি রেঞ্জার) খন্দকার আরিফুল ইসলামকে সদস্য এবং ডলুছড়ি রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা (ডেপুটি রেঞ্জার) এ.কে.এম আলতাফ হোসেনকে সদস্য সচিব করা হয়। কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, অভিযুক্ত রেঞ্জার কে এম কবির উদ্দিন এই তদন্ত কমিটিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চরম ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক এসিএফ মাসুম আলমকে স্পটে বা ট্রাকের কাছে না যাওয়ার শর্তে মোটা অঙ্কের উৎকোচ প্রদান করেন কবির। একই সাথে কমিটির বাকি দুই সদস্যকেও সম্পূর্ণ 'ম্যানেজ' করে ফেলেন তিনি।

​তদন্ত কমিটির এই নজিরবিহীন নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে অভিযুক্ত কে এম কবির উদ্দিন তদন্তে কোনো রাখঢাক না রেখেই নিজের রেঞ্জে কর্মরত নিজস্ব স্টাফদের নিয়ে নিজেই গাড়ি দুটি আনলোড করেন। গাড়ি আনলোডের সময় তদন্ত কমিটির কোনো সদস্যকেই সেখানে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়নি। চোর নিজেই নিজের মামলার তদন্ত ও আলামত সাজানোর মতো করে কবির উদ্দিন ট্রাকে থাকা কাঠের জাত, ডিজিট, পরিমাপ এবং পূর্বের বিতর্কিত হাতুড়ির চিহ্ন হুবহু মিলিয়ে নিজের পক্ষে একটি মনগড়া তালিকা প্রস্তুত করেন এবং সেই তৈরিকৃত নথিতে তদন্ত কমিটিকে শুধু স্বাক্ষর করার জন্য চাপ প্রদান করছেন। একাধিক স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে আগে ইস্যু করা ভুয়া টিপি, আদালতে দাখিল করা অসঙ্গতিপূর্ণ জব্দ তালিকা এবং ট্রাকে থাকা বাস্তবিক কাঠের পরিমাপের সাথে বাস্তব ক্ষেত্রে কোনো মিল থাকার সুযোগই ছিল না। এখন যদি তদন্ত রিপোর্টে অলৌকিকভাবে সব হিসাব মিলেও যায়, তবে সেটি যে তদন্ত কমিটিকে মোটা অঙ্কের টাকায় কিনে এবং যোগসাজশ করেই মেলানো হয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।