সমুদ্রের অগ্রযাত্রায় হারিয়ে যাচ্ছে উপকূলের চেনা জনপদ

এস এম সাইফ আলী
এস এম সাইফ আলী
প্রকাশিত: জুন ২৮, ২০২৬ ১৭:৫৩:৫২

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এখন উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জন্য এক কঠিন বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। একসময় যে জনপদ ছিল মানুষের বসতি, কৃষিজমি আর জীবিকার কেন্দ্র, সেসব এলাকা ধীরে ধীরে নদী ও সাগরের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। উপকূলজুড়ে ভাঙন, লবণাক্ততা, জলোচ্ছ্বাস এবং ভূমি নিমজ্জনের আশঙ্কা স্থানীয় মানুষের জীবনে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে আগামী কয়েক দশকে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে।

জলবায়ু গবেষক ডক্টর নওশাদ করিম জানান, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নিম্নাঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে। তিনি বলেন, “উপকূলীয় এলাকায় ক্ষয় ও নিমজ্জনের হার আগের তুলনায় বেড়েছে। অনেক জায়গায় জোয়ারের পানি এখন আগের চেয়ে অনেক ভেতরে প্রবেশ করছে। এর ফলে শুধু জমিই হারাচ্ছে না, হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তিও।”

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বাস্তব চিত্র আরও উদ্বেগজনক। সাতক্ষীরা, ভোলা, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও বরগুনার অনেক এলাকায় নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসে বাড়িঘর বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার বাসিন্দা আবদুল মান্নান বলেন, “যে মাঠে ছোটবেলায় খেলেছি, এখন সেখানে পানি। কয়েকবার ঘর সরিয়েছি, কিন্তু কতদিন এভাবে টিকে থাকা যাবে জানি না।” একই এলাকার গৃহিণী রওশন আরা জানান, “লবণাক্ততার কারণে টিউবওয়েলের পানি খাওয়া যায় না। জমিতে আগের মতো ফসলও হয় না। মনে হয় ধীরে ধীরে সবকিছু হারিয়ে ফেলছি।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূল তলিয়ে যাওয়ার প্রভাব কেবল বসতভিটা হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষিজমি নষ্ট হওয়ায় খাদ্য উৎপাদন কমছে, সুপেয় পানির সংকট বাড়ছে, আর জীবিকার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। পরিবেশ প্রকৌশলী ডক্টর সাদিয়া রহমান বলেন, “সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়ার ফলে লবণাক্ততা অভ্যন্তরীণ এলাকাতেও প্রবেশ করছে। এতে কৃষি, মৎস্য ও পানিসম্পদ সব খাতেই দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে।”

জলবায়ু উদ্বাস্তু সমস্যাও দিন দিন প্রকট হচ্ছে। উপকূলীয় অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে শহরমুখী হচ্ছে। খুলনার এক বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম জানান, নদীভাঙনে জমি হারিয়ে তিনি পরিবার নিয়ে ঢাকায় চলে এসেছেন। তিনি বলেন, “গ্রামে থাকার মতো অবস্থা ছিল না। কাজের জন্য শহরে এসেছি, কিন্তু এখানেও জীবন সহজ নয়।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অভ্যন্তরীণ অভিবাসন শহরের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করতে পারে।

স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে উপকূলীয় অঞ্চলে। লবণাক্ত পানি ব্যবহারের কারণে উচ্চ রক্তচাপ, চর্মরোগ ও পানিবাহিত রোগের প্রবণতা বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডক্টর ফারহানা কবীর জানান, “নারী ও শিশুদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। সুপেয় পানির সংকট তাদের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলছে।”

সাধারণ মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ স্পষ্ট। কক্সবাজারের শিক্ষক আবু তাহের বলেন, “আমাদের প্রজন্ম হয়তো কোনোভাবে টিকে থাকবে, কিন্তু আগামী প্রজন্মের জন্য কী থাকবে তা নিয়ে ভয় হয়।” বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রাইসা ইসলাম মনে করেন, জলবায়ু সংকট এখন শুধু বিজ্ঞানীদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি মানুষের অস্তিত্বের প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট মোকাবিলায় উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী করা, ম্যানগ্রোভ বন সম্প্রসারণ, লবণসহনশীল কৃষি প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আধুনিক করা জরুরি। পাশাপাশি বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রশ্নেও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

পরিবেশবিদ ডক্টর মাহির আনাম বলেন, “উপকূলের হারিয়ে যাওয়া জনপদ আমাদের সতর্ক করছে যে জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের সংকট নয়, এটি বর্তমান বাস্তবতা। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়-আমরা কি প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের পথ বেছে নেব, নাকি আরও বড় বিপর্যয়ের অপেক্ষায় থাকব?”

বিশ্লেষকদের মতে, সমুদ্রের অগ্রযাত্রায় হারিয়ে যাওয়া উপকূলের জনপদ কেবল ভৌগোলিক পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি মানুষের স্মৃতি, সংস্কৃতি, জীবিকা ও অস্তিত্ব হারানোর বেদনাও। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে আরও অসংখ্য পরিচিত জনপদ মানচিত্র থেকে মুছে যেতে পারে।