বিসিএসের দাপট ও ‘ক্যাশিয়ার’ মুরাদ ও স্বাধীন রাঙামাটি বন বিভাগের দুর্নীতির বর সাজ্জাদ শাহী

সরকারি বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার গুরুদায়িত্ব যাঁর কাঁধে, তিনিই মেতে উঠেছেন বন উজাড়ের মহোৎসবে। রাঙামাটির দক্ষিণ বন বিভাগ এখন কার্যত দুর্নীতির এক দুর্ভেদ্য আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে সরাসরি আঙুল উঠেছে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এস এম সাজ্জাদ হোসেনের বিরুদ্ধে, যিনি সংশ্লিষ্ট মহলে ‘ক্রিম’ নামে সমধিক পরিচিত। ক্ষমতার অপব্যবহার, অবাধে নিয়োগ বাণিজ্য এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল সাবাড়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাহাড়সম অভিযোগ জমা হয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। সরকারি বেতনভুক্ত একজন কর্মকর্তা হয়েও রাঙামাটি অঞ্চলে চাকরির সুবাদে যেন আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়েছেন তিনি। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত কালো টাকা দিয়ে তিনি কেবল নিজের জীবনযাত্রাই খোল নলচে বদলে ফেলেননি, গড়ে তুলেছেন বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পাহাড়। স্থানীয় ও তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, ডিএফও সাজ্জাদ হোসেন তাঁর নিজ গ্রাম সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের কাদল মাদাইয়ে বিশাল আয়োজনে একটি ছয় তলা বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করছেন, এর পাশাপাশি রাজধানীর অভিজাত এলাকা উত্তরায় কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটও কিনেছেন তিনি।
ডিএফও সাজ্জাদের এই বিশাল অবৈধ আয়ের প্রধান উৎস হলো ভুয়া জোত পারমিট ও বদলি বাণিজ্য। আর এই পুরো আর্থিক লেনদেন ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের মূল কুশীলব হিসেবে কাজ করছেন দক্ষিণ বন বিভাগের সদর রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার খন্দকার মাহমুদুল হক ওরফে মুরাদ। পুরো রাঙামাটি অঞ্চলে মুরাদ ডিএফও সাজ্জাদের ‘এক নম্বর ক্যাশিয়ার’ ও চাঁদা আদায়কারী হিসেবে পরিচিত। ভুয়া জোত পারমিট ইস্যু, বদলি বাণিজ্য থেকে শুরু করে অবৈধ কাঠের গাড়ি লোডিংয়ের যাবতীয় লেনদেন অত্যন্ত সুকৌশলে সম্পন্ন করেন এই মুরাদ। এমনকি প্রতিটি রেঞ্জ অফিস থেকে মাসিক ‘খরচ’ বাবদ যে ১ লক্ষ টাকা করে মাসোহারা নেওয়া হয়, তাও রেঞ্জগুলো থেকে তুলে ডিএফও-র হাতে পৌঁছে দেন তিনি। এই সিন্ডিকেটের কারণে নিয়মিত অবৈধ ও ভুয়া পারমিট ইস্যু করা হচ্ছে, যেখানে প্রতি ঘনফুট কাঠ পারমিটের জন্য ডিএফও-কে ৩৫ টাকা হারে সরাসরি উৎকোচ দিতে হয়। অন্যদিকে, ডেপুটি রেঞ্জার খন্দকার মাহমুদুল হক দিনদুপুরে ভুয়া জোতের টিপি (ট্রান্সপোর্ট পারমিট) তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করেন। কাঠের গাড়ি লোডিংয়ের ক্ষেত্রে তিনি ডিএফও-র নাম ভাঙিয়ে গাড়ি প্রতি ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা করে আদায় করেন। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, রাঙামাটি থেকে ছেড়ে আসা প্রতিটি কাঠের গাড়ি যদি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যেকোনো স্টেশনে আকস্মিক আটকে তল্লাশি করা হয়, তবে দেখা যাবে অধিকাংশ কাঠের পরিমাণের সাথে অফিশিয়াল টিপির কোনো মিল নেই।
এই চরম প্রশাসনিক নৈরাজ্যের মধ্যেই ডিএফও সাজ্জাদ হোসেন বন অধিদপ্তরের সমস্ত বিদ্যমান নীতিমালাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সম্পূর্ণ নিজের দাম্ভিকতায় ৩০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে মো: ওমর ফারুক স্বাধীন নামে এক ফরেস্ট রেঞ্জারকে রাইংখিয়ংমুখ বনশুল্ক ও পরীক্ষণ ফাঁড়ি হতে বরকল বনশুল্ক ও পরীক্ষণ ফাঁড়িতে বদলি করেছেন, যা বদলি নীতিমালার চরম অবমাননা। সাজ্জাদ হোসেনের এমন বেপরোয়া আচরণের নেপথ্যে রয়েছে ব্যাচভিত্তিক ক্ষমতার দাপট। জানা গেছে, বর্তমান প্রধান বন সংরক্ষক ও বন সংরক্ষকসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা সবাই একেই বিসিএস ব্যাচের হওয়ায় তিনি কাউকেই পরোয়া করেন না এবং কাউকে কোনো মূল্যায়নও করেন না, যা সুষ্পষ্ট প্রশাসনিক অবমূল্যায়ন ও গুরুতর অসদাচরণের শামিল। এদিকে বিপুল অঙ্কের ঘুষ দিয়ে বরকলে পদায়ন পাওয়া রেঞ্জার ওমর ফারুক স্বাধীন ‘কারও পরাধীন না থাকার’ নীতিতে চলছেন। বরকলে পোস্টিং পেয়েই তিনি সেখানকার সংরক্ষিত বনাঞ্চল দেদারসে উজাড় করে বছরে কোটি টাকা আয়ের মিশনে নেমে পড়েছেন। এই অবৈধ সাম্রাজ্য আরও মসৃণ করতে রেঞ্জার স্বাধীন এখন কাপ্তাই রেঞ্জে কর্মরত ফরেস্ট গার্ড (এফজি) মো: ছাব্বির হোসেনকে বদলি করে বরকলে নিয়ে যাওয়ার জন্য জোর তদবির চালাচ্ছেন এবং এর জন্য তিনি ডিএফও সাজ্জাদকে আরও ১০ লক্ষ টাকা অগ্রিম দিয়েছেন বলে জানা গেছে। মূলত কাপ্তাই রেঞ্জে কর্মরত থাকাকালীন এফজি ছাব্বির হোসেন ও অফিস সহায়ক ওসমান গণি রেঞ্জারের অবৈধ আয়ের প্রধান সংগ্রাহক বা কালেক্টর হিসেবে সমস্ত মাঠপর্যায়ের কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন, আর সেই একই সিন্ডিকেট এখন বরকলে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে।
ডিএফও সাজ্জাদের এমন প্রত্যক্ষ মদদ ও ছত্রছায়ায় রাঙামাটির সামগ্রিক প্রাকৃতিক ভারসাম্য আজ ধ্বংসের মুখোমুখি। তাঁর এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারণে কাপ্তাই রেঞ্জ, কর্ণফুলী রেঞ্জ, ফারুয়া রেঞ্জ এবং আলিখিয়াং রেঞ্জের চিরহরিৎ সংরক্ষিত বন আজ সম্পূর্ণ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। বিশেষ করে কাপ্তাই খাল মুখ বিটের চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ, যেখান থেকে প্রতিদিন দিনদুপুরে প্রকাশ্যে সরকারি মূল্যবান গাছ কেটে পাচার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের প্রকাশ্য অভিযোগ, এই কাঠ পাচার চক্রের মূল গডফাদার স্বয়ং ডিএফও সাজ্জাদ এবং এই একটি মাত্র বিট থেকে নির্বিঘ্নে কাঠ পাচারের গ্রিন সিগন্যাল দেওয়ার বিনিময়ে তিনি প্রতি মাসে ২ লক্ষ টাকা করে নিয়মিত মাসোহারা পকেটে ভরছেন। একজন দায়িত্বশীল বিভাগীয় বন কর্মকর্তার এমন প্রকাশ্য ও বেপরোয়া বনখেকো কর্মকাণ্ড এবং একের পর এক দুর্নীতির অকাট্য তথ্য থাকার পরও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের রহস্যজনক নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা এখন স্থানীয় সর্বস্তরের জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
