গণপূর্তের প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলমের বেপরোয়া লুটপাটে বিধস্ত গণপূর্ত কাঠের কারখানা

গণপূর্ত কাঠের কারখানার প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বিশেষ কৌশলে কাজ পাইয়ে দেয়ার নামে নীরব হরিলুটের সাম্রাজ্য কায়েম করছেন। এতে করে শোষিত, বঞ্চিত হচ্ছে লাইসেন্সধারী সাধারণ ঠিকাদারগণ। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর গত ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে গণপূর্ত কাঠের কারখানা ডিভিশনটির দায়িত্বে এসে ঘুষ বাণিজ্যে বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করেন সাধারণ ঠিকাদারদের ওপরে। বিভিন্ন প্রকল্পের এষ্টিমেটগুলো তিনি অগ্রীম ৩ থেকে ৪ শতাংশ কমিশন নিয়ে ৪ থেকে ৫ জন ঠিকাদারের কাছে বিক্রি করেন। আবার সবাইকে গোপনে রেটকোটেশন জানিয়ে দেন। একইসাথে ফার্নিচার প্রস্তুতকারক বিভিন্ন কোম্পানীর লোকজনকে তিনি ডেকে আনেন। তাদের কাছ থেকেও বড় ধরণের সুবিধা নিয়ে গোপন রেটকোটেশন জানিয়ে দেন। এরপরে কোম্পানীসহ গোপন রেটকোটেশন প্রাপ্ত ঠিকাদারেরা ওই টেন্ডারে অংশগ্রহণ করেন। তবে টার্নওভারসহ বিভিন্ন শর্তের বেড়াজলে ফার্নিচার প্রস্তুতকারক কোম্পানীই বেশীরভাগ ক্ষেত্রে কাজ পেয়ে যায়। এর ফলে যাদের কাছ থেকে অগ্রীম কমিশন নিয়েছেন তারা যোগাযোগ করলে বলেন, আপনাকে বা আপনাদেরকে তো রেটকোটেশন দিয়ে দিয়েছি। কাজ না পেলে কী আর করবো? আমিতো আপনাকেই কাজ দিতে চেয়েছিলাম। যাক, অপেক্ষা করেন পরের লটে কাজ পাইয়ে দিবো। এভাবে সবাইকে আশ্বাস দিয়ে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে আটকিয়ে মাসের পর মাস ঘুরিয়ে কারো ভাগ্যে ছিটেফোটা কাজ জুটে, আবার কারো ভাগ্যে আরো অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। আবার যদি সাধারণ ঠিকাদার কাজ পেয়ে গেলে তখন প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর অন্য বিশেষ কৌশলের আশ্রয় নেন। তখন বলেন, আপনাকে কাজ দিতে গিয়ে বা কাজ পাইয়ে দিতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। এই কাজকে ভাগ করে অর্ধেক ‘ফার্নিচার কনসেপ্ট’ নামক প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে দেন বা মালামাল ফার্নিচার কনসেপ্টকে দিয়ে বানিয়ে আনেন। মূলতঃ ‘ফার্নিচার কনসেপ্ট’ এর নামে নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর নিজেই পরোক্ষভাবে ব্যবসা করছেন। সাধারণ ঠিকাদারকে তিনি (প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর) কোথায় বা কোন প্রতিষ্ঠান থেকে মালামাল তৈরী করবে তা নির্ধারণ করে দেন। মৌখিকভাবে হুমকী দেন, ওই প্রতিষ্ঠান থেকে মালামাল না নিলে বা মালামাল তৈরী না করলে চুক্তিপত্র বা নোয়া বাতিল করা হবে। এ ধরনের হুমকীতে পড়ে সাধারণ ঠিকাদারগণ প্রকৌশলী জাহাঙ্গীরের নির্দেশিত কারখানা বা প্রতিষ্ঠান থেকে মালামাল তৈরী করান বা মালামাল কিনে থাকেন। এভাবে ঘুষ বাণিজ্যের কারণে ভাবমূর্তি সংকটে পড়ছেন গণপূর্ত প্রকৌশলীরা। পাশাপাশি গণপূর্তের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী জনাব খালেকুজ্জামানের নাম করেও তিনি বিভিন্ন কোম্পানীর কাছ থেকে কমিশন আদায় করেন বলেও নির্ভরযোগ্য সত্র জানায়।
আরো জানা যায়, হাইকোর্ট সুপ্রীমকোর্টে যে সকল সাধারণ ঠিকাদার ইতোপূর্বে বছরের পর বছর গুণগত ফার্নিচার বা আসবাবপত্র সাপ্লাই দিতো তারা প্রকৌশলী জাহাঙ্গীরের স্পেশাল লুটপাটের কৌশলের কারণে আর কাজ পাচ্ছে না। নিজের পছন্দের ঠিকাদার ও কোম্পানীকেও সেখানে সুযোগ করে দিয়েছেন শিয়ালের চেয়েও বেশী ধূর্ত এই দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী। ফার্নিচার কনসেপ্ট এন্ড ইনটেরিয়র এলটিডি নামক কোম্পানীটি চলমান অর্থবছরে নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীরের সহায়তায় অসংখ্য কাজ বাগিয়ে নিয়েছে। এর মধ্যে ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৪৫ হাজার আটশত দুই টাকা একান্ন পয়সা টাকা চুক্তিমূল্যে ২০২৫/১৩ নং লটে মডেল মসজিদ প্রকল্পে ৭টি উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক কালচারাল সেন্টারে আসবাবপত্র সরবরাহ ও স্থাপন কাজ, একই অর্থবছরে একই প্রকল্পে ২০২৫/৩ নং লটে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৩৭ হাজার নয়শত দুই টাকা একান্ন পয়সা চুক্তিমূল্যে আরো ৭টি মডেল মসজিদে একই কাজ, একই অর্থবছরে ২০২৫/৪নং লটে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৩৭ হাজার নয়শত দুই টাকা একান্ন পয়সা নির্ধারিত বরাদ্দে অন্য ৭টি মসজিদে একই ধরণের কাজগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোম্পানীটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় রায়েবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ২৭ লাখ ৩৬ হাজার একশত টাকা চুক্তিমূল্যে ফার্নিচার ও ফিটিং ফিক্সারস সরবরাহ ও স্থাপণ, একই অর্থবছরে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ নায়েব সুবেদার আশরাফ আলী খান বীরবিক্রম লাইব্রেরী ও গবেষণাগার নির্মাণ প্রকল্পে ১ কোটি ৮২ লাখ ৩৪ হাজার সাতশত টাকা চুক্তিমূল্যে ফার্নিচার সরবরাহ ও স্থাপণ কাজ, একই অর্থবছরে পাবলিক লাইব্রেরীর বহুমুখী ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৩০ হাজার সাতশত ছাপান্ন টাকা উনসত্তুর পয়সা চুক্তিমূল্যে ফানিচার সরবরাহ কাজ, যদিও ভবনের ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ কাজ এখনও শেষ হয়নি। দুর্নীতি আর কারসাজির নাটেরগুরু প্রকৌশলী জাহাঙ্গীরের বদৌলতে এরকম আরো বহু কাজ ফার্নিচার কনসেপ্টের পাওয়ার অপেক্ষায় আছে।
এছাড়াও আকতার ফার্নিচারস্ নদীয়া ফার্নিচার ও হাতিল নামক কোম্পানীগুলো কয়েক কোটি টাকার বেশকিছু কাজ বাগিয়ে নিয়েছে প্রকৌশলী জাহাঙ্গীরকে স্পেশালভাবে ম্যানেজ করে বা বিভিন্ন ধরণের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে। কোন কোন কোম্পানী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীরের মনোরঞ্জনের জন্য কুয়াকাটা কক্সবাজার পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশ-বিদেশের বিভিন্ন লোকশনে বান্ধবীসহ প্লেজার ট্রিপের ব্যবস্থা করে বেশ কয়েকবার ঘুরিয়ে এনেছে বলেও নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়। অবৈধ অর্থের জোড়ে ইতোপূর্বে বহুল বিতর্কিত নায়িকা পরিমনিকে নিয়েও ঢাকা বোটক্লাবে বহুবার একান্তে সময় কাটিয়েছেন বলেও পূর্ত প্রকৌশলীদের মধ্যে ব্যাপক জনশ্রুতি আছে।
এছাড়া স্বৈরাচার লীগ সরকারের সময়ে প্রায় ৬ বছর ই/এম ২নং গণপূর্ত বিভাগের দায়িত্বে থাকতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে অনিয়ম দুর্নীতি ও এপিপির কাজে নিজেই বেনামী ঠিকাদারী ব্যবসা করে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা লোপাট করেন এই প্রকৌশলী নামের দুর্নীতিবাজ গণপূর্ত কর্মকর্তা। এ রকম বহু অভিযোগে ২০২৪ এর প্রথমদিকে তাকে গণপূর্ত রাজশাহী জোনের পিএন্ডডিতে বদলী করা হয়। কিন্তু অবৈধ অর্থের জোড়ে ৭ মাসের ব্যবধানে তিনি পুনরায় ঢাকার কাঠের কারখানা স্পেশাল ইউনিটে বীরদর্পে ফিরে এসে নিজের লুটপাটের তীর্থভূমি কিছুটা হলেও উদ্ধার করতে সমর্থ হন। এখন বিতর্কিত প্রমোশনকে সামনে রেখে আখেরী লুটপাটে নিজেকে আত্ম নিয়োগ করেছেন প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম। ননক্যাডার ১১জনের সিনিয়রিটি নিয়ে আদালতের স্থগিতাদেশ সত্ত্বেও বিশেষ কৌশলে বর্তমান গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলামকে ম্যানেজ করে পদোন্নতির বিষয়টি চূড়ান্ত করেছেন বলে জানা গেছে। ডিপার্টমেন্টের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হকের মাধ্যমে সচিবকে ২ কোটি টাকা দিয়েছেন বলে প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর বন্ধু মহলে বলে বেড়াচ্ছেন।
চাকরিজীবনে এভাবে অনিয়ম দুর্নীতি আর লুটপাটের মাধ্যমে গণপূর্ত প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বর্তমানে মোহাম্মদপুরের তাজমহল রোডে ২টি বিলাশবহুল স্টুডিও এপার্টমেন্ট, সাভার ও আশুলিয়ায় জমিসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চাপাইনবাবগঞ্জে ২টি বিশাল আমবাগান সহকারে নামে-বেনামে অর্ধশতাধিক কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে জানা গেছে।
বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার জন্য এই প্রতিবেদক নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীরের মোবাইলে অসংখ্যবার ফোন দিলেও কোন রেসপন্স না পাওয়ায় মতামত নেওয়া সম্ভব হয়নি।
