এননটেক্স গ্রুপকে ঋণ প্রদানকারীরা থাকবেন ধরাছোঁয়ার বাইরেই!

নানা টালবাহানার পর অবশেষে ব্যাংক খাতের আলোচিত এননটেক্স গ্রুপের সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার খেলাপী ঋণ আদায়ে মামলা করেছে জনতা ব্যাংক। অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে দেওয়া এসব ঋণ ২০১৯ সালে খেলাপি হয়। অভিযোগ রয়েছে, যারা ওই ঋণ প্রদানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন এমন বেশ কয়েকজন কর্মকর্তারাই মামলা তদন্তের দায়িত্বে থাকছেন। এজন্য আলোচনা রয়েছে, হাজার কোটি টাকার এই খেলাপী ঋণের টাকা আদায় করতে পারবে না ব্যাংকটি। উল্টো যারা এই অনিয়মে জড়িত তারাই রয়ে যাবেন ধরা ছোঁয়ার বাইরেই। ব্যাংক জুড়ে আলোচনা রয়েছে, ঋণ খেলাপীদের থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে তাদের রক্ষায় মরিয়া হয়ে উঠেছে জনতা ব্যাংকের একটি সংঘবদ্ধ চক্র। যারা বছরের পর বছর আর্থিক সুবিধা নিয়ে ঋণ খেলাপীদের রক্ষায় কাজ করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে চলেছেন। আর এদের ষড়যন্ত্রেই ক্রমশ ব্যাংকটি এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
জানা গেছে, এ্যাননটেক্সের গ্রুপভুক্ত ২২টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে জনতা ব্যাংক থেকে প্রদত্ত প্রায় সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার ঋণের বিষয়ে বহু আগেই গুরুতর অনিয়মের অভিযোগের তথ্য প্রমাণ পায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এই বছরের শুরুতে গুরুতর সেসব অনিয়মের বিষয়ে জানার পর জড়িতদের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জনতা ব্যাংককে নির্দেশনাও দেয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘চিহ্নিত অনিয়মের বিষয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক/শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহন না করার বিষয়ে তলবকৃত ব্যাখ্যার জবাবে আপনাদের ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃক উক্ত পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। উক্ত পত্র মাধ্যমে প্রেরিত জবাব যাচিত জবাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় মর্মে প্রতীয়মান হয়েছে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়, ওই গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ঋণ অনুমোদন, বিতরণ, মূল্যায়ণ সর্বোপরি প্রক্রিয়াকরনের ক্ষেত্রে ঋণ নিয়মাচার অনুসরণ করা হয়নি এবং যারা এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত তার একটি তালিকা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য একটি এ্যাকশন প্ল্যানের নমুনা সন্নিবেশ করা হয়েছে। সেই বিষয়ে প্রযোজনীয় নির্দেশনা প্রদান করার পরও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যারা রয়েছেন তারা কোনো ধরনের পদক্ষেপই গ্রহন করেননি যা অনভিপ্রেত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া চিঠির ৮ মাস পরে এননটেক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে মামলা করেছে জনতা ব্যাংক। তবে অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন পর অনেকটা দায় এড়াতে মামলা করা হলেও আলোচিত ওই ব্যবসায়ি গ্রুপের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ব্যবস্থাই নেবে না জনতা ব্যাংক। এক ঊধতন কর্মকর্তা আজকের সংবাদকে বলেন, এমন সময় এই মামলা হয়েছে যখন ঋণ খেলাপীদের সঙ্গে ব্যাংকের তরফ থেকে কোনো ধরনের যোগাযোগই করা যাচ্ছে না বা হচ্ছে না। তাই চোখ বন্ধ করেই বলা হয় দায় এড়াতে ব্যাংক মামলাটি করেছে। এতে ব্যাংক লাভবান তো হবেই না উল্টো আরো বিতর্কিত ও সমালোচিত হবে।
উদাহরন দিতে গিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকের আরেক শীর্ষ কর্মকর্তা আরেক ঋণ খেলাপী বেক্সিমকো গ্রুপকে এখন আরো ৪ শ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার কথাও ভাবছে। জনতা ব্যাংকের খেলাপী ঋণের পরিমান যেখানে ৭২ হাজার কোটি টাকা। যার মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের ২৬টি কোম্পানির নামে ২৩ হাজার ২৮২ কোটি টাকা অর্থাৎ ৩২ শতাংশ খেলাপী ঋণ রয়েছে। এই ২৬টি কোম্পানির মধ্যে বেশ কয়েকটি নাম সর্বস্ব হলেও সেটি আদায়ে ব্যাংকে কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না বলেও জানান ওই ঊর্ধতন ব্যাংক কর্মকর্তা।
এননটেক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে করা মামলার পর আদালত এক আদেশে বলেছেন, যেসব কর্মকর্তার দায়িত্ব অবহেলা ও যোগসাজশের কারণে আইনগত ব্যবস্থা নিতে এত দেরি হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ৯০ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নিয়ে আদালতকে অবহিত করতে হবে। গত বৃহস্পতিবার ঢাকার অর্থঋণ আদালত ৫-এর বিচারক মুজাহিদুর রহমান এ আদেশ দেন। প্রসঙ্গত, এর আগে এননটেক্সের ঋণ জালিয়াতি নিয়ে দুদক একাধিক মামলা করে। তবুও আলোচিত এই গ্রুপটির টনক নড়েনি। বরং গ্রুপের দায়িত্বশীলরাও রয়েছেন বহাল তবিয়তেই।
জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে এননটেক্স গ্রুপের সিমরান কম্পোজিটের বিরুদ্ধে গত বুধবার মামলা রুজু হয়। মামলার পর্যবেক্ষণে আদালত জানিয়েছেন, একক গ্রাহকের ঋণসীমা লঙ্ঘন করে এননটেক্স গ্রুপকে বিপুল অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয় ২০১২ সালে। বারবার সুদ মওকুফ ও ঋণ পরিশোধে বাড়তি সময় পাওয়ার পরও পরিশোধ করেননি গ্রাহক। ঋণ আদায়ে ২০১৯ সালে মামলা করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। এর পরও আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে একের পর এক সুদ মওকুফ করা হয়। ঋণ বিতরণ এবং বারবার সুদ মওকুফের ক্ষেত্রে যাবতীয় ব্যাংকিং নিয়মাচার লঙ্ঘন হয়েছে।
২০২২ সালের পর গ্রাহক এক টাকাও পরিশোধ করেননি। ওই সময়ে ঋণ পুনঃতপশিলের ক্ষেত্রে ডাউন পেমেন্টের টাকাও পরিশোধ করেননি গ্রাহক। এর পরও ঋণ নিয়মিত দেখিয়ে গ্রাহককে অন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ অবারিত রাখা হয়।
জনতা ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এননটেক্স গ্রুপের কাছে বর্তমানে ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার বেশি। বিগত সরকারের সময়ে এককালীন এক্সিট সুবিধার আওতায় ২০২২ সালের নভেম্বরে শর্তসাপেক্ষে এননটেক্স গ্রুপকে তিন হাজার ৩৫৯ কোটি টাকা সুদ মওকুফ করে জনতা ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ। মওকুফ-পরবর্তী চার হাজার ৮১৯ কোটি টাকা পরিশোধে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। ওই সময় এননটেক্স গ্রুপের কাছে সুদসহ ব্যাংকের পাওনা ছিল আট হাজার ১৭৮ কোটি টাকা। শর্ত পালনে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২৩ সালে ১৪২ কোটি টাকার সুদ যোগ হয়ে দাঁড়ায় আট হাজার ৩২০ কোটি টাকা। এরপর ২০২৪ সালের মার্চে এসে সুদ মওকুফ সুবিধা বহাল রেখে চার হাজার ৯৬১ কোটি টাকা পরিশোধে আরও দুই বছর সময় দেয় ব্যাংক।
ঋণ পরিশোধের অঙ্গীকার হিসেবে প্রথমে গ্রুপটিকে ৩০ কোটি টাকা জমা এবং পরপর দুটি কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হলে সুবিধা বাতিলের শর্ত দেওয়া হয়। ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় ২০২৫ সালের মধ্যে সমুদয় পাওনা পরিশোধের কথা। এ ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে ঋণ পরিশোধের যে শর্ত ছিল, তা পরিপালন হয়নি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে পরিবর্তন এসেছে। নতুন কর্তৃপক্ষ এসে গত বছরের ডিসেম্বরে এননটেক্সের জমি বিক্রির জন্য নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেও ক্রেতা পায়নি। এননটেক্স গ্রুপের ২২ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আশুলিয়া ও টঙ্গীর তুরাগ নদ-সংলগ্ন প্রায় ১২৮ একক জমি ব্যাংকের কাছে বন্ধক রয়েছে।
আদালতের আদেশে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরও এননটেক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে মামলা না করে ব্যাংক ‘ট্রাস্টি অব পাবলিক মানি’ হিসেবে চরম দায়িত্বহীন আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। যেসব কর্মকর্তার অবহেলা এবং যোগসাজশের কারণে আইনগত কার্যক্রম থেকে ব্যাংক বিরত থেকেছে, তাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নেওয়া আবশ্যক। বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনগত কার্যক্রম নেওয়ার ক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয়তার দায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এড়াতে পারেন না। যেসব কর্মকর্তার দায়িত্বে অবহেলার কারণে এতদিন মামলা করা সম্ভব হয়নি, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে ৯০ দিনের মধ্য আদালত এবং সরকারকে অবহিত করার জন্য আদেশের কপি ব্যাংকের চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো হয়েছে।
জানতে চাইলে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর খেলাপি ঋণ আদায়ে জোর চেষ্টা অব্যাহত আছে। এরই মধ্যে সার্ভেয়ার দিয়ে বন্ধকি সম্পত্তির পুনর্মূল্যায়নের কাজ শেষ করা হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হলেও কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি। ব্যাংকের চেয়ারম্যান জানান, আদালতের আদেশের বিষয়টি তিনি অবহিত।
এককালীন এক্সিট সুবিধার আওতায় শর্ত অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ না করলেও ২০২৩ সালে ইসলামী ব্যাংক থেকে এননটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠান শব মেহের স্পিনিং মিলস ৭০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়। ‘মুরাবাহা টিআর’ পদ্ধতিতে এই ঋণ দেয় ব্যাংকটি। এ পদ্ধতিতে পণ্য কেনার জন্য ঋণ দেওয়া হয়। তবে পুরো অর্থ নগদে তুলে নেওয়ার সুযোগ পায় এননটেক্স। ওই সময় ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলম গ্রুপের হাতে।
জনতা ব্যাংকের জনতা ব্যাংক কর্পোরেট শাখার ডিজিএম জনাব ফিরোজ বলেন, আমরা এননটেক্সের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। এরপর এই বিষয়ে আর কোনো ধরনের বক্তব্য দিতে রাজি না হননি তিনি।
