অবৈধ ভাবে প্রধান শিকক্ষ নিয়োগ, প্রতারনার মাধ্যমে এমপিওভুক্তি
ঘুস বানিজ্যে অন্ধ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর

দেশের শিক্ষা খাত বিগত সময়ের মত এখনো অনিয়ম, দুর্নীতি আর ঘুষ বাণিজ্যে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মী। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর সহ সংস্থাভুক্ত ১৩টি প্রতিষ্ঠানের সর্বত্র ঘুষ বাণিজ্য নিশ্চিত করতে কাজ করছে দুর্নীতিবাজ একটি সিন্ডিকেট। থানা শিক্ষা অফিস থেকে শুরু করে আঞ্চলিক শিক্ষা অফিস, শিক্ষা ভবন এমনকি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগে রয়েছে ঘুষের প্রভাব । স্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তি, শিক্ষক নিয়োগ, বদলি, পদায়ন, শিক্ষকের এমপিওভুক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, জাতীয়করণসহ অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের পেনশনের টাকা তুলতেও দিতে হয় ঘুষ। টাকার বিনিময়ে অবৈধ পন্থায় প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পাচ্ছেন অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতাহীন শিক্ষক । ঘুষের লেলিহান শিখা এতটাই ভয়াবহ যে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে করে দিচ্ছেন এমপিওভুক্তি। আইন কর্মকর্তাগণ ঘুষের প্রভাবে তৈরি করছেন আইনের অপব্যাখ্যা। এ ভয়াবহ দুনর্তীতে শিক্ষা ব্যাবস্থা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, দেখার কেউ নেই।
দৈনিক আজকের সংবাদের অনুসন্ধানে উঠে আসে ,কুশমাইল টেকিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ফুলবাড়িয়া,ময়মনসিংহে ২০০৪ সালে বিধি বহির্ভূতভাবে ১৯৯৫ সালের এমপিও নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবৈধ পন্থায় প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পায় বাবেয়া খাতুন। নিয়োগের পূর্বে একাধিক পত্রিকায় প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপন প্রদান করে কর্তৃপক্ষ। যেখানে উল্লেখ ছিল, প্রতিদ্বন্দ্বীকে শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতাসহ যাবতীয় শর্ত পুরনের মাধ্যমে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে। কুশমাইল টেকিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, ফুলবাড়িয়া,ময়মনসিংহ নিম্ন মাধ্যমিক স্বীকৃতিপায় ০১/০১/১৯৭২ ইং এবং নিম্ন মাধ্যমিক এমপিওর স্বীকৃতিপায় ০১/০১/১৯৭৪ ইং তারিখে । মাধ্যমিক স্বীকৃতি ০১/০১/১৯৯৫ইং এবং মাধ্যমিক এমপিও পায় ০১/০১/১৯৯৭ ইং তারিখে। উক্ত বিদ্যালয়ে নিম্ন মাধ্যমিক তথা ১৯৭২ সাল থেকে রাবেয়া খাতুন এর পূর্ব পর্যন্ত যে সকল প্রধান শিক্ষকগন দায়িত্ব পালন করেছেন (নিম্ন মাধ্যমিক স্তর) ১। ইমান আলী মুন্সী, ২,কেরামত আলী, ৩, মোঃ আলতাফ হোসেন, ৪, মোঃ আবু হানিফা ৫, নজরুল ইসলাম, ৬, আব্দুস সালাম। মাধ্যমিক স্তরঃ ১, আব্দুল লতিফ ২,মোঃ আলতাফ হোসেন। যেহেতু স্কুলটি ১৯৭৪ সাল থেকে এমপিওভুক্ত সেহেতু উক্ত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে আসতে হলে বিধি মোতাবেক যোগ্যতা অভিজ্ঞতার প্রয়োজন রয়েছে বটে।প্রধান শিক্ষক পদে বিধি মোতাবেক সহকারি শিক্ষক হিসেবে ১২বছর ,সহকারি প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিন বছরের অভিজ্ঞতা ও বিএড থাকা বাধ্যতামূলক। এ সকল যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার কোনটাই ছিল না রাবেয়া খাতুনের, যে কারণে প্রধান শিক্ষক পদে তার নিয়োগ অবৈধ বলে বিবেচিত হয়।তার সার্ভিস ফাইল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তিনি কুশমাইল টেকিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান সংক্রান্ত কোন কাগজ পত্র জমা দেন নাই। রাবেয়া খাতুনকে উক্ত বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ময়মনসিংহ আদালতে একটি মামলা হয় । আদালত শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা ও শর্তাবলী পূরণ ছাড়া কীভাবে তাকে এমপিও (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) করা হলো, জানতে চাইলে জেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ রফিকুল ইসলাম আদালতকে লিখিত এক জবাবে তিনি উল্লেখ করেন, রাবেয়া খাতুনের নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগকালীন সময়ে তার পুর্ব কোনযোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা ছিলনা। যার স্মারক ২০২২/১৫২৩ তারিখ ৯/১১/২০০২২খ্রিস্টাব্দে (সুত্র৩১১/২এস, তারিখ-১৬/১০/২০২২ইং।
এমপিওভুক্তিতে যে সকল প্রতারণার আশ্রয় নিল মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরঃ রাবেয়া খাতুন কয়েকবার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে এমপিওভুক্তির আবেদন করলে অধিদপ্তর তা প্রত্যাখ্যান করে।উল্লেখ্য যে মোঃ আনোয়ার হোসেন সহকারী পরিচালক(মা-২ ) স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয় ,প্রস্তাবিত প্রধান শিক্ষক জনাব রাবেয়া খাতুন এর প্রয়োজনীয় কাম্য অভিজ্ঞতা না থাকায় তার এমপিও ভুক্তির সুযোগ নাই। যার স্মারক নম্বর ৪জি /৩৫৬৯-ম/০৭/১০৯৯১/৩ তারিখ ১২ নভেম্বর ২০০৭ ইং। অন্য আরেক চিঠিতে মোঃ আনোয়ার হোসেন সহকারি পরিচালক (মা-২) বাবেয়া খাতুনের বিষয়ে বলেন , তিন বছরের সহকারি প্রধান শিক্ষক ও নিরবিচ্ছিন্নভাবে সহকারি শিক্ষক হিসেবে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা না থাকায়, তাকে এমপিও ভুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা যায়নি। যার স্বারক নম্বর ২১২/৪জি/৩৫৬৯-ম/০৭-ম তারিখ ৫ জুন ২০০৮ ইং। সুস্পষ্ট দুইটি চিঠি থাকা সত্তেও ২০০৯ সালে অলৌকিক ভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালকের দপ্তর রাবেয়া খাতুনকে এমপিও প্রদান করেছে।এতেই প্রমাণিত হয় প্রতারণার মাধ্যমে ঘুষ বাণিজ্যের সিন্ডিকেটের দখলে থাকা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে টাকা হলে অসাধ্য বলে কিছু নেই । ২০০৯ সালের এমপিও সিট পর্যালোচনা করে দেখা যায়. এমডি আলতাফ হোসেন ও রাবেয়া খাতুন প্রধান শিক্ষক টেকিপাড়া উচ্চ বিদ্যালযয়ে একই এমপিও শীটে দুইজন প্রধান শিক্ষক একই বিদ্যালয়ে ,যা জালিয়াতির চরম উদাহরণ। বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি কর্তৃক বহিষ্কৃত প্রধান শিক্ষক রাবেয়া খাতুন এভাবেই বিদ্যালয়ের বাইরে থেকে বিপুল অংকের ঘুষ দিয়ে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের সহায়তায় প্রতারণার মাধ্যমে যোগ্যতা অভিজ্ঞতা ছাড়াই পেয়ে যান এমপিও ভুক্তি।
প্রধান শিক্ষক হিসেবে বৈধতা দিতে যে প্রতারণার আশ্রয় নিলো অধিদপ্তর ও রাবেয়া খাতুনঃ গত ৮ /৭/ ২০২৫ ইং আজকের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত অবৈধভাবে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ ও এমপিও ভুক্তি কি ঘটছে শিক্ষা অধিদপ্তরে শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবাদে রাবেয়া খাতুন এক চিঠি প্রেরণ করেন। উক্ত চিঠিতে মিথ্যা ,বানোয়াট এবং একপেশে সংবাদ উল্লেখসহ সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা ড.হোসেন জিল্লুর রহমান এর সভাপতিত্বে ২৫-১১- ২০০৮ ইং সালের সিদ্ধান্ত মোতাবেক এমপি ভুক্তি করন সিদ্ধান্তের একটি চিঠি/ পরিপত্রের কথা উল্লেখ করেন তিনি। উক্ত পরিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই পরিপত্র শুধু নন এমপিওভুক্ত স্কুলের বেলায় প্রযোজ্য । কিন্তু কুশমাইল টেকিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং রাবিয়া খাতুনের আগে আরও ৮জন প্রধান শিক্ষক ছিলেন। স্কুলটি ১/১/১৯৭৪ সালে এমপিওভুক্ত হয় । আরো জানা যায়, তৎকালীন যুগ্ম সচিব শিক্ষা মন্ত্রণালয়, তিনি উল্লেখ করে বলেন, তৎকালীন প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বেলায় বিধি মোতাবেক যোগ্যতা অভিজ্ঞতা চেয়ে স্কুল ম্যানেজিং কমিটি জাতীয় পত্রিকা সহ বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকেন। অভিজ্ঞতা এবং যোগ্যতা ছাড়া যে সকল স্কুলে অনিয়ম এবং দুর্নীতির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক বা সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা দরকার। পরিপত্রের (০৪) নং কলামের (খ) উপকলামের সুপারিশে উল্লেখ আছে,বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০০৫ কার্যকর হওয়ার পর, উক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত নিবন্ধন সনদ ব্যতীত শিক্ষক নিয়োগের বিধান না থাকায় ইনডেক্স বিহীন কোন শিক্ষক এমপিওভুক্ত হতে পারবে না। উপকলাম (২) এ উল্লেখ করা হয়,নিয়োগের ক্ষেত্রে যারা সরকারি প্রতিনিধি ছিলেন তাদের দায়িত্ব যথাযথ পালন না করার কারণে, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পরিপত্র প্রণয়ন কালে ২৫১ টি আবেদন এরমধ্যে ১৯৫টি আবেদন বিবেচনার জন্য সুপারিশ করে এমপিও ভুক্তি সংক্রান্ত সভা । তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে জানা যায় ২৫১ বা ১৯৫ টি আবেদনের মধ্যে কুশমাইল টেকিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের পক্ষে কোন আবেদন খুঁজে পাওয়া যায়নি। কুশমাইল টেকিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি জাকির হোসেন আজকের সংবাদ কে জানান, জনাব রাবেয়া খাতুনকে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা কাগজপত্র নিয়ে স্কুলে আসার একাধিকবার চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে। অদ্যবধি তিনি চাহিত কাগজপত্র প্রেরণ করেননি বা জমা দেননি।এখানে জনাব রাবেয়া খাতুন ১৯৯৫ সালের জনবল কঠামোর প্যাটার্নভূক্ত নন এবং পূর্বে সে কোন বিদ্যালয়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষক ছিলেন( ইনডেক্সদারি) না বিধায় তার যাবতীয় নিয়োগ এবং কার্যক্রম সম্পূর্ণ অবৈধ এবং বিধি বহির্ভূত বলে বিবেচিত হয় ।এ বিষয়ে মোঃ আল-আমিন সরকার, শিক্ষা অফিসার আইন, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর আজকের সংবাদ কে বলেন, এমপিও ভুক্ত স্কুলের বেলায় প্রধান শিক্ষক নিয়োগে বিধি মোতাবেক যোগ্যতা হচ্ছে সহকারি শিক্ষক হিসেবে ১২বছর ও তিন বছর সহকারি প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকুরীর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এবং শিক্ষাগত যোগ্যতার বেলায় অবশ্যই বিএড থাকতে হবে । জনাব রাবেয়া খাতুনের বেলায় উক্ত অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার ঘাটতি থাকায় তাকে বৈধতা দেওয়া যাবে না। কিভাবে তিনি এমপিও ভুক্ত হলেন তা আমার বোধগম্য নয় । উক্ত বিষয়ে মোঃ ইউনুছ ফারুকী উপ-পরিচালক(মাধ্যমিক শাখা)মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর আজকের সংবাদ কে বলেন, এ বিষয়ে একটি তদন্ত চলমান আছে। বিধিবিধানের আলোকেই তদন্ত শেষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। যোগ্যতা অভিজ্ঞতা সহ প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যে সকল বিধান আছে তা পূর্ণাঙ্গভাবে বিচার বিশ্লেষণ করা হবে।
