ঢাকা সদর সাব রেজিস্ট্রি অফিসের মোহরার শাহিন দুর্নীতির করে কোটি কোটি টাকার মালিক

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: নভেম্বর ১২, ২০২৩ ২০:৫৯:৫৭  আপডেট :  নভেম্বর ১২, ২০২৩ ২১:০০:৩৩

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্স পরিণত হয়েছে ঘুষ-দুর্নীতির আখড়ায়। এ কমপ্লেক্সেরই কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে জমি রেজিস্ট্রেশন, দলিল সম্পাদন, নকল উঠানো, রেকর্ড তল্লাশি, সংশোধন, এমনকি জমির শ্রেণি পরিবর্তনের নামে ঘুষগ্রহণসহ বিস্তর দুর্নীতি এবং নানাভাবে সেবাপ্রত্যাশীদের যারপরনাই হয়রানির অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।

এহেন অপকর্মে পিছিয়ে নেই নকলনবিশ (এক্সট্রা মোহরার), দলিল লেখক ও দৈনিক ৬০ টাকা হাজিরায় কাজ করা উমেদারসহ বহিরাগত দালালরাও। কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগতভাবে নিয়োগ করা ‘উমেদার-মোহরার সিন্ডিকেট’ই মূলত নিয়ন্ত্রণ করছে রেজিস্ট্রি অফিসের ভূমিসংক্রান্ত কার্যক্রমসহ ঘুষের নেটওয়ার্ক।

জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে কখনো অস্তিত্বহীন ব্যক্তিকে মালিক সাজিয়ে, কখনও-বা ভুয়া কমিশনে দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জমি প্রভাবশালীদের লিখে দিচ্ছে তারা। দিনের বেলা অফিসের কর্মঘণ্টাতেই শুধু নয়, রাতেও এ দপ্তরে চলে সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা। ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকা এ চক্রের সদস্যদের খুঁটি এতটাই শক্ত যে, জালিয়াতির দায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলায় ৫ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি হয়েও রীতিমতো অফিস করছেন। এসব জেনেও নিশ্চুপ কর্মকর্তারা।

জাল-খাড়া দলিল সম্পাদনের মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত এ চক্রের সদস্যরা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে দিন-রাত বীরদর্পে চষে বেড়াচ্ছে; প্রতিবাদ করার সাহস পর্যন্ত নেই কারও। তাদের খপ্পরে পড়ে প্রতারিত হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। নিরীহ সেবাপ্রত্যাশীদের অভিনব প্রতারণার ফাঁদে ফেলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি। জানা গেছে, ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে একাধিক সিন্ডিকেটের অন্যতম নকলনবিশ মোহাম্মদ শাহীন আলমের গ্রুপ। টাকা দিলেই জমিসংক্রান্ত অবৈধ যে কোনো কাজই করানো যায় এ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে।

এসএম রফিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির মালিকানাধীন কোটি টাকা মূল্যের তেজগাঁওয়ের একটি ফ্ল্যাটের দলিল টেম্পারিং ছাড়াও ভুয়া মালিকের ছবি বসিয়ে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে অন্যের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন শাহীন। শুধু তাই নয়, সিন্ডিকেট পাকিয়ে ওই ফ্ল্যাট দেখিয়ে রামপুরার একটি ব্যাংক থেকে ৩০ লাখ টাকা ঋণও নিয়েছেন তিনি। বিষয়টি ভুক্তভোগীর মাধ্যমে দুদকের দৃষ্টিগোচর হলে ফেঁসে যান শাহীন।

এই অনিয়মের বিষয়ে দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় ২০১৯ সালে শাহীনের ৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত নং ৬-এর বিচারক। কিন্তু শাহীনের টিকিটিও ছুঁতে পারেনি কেউ। সকলের নাকের ডগায় দিব্যি অফিস করছেন। জানা গেছে, বছর কয়েক আগেও রাজধানীর কুনিপাড়ার একটি মেসে ভাড়া থাকতেন শাহীন। ফেরি করে তরকারি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তার বাবা।

নিবন্ধন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তার হাত ধরে অবৈতনিক হিসেবে এক্সট্রা মোহরারের কাজ শুরু করেন তিনি। কিছুদিন পর জড়িয়ে পড়েন দলিল টেম্পারিং সিন্ডিকেটে। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি শাহীন আলমের। রাজধানীর রামপুরার পশ্চিম উলন এলাকায় রয়েছে তার কয়েক কোটি টাকা মূল্যের আলিশান বাড়ি, যা ভাড়া দিয়েছেন। পরিচয় গোপন করে উলনের ৪৭ নম্বর হোল্ডিংয়ের ওই বাড়িতে কথা হয় শাহীন আলমের বোনের স্বামী সাইফুলের সঙ্গে।

সাইফুল জানান, বাড়িটি শাহীন আলমের। তবে তিনি (শাহীন) মহানগর প্রজেক্ট এলাকায় সপরিবারে ভাড়া থাকেন। এদিকে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, আমি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নই। একটি মহল উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমার বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। এরপর প্রতিবেদককে বুঝেশুনে প্রতিবেদন লেখার পরামর্শ দিয়ে দেন তিনি।

নিবন্ধন অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগ রেজিস্ট্রি অফিসসমূহের পরিদর্শক খন্দকার হুমায়ুন কবীর এ প্রতিবেদককে বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামি সাজাভোগ করার দুই বছরের আগে সরকারি অফিসে কর্মকাণ্ড চালানোর এখতিয়ার নেই। এ ধরনের কোনো আসামি রেজিস্ট্রি কমপ্লেক্সে নিয়মিত অফিস করছেন তা আমি অবগত নই। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। নানা অভিযোগে ঢাকার রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে কর্মরত নকলনবিশ, উমেদারসহ অন্তত ৩০ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অফিসের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেলে বা কেউ দায়ী থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।