এলজিইডি ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে প্রধান প্রকৌশলী পদে দুর্নীতিতে সর্বকালের রেকর্ড সৃষ্টিকারীদের অনিয়মতান্ত্রিক নিয়োগ

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: মার্চ ৪, ২০২৬ ২১:০৮:২২

সাবেক অন্তবর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান শুভ্রকে বিমান বন্দরে হয়রানির খবর চাউর হয়েছে। কিন্তু তাঁর দায়িত্ব পালনকালে সরকারের গুরুত্বপূর্নপ্রধান দু’টি প্রকৌশল সংস্থার প্রধান নিয়োগে কোনো নিয়ম নীতি না মেনে অর্ধ শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার খবর আসেনি মিডিয়াতে।

আদিলুর রহমান খান শুরুতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ আহমেদ সজীব ভুইয়া উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগের পর স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্ব পান তিনি। এই মন্ত্রণালয়ে স্বল্প সময়ে দায়িত্ব পালনকালে ইতিহাস সৃষ্টিকারী দুর্নীতির মাধ্যমে অনেককে ডিঙ্গিয়ে পদোন্নতি দিয়ে শেষ পর্যন্ত এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী করা হয় বেলাল হোসেনকে। একইভাবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী পদেও নিয়োগ দেয়া হয় মো: আবদুল আউয়ালকে সিনিয়র ৩ জনকে ডিঙ্গিয়ে। সবগুলো নিয়োগে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে প্রায় অর্ধ শত কোটি টাকা বাগিয়ে নিয়েছেন সাদা চুলের এই উপদেষ্টা। এই আদিলুর রহমানই ড. ইউনূসকে ক্ষমতা না ছাড়ার জন্য যে কয়েকজন উপদেষ্টা চাপ দিয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। 

দুর্নীতির অভিযোগের পরেও বেলাল নিয়োগ পেল এলজিইডিতে: স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নতুন প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে মো. বেলাল হোসেনের নিয়োগকে ঘিরে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। দুদকে দাখিল করা অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সাবেক এক মন্ত্রীর নির্দেশে বেলাল হোসেন প্রায় ৪০টি উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন না করেই শতভাগ বিল উত্তোলন করেন। প্রকল্পগুলো কাগজে-কলমে সম্পন্ন দেখিয়ে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয় বলে অভিযোগে দাবি করা হয়। পরবর্তীতে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালে ওইসব কাজের ওপর পুনরায় বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং নতুন করে কাজ দেখানো হয়। এতে একই প্রকল্পে দ্বিগুণ অর্থ ব্যয়ের সুযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগকারীর দাবি। তবে এখনো ওই সময়ের বহু ব্রিজ ও কালভার্ট অসম্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (প্রশাসন) হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকালে বেলাল হোসেন নিয়োগ ও পদায়নে ব্যাপক অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজনৈতিক সুপারিশে প্রায় ১ হাজার ১২৫ জনকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে এলজিইডিতে নিয়োগ দেওয়া হয়, যেখানে পদভেদে ৫০ হাজার থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেন, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো স্বচ্ছতা ছিল না এবং যোগ্যতার পরিবর্তে অর্থ ও রাজনৈতিক পরিচয়ই ছিল প্রধান বিবেচ্য।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, শুধু আউটসোর্সিং নিয়োগই নয়, পদোন্নতি ও পদায়নেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সার্ভেয়ারদের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চলতি দায়িত্ব, ভারপ্রাপ্ত বা অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রদান করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এমনকি কার্য সহকারীকেও উপসহকারী প্রকৌশলীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

সারাদেশে প্রায় ৪১২ জনকে এভাবে অবৈধ পদোন্নতি দিয়ে ৪০ থেকে ৬০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীর দাবি। এছাড়া বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে জনপ্রতি ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে।

এদিকে এসব গুরুতর অভিযোগের মধ্যেই এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সংস্থার শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সততা ও পেশাগত সুনাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতির অভিযোগ নিষ্পত্তির আগেই এমন দায়িত্ব দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। 

তিন জনকে ডিঙ্গিয়ে জনস্বাস্থ্যে প্রধান প্রকৌশলী পদে মো: আবদুল আউয়াল: গত বছরের ১৭ নভেম্বর মো. আব্দুল আউয়ালকে প্রধান প্রকৌশলী পদের রুটিন দায়িত্ব দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। এতে তিন জন সিনিয়র প্রকৌশলীকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে যে, শীর্ষ দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তা কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে প্রধান প্রকৌশলী পদটি কিনে নিয়েছেন। সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদীর ঘনিষ্ঠ বিশেষ একজন দালালের মাধ্যমে এই অর্থের লেনদেন হয়েছে। অথৈর লেনেদেন সম্পন্ন হওয়ার পরই অত্যন্ত দ্রুত গতিতে নথি উপস্থাপিত হয় বলে জানা যায়। প্রকৌশলী আউয়াল জ্যেষ্ঠতা তালিকায় বর্তমানে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে চতুর্থ। এছাড়া প্রকৌশলী আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট আমলে স্থানীয় এমপির সঙ্গে যোগসাজশে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোসহ সিন্ডিকেট দুর্নীতিরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে গত মে মাসে যেসব কর্মকর্তার বিষয়ে এনএসআই (ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স) এর মূল্যায়ন প্রতিবেদন চাওয়া হয় তারমধ্যে মো. আব্দুল আউয়ালের নাম ছিল না।  

তারমধ্যে প্রথম নাম ছিল প্রকৌশলী মীর আব্দুস সাহিদের। এনএসআই’র ওই মূল্যয়ন প্রতিবেদন আসার পর মীর আব্দুস সাহিদকেই প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্বে) করা হয়। চাকরির বয়স শেষে গত ১১ নভেম্বর মীর আব্দুস সাহিদ অবসরে যান। ওই তালিকার আরো একজন অবসরে গেছেন ইতিমধ্যে। অর্থাৎ তালিকার এখনো তিনজন কর্মকর্তা কর্মরত আছেন। এই তিন কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে মো. আব্দুল আউয়ালকে প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্বে) করা হলো। যদিও প্রকৌশলী আউয়ালের অতীত কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে কোনো মূল্যায়ন প্রতিবেদন চাওয়া হয়নি বা নেওয়া হয়নি এখন পর্যন্ত।

সূত্রমতে, এক্ষেত্রে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বড় অংকের টাকা লেনদেন। তাই আব্দুল আউয়ালকে প্রধান প্রকৌশলী পদে নিয়োগের সময় মূল্যায়ন প্রতিবেদন চাওয়ার বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। মূল্যায়ন প্রতিবেদন চাওয়া হলে নিশ্চিতভাবেই তার বিষয়ে নেতিবাচক প্রতিবেদন আসতো। সাদাচুলের উপদেষ্টা সবটাই করেছেন বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে।

দেশের শীর্ষ প্রকৌশলীদের মতে গুরুত্বপূর্ন এই দুটি দপ্তরে অবৈধভাবে নিয়োগকৃত দূর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের অবিলম্বে অপসারনপূর্বক গ্রেডেশন তালিকায় জেষ্ঠ ও যোগ্যতাসম্পন্নদের পদায়ন করে প্রশাসনে স্বচ্চতা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।