চাকুরি ফিরে পেতে বিএফআইইউ'র সাবেক প্রধান শাহীনুলের ৫৮ কোটি টাকার ঘুষ চুক্তি

এস এম সাইফ আলী
এস এম সাইফ আলী
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারী ২৫, ২০২৬ ১৯:২৩:১০  আপডেট :  ফেব্রুয়ারী ২৬, ২০২৬ ১৯:১৪:০২

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর সাবেক প্রধান কর্মকর্তা এএফএম শাহীনুল ইসলামকে ঘিরে ঘুষ লেনদেনের একটি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরিতে পুনর্বহালের লক্ষ্যে তিনি ৫৮ কোটি টাকার একটি ঘুষচুক্তি সম্পাদন করেছেন বলে একটি সূত্র দাবি করেছে।

সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তির সঙ্গে এ চুক্তি হয়। চুক্তির অংশ হিসেবে জামানত হিসেবে শাহীনুল ইসলাম তার নিজস্ব স্বাক্ষরযুক্ত ইস্টার্ন ব্যাংকের ৫ কোটি টাকার একটি নামবিহীন চেক ওই ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

একই সঙ্গে শাহীনুলের পক্ষ থেকে তার সহযোগী, ব্যবসায়ী মো. মোস্তাফিজুর রহমান সোহাগ, নামবিহীন ৫৩ কোটি টাকার চেক জামানত হিসেবে প্রদান করেন।

সূত্র আরো জানায়, উভয় পক্ষের মধ্যে ৩শ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি লিখিত চুক্তি সম্পাদিত হয়। ওই স্ট্যাম্পে ৫৮ কোটি টাকার চেকসংক্রান্ত বিষয় উল্লেখ রয়েছে। স্ট্যাম্পে দাতা হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন মোস্তাফিজুর রহমান সোহাগ এবং সাক্ষী হিসেবে রয়েছেন শাহীনুল ইসলাম। 

পাশাপাশি, মোস্তাফিজুর রহমান সোহাগের নিজস্ব অ্যাকাউন্ট থেকে স্বাক্ষরকৃত মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পাঁচটি চেকের মাধ্যমে ৫৩ কোটি টাকার বিষয়টি স্ট্যাম্পে উল্লেখ করা হয়েছে বলে সূত্রটি দাবি করেছে।

সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১৬ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় রাজধানীর শ্যামলী সিটি গার্ডেন রেস্টুরেন্টে শাহীনুল মোস্তাফিজসহ বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ঘণিষ্ট পর্যায়ের লোকসহ মোট পাঁচজনের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে শাহীনুলের পুনর্বহালের বিষয়ে সার্বিক আলোচনা করা হয়। পুনর্বহালের পরে কিভাবে আর্থিক লেনদেন হবে সেই বিষয়েও অলোচনা করা হয়। বৈঠকটিতে শাহীনুল গ-১৬-৭৬২৮ নম্বরের একটি গাড়িতে করে উপস্থিত হয়েছিলেন। ওই বৈঠকের শেষ পর্যায়ে শাহীনুল চুক্তিকৃত অর্থ প্রদানের নিশ্চয়তা দেন। 

এরপরে পরিচয় হয় রাইসুল ইসলাম জুয়েল নামে এক ব্যাক্তির সাথে। তিনি নিজেকে অন্তবর্তী সরকারের উচ্চপর্যায়ের ঘণিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দেন তিনি এবং শাহীনুলের চাকরির পুনর্বহালের বিষয়ে জুয়েলের সাথে গত ডিসেম্বর থেকে আলোচনা ও বৈঠক শুরু হয় মিটিংয়ে উপস্থিত অন্যদের সাথে।

এবিষয়ে শাহিনুল ইসলাম আজকের সংবাদকে জানান, "আমার একটা চেক বই হারিয়ে গিয়েছে। এ ব্যাপারে একটি সাধারণ ডায়েরী করেছি। কিন্তু আমি কোনো ৩শ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিনি। চাকরিতে পূনর্বহালের জন্য চুক্তির বিষয়টি সত্য নয়"

তার কাছে জিডির কপি চাইলে তিনি কপি হোয়াটসঅ্যাপে সেন্ড করার কখা বলেন। কিন্তু পরে তা আর পাঠাননি এবং পরবর্তীতে একাধিকবার তার মোবাইলে কল করলে তিনি কল রিসিভ করেননি।

এদিকে তার সহযোগী মোস্তাফিজুর রহমান আজকের সংবাদকে জানান, "এটা একটা ব্যবসায়িক কারণে চেক প্রদান ও দলিলচুক্তি করা হয়েছে। এখানে আমার পক্ষে শাহীনুল সাহেব দলিলে সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর ও চেক দিয়েছেন। আপনার সাথে সামনাসামনি বসে এ ব্যাপারে বাকি কথা বলব।"

গত বছরের আগস্ট মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শাহীনুল ইসলামের কয়েকটি আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি দেন। তাদের অভিযোগ, শাহীনুল রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। 

এ বিষয়ে সত্যতা যাচাইয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ অতিরিক্ত সচিব সাঈদ কুতুবকে প্রধান করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে।

কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম, আইসিটি বিভাগের পরিচালক মতিউর রহমান এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম।

ভিডিও কেলেঙ্কারির পরও শাহীনুল ইসলাম অফিসে যাওয়া অব্যাহত রাখেন। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতিবাদ জানালে সরকারের নির্দেশে তাকে ছুটিতে থাকতে বলা হয়। এরপর থেকে তাকে আর কর্মস্থলে দেখা যায়নি।

পরে গত বছরেব ৯ সেপ্টেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব আফছানা বিলকিস স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শাহীনুল ইসলামের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করে সরকার।

এদিকে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, দুর্নীতি, শাহীনুল এবং অন্যদের নামে অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একটি আবেদনের শুনানি শেষে গত বছরের ১৬ অক্টোবর ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ সাব্বির ফয়েজ শাহীনুল ইসলাম এবং তার স্ত্রী সুমা ইসলামের উপর বিদেশভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন।