চাকরিচ্যুত কর্মচারি নেতা আমজাদের গাড়ি ব্যবহার হচ্ছে ছিনতাইয়ে!

শান্তিনগর থেকে কোটি টাকা ছিনতাই, তদন্তে ডিবি

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ১৮, ২০২৩ ০৯:৪৩:২১  আপডেট :  জুলাই ১৮, ২০২৩ ১৩:১১:৫০

ঢাকা জিপিও’র চাকরিচ্যুত কর্মচারি আমজাদ আলী খানের ব্যক্তিগত গাড়ি (ঢাকা মেট্রো-চ ১৯-১২৫৬) ব্যবহার হচ্ছে ছিনতাই কাজে! গত ৬ জুলাই সকাল পৌনে ১১ টার দিকে  শান্তিনগর  এলাকা  থেকে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মচারীকে তার গাড়িতে করে অপহরণ করে নেওয়ার পর তাদের কাছ থেকে ১  কোটি ১২ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ডিবি পুলিশ ডাকাতদলের ৬ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। মাটি খুড়ে উদ্ধার করা হয়েছে সাড়ে সাত লাখ টাকা, পুলিশের ক্যাপ, ওয়াকটকি ও হ্যান্ডকাপ। গাড়ির মালিক সম্পর্কেও খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে মামলার তদন্তকারী সংস্থা ডিবি।

জানা গেছে, ঘটনার পর কয়েকদিন মো: আমজাদ আলী খান মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন। এ কারণে গাড়ির মালিকানা নিশ্চিতে বেগ পেতে হয় ডিবিকে। পরে তদন্তকারি সংস্থা খোঁজ নিয়ে ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত গাড়িটির মালিকানার বিষয়ে প্রায় নিশ্চিত হয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন গাড়ি কিভাবে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে, ছিনতাইয়ের সঙ্গে ওই গাড়ির  চালক বা মালিকের কোন সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি মাসের ৬ জুলাই সকালে শান্তি নগরের ক্রিয়েট ডিজাইন নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মচারী ১ কোটি ১২ লাখ টাকা মতিঝিলে  ব্যাংকে জমা দিতে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন সকাল পৌনে এগারটা। তারা রিক্সাযোগে শান্তিনগর অফিস থেকে বের হয়ে কিছু দূর যাওয়ার পর একটি সাদা মাইক্রোবাস থেকে ৫-৬ জন মুখোশ পড়া ছিনতাইকারী নেমে আসে। তারা নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে  দুই কর্মিকে রিক্সা থেকে নামিয়ে সাদা মাইক্রোবাসে তুলে ফেলে। সেখানে দুই কর্মীর চোখ-মুখ বেঁধে তাদের সিটের নীচে ফেলে রাখা হয়। এ সময় চিৎকার করতে চাইলে তাদের মারধরও করা হয়। এক পর্যায়ে ১ কোটি টাকা ১২ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মীকে ঢাকার বাইরে কেরানিগঞ্জে ফেলে চলে যায়।

এ ঘটনায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্মী মোঃ দিদারুল ইসলাম বাদী হয়ে ৮ জুলাই নয়াপল্টন মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। থানায় মামলা হলেও ডিবি পরিচয়ে চিনতাই হওয়ার কারণে মামলাটির ছায়া তদন্ত শুরু করে ( ডিবি, মতিঝিল, উত্তর)। তারা ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে। শুরুতেই জব্দ করে ছিনতাইকাজে ব্যবহৃত সেই মাইক্রোবাসটি (নম্বর: ঢাকা মেট্রো-চ ১৯-১২৫৬)। সর্বশেষ শুক্রবার রাতে বিভিন্ন স্থান থেকে অভিযান চালিয়ে জড়িত ৬ ছিনতাইকারী কে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় ডিবি।

তাদের দেখানো মতে মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয় এক সদস্যের ভাগে পাওয়া ছিনতাইয়ের সাড়ে সাত লাখ টাকা।  
নাম প্রকাশে অনিশ্চুক একটি সূত্র জানায়, তদন্তকারী সংস্থা  শুরুতে গাড়ির মালিকের নাম  পেলেও মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় তার সঙ্গে শুরুতে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয়নি। পরে ঢাকা বিআরটিএ অফিস থেকে  এই গাড়িটির মালিকানা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেয় সংস্থাটি। 
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জামাল হোসেন বলেন, ১ কোটি ১২ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়িটি আটক করা হয়েছে। মালিকানার বিষয়েও তারা একপ্রকার নিশ্চিত হয়েছেন। মালিকের  সম্পর্কেও তারা খোঁজ-খবর নিচ্ছেন।

সূত্র জানায়, আমজাদ আলী খান ঢাকা জিপিও‘র চাকুরিচ্যুত কর্মচারী। মানি-অর্ডার জালিয়াতির মাধ্যমে ডাক বিভাগের সাড়ে তিন কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় আমজাদী আলী খানসহ ৬ জনকে গ্রেফতার করেছিল Rab ।

২০২০ সালে এ ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় বিভাগীয় তদেন্ত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পর আমজাদ আলী খান কে স্থায়ীভাবে  চাকরিচ্যুত করা হয়। তার জন্মস্থান কুষ্টিয়ায় ১৯৮৯ সালে তার বিরুদ্ধে একটি খুনের মামলাও হয়। যদিও পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে তিনি সেই মামলা থেকে অব্যাহিত নিতে সক্ষম হন। ২০০৩ সালে জালজালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগে কুষ্টিয়ায় ডাক বিভাগ থেকে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। পরে সরকারি দলের প্রভাব খাটিয়ে তিনি আবারও স্ব পদে পুনর্বহাল হন। ২০১০ সালে তিনি কুষ্টিয়া থেকে ঢাকা জিপিওতে পোস্টিং নিয়ে এসে আবারও জাল-জালিয়াতি, কর্মচারি ইউনিয়নের শীর্ষ নেতৃত্ব বাগিয়ে নিয়ে চাঁদাবাজি, নিয়োগ-বাণিজ্য, মানিঅর্ডার জালিয়াতের মাধ্যমে সরকারি অর্থ লোপাটে জড়িত হন।

ঢাকা ডিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, পল্টনে কোটি টাকা ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত গাড়িটি আমজাদ আলী খানের নামে নিবন্ধিত। তিনি সেটি নিজেই ব্যবহার করেন। এটি ভাড়ায় চালিত কোন গাড়ি নয়। কিন্তু ব্যক্তিগত গাড়ী কিভাবে ছিনতাইকাজে ব্যবহৃত হল, এই ছিনতাইয়ের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মালিক-চালকের সম্পৃক্ততা আছে কিনা সেসব বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

ওই সূত্রটি বলছে, যেহেতু গাড়ির মালিকের  অতীত রেকর্ড ভালো নয়;  সে বিষয়টিও মাথায় রেখে  তদন্ত করা হবে। ঘটনার পর পর গাড়ির মালিক মোবাইল ফোন বন্ধ করে রাখায় মালিকানা যাচাইয়ে পুলিশকে বেগ পেতে হয় বলেও জানায় ডিবির সূত্র।