ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শওকত আলীর অর্থপাচার অনুসন্ধানে দুদক

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জুলাই ২০, ২০২৬ ২০:২৬:৩৭

ইস্টার্ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান শওকত আলী চৌধুরীর যুক্তরাজ্যে ২৫ মিলিয়ন ডলার শনাক্ত এবং অপ্রদর্শিত বিদেশি সম্পদের বিপরীতে তাঁকে প্রায় ৩০৭ কোটি টাকা জরিমানার পর এবার তাঁর বিরুদ্ধে অর্থপাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানে গতি বাড়িয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

শওকত আলী, তাঁর পরিবারের সদস্য ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন বিশ্লেষণের পাশাপাশি জাহাজ আমদানির নামে খোলা ঋণপত্রের নথি সংগ্রহ করছে সংস্থাটি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাজ্যে সম্পদ কেনার তথ্য পেতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স রিকোয়েস্ট বা এমএলএআর পাঠানোর বিষয়ও  দুর্নীতি বিরোধী রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। 
দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে ২৮টি ব্যাংকে শওকত আলী, তাঁর স্ত্রী তাসমিয়া আম্বেরিন, মেয়ে জারা নামরীন, ছেলে জারান আলী চৌধুরী এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ১৮৭টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পরিবারের চার সদস্যের নামে ৪১টি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে ১৪৬টি হিসাব রয়েছে।

দুদকের নথি অনুযায়ী, গত বছরের ১৫ জুলাই পর্যন্ত এসব হিসাবে মোট ৮ হাজার ৪০৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা জমা এবং ৮ হাজার ২৪৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। হিসাবগুলোতে তখন স্থিতি ছিল ১৭৩ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। অনুসন্ধানকারী দল এসব হিসাবের কেওয়াইসি, লেনদেন বিবরণী ও সহায়ক নথি বিশ্লেষণ করেছে।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদকের উপপরিচালক মো. মুস্তাফিজুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের দল গত ১ জুলাই চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কাছে শওকত আলীর মালিকানাধীন এসএন করপোরেশনের জাহাজ আমদানি ও সংশ্লিষ্ট এলসির নথি চায়। ১০ জুলাইয়ের মধ্যে তথ্য দিতে বলা হলেও নির্ধারিত সময়ে তা পাওয়া যায়নি। নথি না পেলে নতুন করে তাগিদপত্র দেওয়ার প্রস্তুতি রয়েছে বলে অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এর আগে গত বছরের ১৫ নভেম্বর শওকত আলী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব, জাতীয় পরিচয়পত্র, কর শনাক্তকরণ নম্বর ও পাসপোর্টের কপি চেয়ে ইস্টার্ন ব্যাংককে চিঠি দেয় দুদক। চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি আরেক চিঠিতে তাঁদের আর্থিক লেনদেনের বিস্তারিত বিবরণ চাওয়া হয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনুসন্ধানটি এখন ব্যাংক হিসাবের গণ্ডি ছাড়িয়ে আমদানি বাণিজ্য, বিদেশি কোম্পানি ও সম্পদে বিস্তৃত হচ্ছে।

দুদকের প্রাথমিক তথ্যে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের চট্টগ্রাম শাখা তিনটি এলসি খোলে। সেগুলোর সুবিধাভোগী ছিল ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে একই ঠিকানায় নিবন্ধিত রেড রুবি গ্রুপ লিমিটেড, ট্যালেন্ট মাইল লিমিটেড ও কলাম্বিয়া সিস লিমিটেড। অনুসন্ধানকারীরা কোম্পানিগুলোর কার্যকর ব্যবসায়িক অস্তিত্ব পাননি বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনটি এলসির মোট মূল্য ছিল প্রায় ১ কোটি ১ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ২০১৫ সালের একটি এলসির মূল্য ছিল ৭৪ লাখ ৯৬ হাজার ডলার, ২০২০ সালেরটি ৪ লাখ ৬৪ হাজার ডলার এবং ২০২৩ সালেরটি ২১ লাখ ৪১ হাজার ডলার। দুদক এখন এসব এলসির বিপরীতে জাহাজের মূল্য, বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা, অর্থের গন্তব্য এবং আমদানি নথির সত্যতা যাচাই করছে।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, ২০১২ সাল থেকে এসএন করপোরেশন পুরোনো জাহাজ আমদানিতে ১৪১টি এলসি খুলেছে। এসব লেনদেনের বড় অংশ এবং শওকত পরিবারের ব্যক্তিগত হিসাব ব্যবসায়িক লেনদেনে ব্যবহারের অভিযোগও যাচাই করা হচ্ছে। 

দুদকের মুখপাত্র ও উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেছেন, অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তারা আইন অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহ করছেন। অনুসন্ধান শেষে কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর অভিযোগের সত্যাসত্য জানা যাবে।

দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ শেষ হলে শওকত আলী, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। বিদেশে থাকা ফ্ল্যাট, কোম্পানি ও বিনিয়োগের তথ্য পেতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে আইনি সহায়তারও অনুরোধ পাঠানো হতে পারে।

এজেএ