রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রন পরিচালক মনিরুল ও কাইছারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধায়নে ২০ অথরাইজড অফিসারের ঘুষ বানিজ্য রমরমা ॥ দেখার কেউ নেই

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুলাই ২১, ২০২৬ ১৬:০৮:১৪  আপডেট :  জুলাই ২১, ২০২৬ ১৬:০৮:৫৪

রাজধানীতে ভবন নির্মাতাগন রাজউকের অথরাইজড অফিসারগনের হাতে আজও জিম্মি হয়ে রয়েছে। যা দেখার কেউ নেই। অনুসন্ধানে জানা যায় রাজউকে বর্তমানে ২৪টি জোন থাকলেও সব জোনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নেই। সব মিলিয়ে ১৮ থেকে ২০ জন অথরাইজড অফিসার মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, তাদের একটি বড় অংশ অবৈধ সুবিধা ছাড়া কোনো ফাইল এগিয়ে নিতে চান না। অর্থের পরিমাণ বেশি হলে ভবনের ফ্লোর এরিয়া রেশিও (ফার), সেটব্যাক কিংবা অন্যান্য শর্ত উপেক্ষা করেও নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভবন মালিকরা শুরুতে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী কলাম নির্মাণ করলেও পরে সীমানার পুরো জায়গাজুড়ে স্থাপনা গড়ে তোলেন। কোথাও বারান্দা বাড়ানো হয়, কোথাও দেয়াল তুলে নকশায় ফাঁকা রাখা জায়গা দখল করা হয়। রাস্তার পাশে অতিরিক্ত দোকান নির্মাণের ঘটনাও ঘটছে। এসব ক্ষেত্রে অথরাইজড অফিসার ও ইমারত পরিদর্শকদের অর্থের বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সরকারি জমিতে সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশে নকশা অনুমোদন নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে জানা গেছে।

সুত্রমতে কখনো নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণে সহযোগিতা, আবার কখনো অবৈধ স্থাপনায় ছাড় দেওয়া বা ভেঙে ফেলার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়– এমন অভিযোগ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) মাঠ পর্যায়ে তদারকিতে থাকা কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) আওতাধীন এলাকায় ভবন নির্মাণের অনুমোদন ও তদারকির ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়মিত আর্থিক সুবিধা নিচ্ছে। এই চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন জোন পরিচালক ও অথরাইজড অফিসার। বিভিন্ন সময়ে একাধিক কর্মকর্তা শাস্তির মুখে পড়লেও অনিয়ম বন্ধ হয়নি। ফলে অপরিকল্পিত নির্মাণ বা নকশার ব্যত্যয় ঘটানোর ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলদের আঁতাতে রাজধানী যেন জঞ্জালে পরিণত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজউকের উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-১-এর পরিচালক মনিরুল হক এবং উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-২-এর পরিচালক মোহাম্মদ কাইছার নকশা অনুমোদন ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের বড় অংশ তদারকি করেন। মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী অথরাইজড অফিসার, সহকারী অথরাইজড অফিসার ইমারত পরিদর্শকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের অধীনেই কাজ করেন। ফলে মাঠপর্যায়ের অনিয়মের দায় এ দুই পরিচালকের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এরইমধ্যে নানা অভিযোগে আলোচিত অথরাইজড অফিসার পলাশ শিকদার সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন, কেড়ে নেওয়া হয়েছে ক্ষমতা। এর আগে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে প্রেষণে রাজউকে আসা অথরাইজড অফিসার মো. রাজিবুল ইসলাম ও আবু লায়েমকে নিজ মন্ত্রণালয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তবে এসব পদক্ষেপেও পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের তালিকায় রয়েছেন জোন-৭-এর অথরাইজড অফিসার মোহাম্মদ ইলিয়াস, জোন-৮-এর রংগন মন্ডল, জোন-৪-এর সাবেক অথরাইজড অফিসার মোহাম্মদ কায়সার পারভেজ এবং একই জোনের পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়া। তাদের বিরুদ্ধে রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে বেসরকারি আবাসন প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ভবন মালিককে অনৈতিকভাবে সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, যেসব নকশা স্বাভাবিক নিয়মেই অনুমোদন পাওয়ার কথা, সেসব ক্ষেত্রেও বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন (বিসি) কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ে নির্ধারিত হারে আর্থিক সুবিধা দিতে হয়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এটি এখন অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী ভবন নির্মাণের পর অনুমোদিত নকশা ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) অনুসারে কাজ হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব অথরাইজড অফিসারদের। তাদের পরিদর্শন প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই নকশাবহির্ভূত নির্মাণে নোটিশ দেওয়া, কারণ দর্শানোর সুযোগ রাখা এবং প্রয়োজন হলে অবৈধ অংশ উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়ার কথা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে এই তদারকির ক্ষমতাই অর্থ আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নকশার বাইরে নির্মাণের সুযোগ দেওয়া কিংবা পরে উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জোন-৮-এর অথরাইজড অফিসার রংগন মন্ডল বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সঠিক নয়। প্রয়োজন হলে বিষয়টি যাচাই করে দেখতে পারেন।’

জোন-৭-এর অথরাইজড অফিসার মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, ‘আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ভবন মালিকদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের তদারকিতে গাফিলতি নেই। ভবন মালিকরা যদি অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটান, সে দায় তাদের। এ ধরনের ক্ষেত্রে আমরা নিয়ম অনুযায়ী নোটিশ দিয়ে থাকি।’

এর আগে মানুষের হয়রানি কমাতে পূর্ত মন্ত্রণালয় রাজউকের কাছ থেকে হস্তান্তর অনাপত্তি (এনওসি) নেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাতিল করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই সিদ্ধান্তে একটি ধরনের হয়রানি কমলেও মাঠপর্যায়ের অনিয়ম ও দুর্নীতিতে এখনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। ফলে নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ, অবৈধ স্থাপনা এবং প্রভাবশালীদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।

পরিচালক (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ-২) এর মোহাম্মদ কাইছার বলেন, ‘নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ভবন নির্মাণের দায় সব পক্ষেরই রয়েছে। কোনো কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অনিয়ম করে থাকলে এবং আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে, তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’