লামায় ১০ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্যের রেশ না কাটতেই
রেঞ্জ কর্মকর্তা কবিরের নতুন টিপিতে পদুয়ায় অবৈধ কাঠসহ ট্রাক আটক

বান্দরবানের লামা বন বিভাগের বিতর্কিত সদর রেঞ্জ কর্মকর্তা (ডেপুটি রেঞ্জার) কে এম কবির উদ্দিনের সিন্ডিকেটের লাগামহীন দুর্নীতির মাত্রা যেন দিনদিন বেড়েই চলছে, অথচ সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলের সবুজায়ন ধ্বংসকারী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার কেউ নেই। এই চরম দুর্নীতি ও বনাঞ্চল ধ্বংস প্রতিহত করার আইনি দায়িত্ব যাদের কাঁধে ন্যস্ত, খোদ তাদেরই ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ও ছত্রছায়ায় কবির একের পর এক সরকারি সম্পদ লুণ্ঠন ও কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখে ১০ লক্ষ টাকার বিশাল অংকের উৎকোচের বিনিময়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা কে এম কবির উদ্দিন এবং তার বিশ্বস্ত দুই বন প্রহরী আমিরুল ইসলাম ও জুলহাস উদ্দিনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় সংরক্ষিত বনের অবৈধ কাঠ পাচারের সময় রূপসীপাড়া আর্মি ক্যাম্পের সদস্যরা হাতেনাতে কাঠবোঝাই দুইটি ট্রাক আটক করেছিল। এই নজিরবিহীন ঘটনার পর বিভাগীয় পর্যায় থেকে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন এবং গুরুতর অপরাধের জন্য কৈফিয়ত তলব বা কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হলেও ক্ষমতার দম্ভে কবিরের এই দুর্নীতি সিন্ডিকেটকে বিন্দুমাত্র দমিয়ে রাখা সম্ভব হয় নাই। খোদ বন বিভাগের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ), চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দো এবং সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মাসুম আলমের মতো শীর্ষ কর্তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা, অনৈতিক ব্যাকআপ ও দীর্ঘদিনের সক্ষতার সুবাদে কবির প্রতিবারই পার পেয়ে যান এবং আইনের জাল ছিঁড়ে বের হয়ে আসেন। এমনকি চরম ধৃষ্টতা দেখিয়ে তিনি প্রশাসনের দেওয়া কোনো কৈফিয়তের জবাব পর্যন্ত দাখিল করেন নাই, যাহা একটি সরকারি অধিদপ্তরের গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থার পক্ষে পুরা অবমূল্যায়নই নয় বরং সরাসরি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের শামিল।
সেনাবাহিনীর হাতে ট্রাক ধরা পড়ার সেই চাঞ্চল্যকর ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে এবং মাত্র ২০ দিনের মাথায় আবারও রেঞ্জ কর্মকর্তা কে এম কবির উদ্দিনের সরাসরি ইস্যুকৃত টিপি (চলাচল পাশ) মূলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মূল্যবান কাঠ অভিনব কায়দায় পাচারকালে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের পদুয়া রেঞ্জের অধীন পদুয়া বিট কাম চেক স্টেশনে একটি বড় ট্রাক আটক করা হয়েছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে লামা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকা মেট্রো-ট ১১-৫৩১৯ নাম্বারের এই কাঠবোঝাই ট্রাকটি তল্লাশি করে চেক স্টেশনের কর্মকর্তারা জিম্মি করেন। একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করেছে যে, রেঞ্জ কর্মকর্তা কবির উদ্দিনের সুকৌশলে প্রদানকৃত ওই ছাড়পত্রের (টিপি) আড়ালে মূলত বৈধ কাঠের নাম ব্যবহার করে ভেতরে বিপুল পরিমাণ সম্পূর্ণ অবৈধ ও সংরক্ষিত বনের চোরাই কাঠ পাচার করা হচ্ছিল। এই বিষয়ে কাউসার নামের এক স্থানীয় ব্যবসায়ী চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, জব্দকৃত ট্রাকটি যদি কোনো প্রকার প্রভাব ছাড়া নিরপেক্ষ ও সঠিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, তবে কবির উদ্দিনের ইস্যু করা টিপির বিবরণের সাথে ট্রাকে থাকা কাঠের প্রকৃত জাত, পরিমাপ এবং হাতুড়ির হ্যামার চিহ্নের কোনো ধরনের মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। অপর দিকে এই নতুন কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দিতে ও নিজের পিঠ বাঁচাতে রেঞ্জ কর্মকর্তা কবির উদ্দিন এবারও মোটা অংকের টাকার মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছেন এবং বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী ও প্রভাবশালীদের মাধ্যমে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) সহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের যেকোনো মূল্যে ‘ম্যানেজ’ করার জোর পায়তারা চালাচ্ছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পদুয়া চেক স্টেশনের বর্তমান স্টেশন কর্মকর্তা কবির উদ্দিনের অত্যন্ত পুরোনো ও একান্ত আস্থাভাজন লোক হিসেবে পরিচিত হওয়ায় ঘটনাটি হালকা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। সোলেমান নামের অপর এক কাঠ ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, কে এম কবির উদ্দিনের দুর্নীতির কৌশল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী; তিনি যেমন বনের কাঠ পাচারকারীদের কাছ থেকে নিজে লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন, ঠিক তেমনিভাবে সেই কালো টাকার একটি বড় অংশ দিয়ে নিজস্ব বন প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও সম্পূর্ণ ম্যানেজ বা অবশ করে রাখেন। আর এই বিপুল অর্থ লেনদেনের কারণেই বন বিভাগের শীর্ষ কর্তৃপক্ষ কবিরের করা পাহাড়সম দুর্নীতির দিকে সবসময় নমনীয় ও অন্ধের ভূমিকা পালন করে থাকে, যা কাজে লাগিয়ে কবির মাসের পর মাস বনাঞ্চল উজাড় করে লক্ষ লক্ষ টাকার ব্যক্তিগত অবৈধ আয়ের রাজত্ব কায়েম করে চলেছেন। বনের রক্ষকের এমন ভয়ংকর ও বেপরোয়া ভক্ষক রূপ এবং প্রশাসনের এমন প্রকাশ্য নিষ্ক্রিয়তা দেশের পুরো বনজ সম্পদ ও পরিবেশকে এক চরম ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সচেতন মহল।
