নিস্ক্রিয় ও প্রতারক হজ¦ এজেন্সির পথ বন্ধের উদ্যোগ

ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসকে পুঁজি করে বছরের পর বছর ধরে চলা অনিয়ম, প্রতারণা এবং অব্যবস্থাপনার লাগাম টানতে কঠোর প্রশাসনিক অভিযানে নেমেছে সরকার। নিষ্ক্রিয় ও নামসর্বস্ব এজেন্সিগুলোর লাইসেন্স বাতিলের পাশাপাশি প্রতারণায় অভিযুক্ত অসাধু প্রতিষ্ঠানগুলোর পথ চিরতরে বন্ধ করতে একাধিক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়। চলতি ২০২৬ সালের হজ মৌসুমে নানা ধরনের অনিয়ম, শর্ত লঙ্ঘন এবং হজযাত্রীদের হয়রানির অভিযোগে অর্ধশতাধিক হজ এজেন্সির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৭টি সংস্থাসহ একাধিক এজেন্সিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, ২০২৭ সালের হজ ব্যবস্থাপনায় শতভাগ শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং সৌদি সরকারের ডিজিটাল রূপান্তরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে চার মাস আগেই নতুন রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২০২৭ সালের হজ নিবন্ধন শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় অন্তত ১৬ দিন আগে।
মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, যেসব এজেন্সি নিষ্ক্রিয় কিংবা বছরের পর বছর ধরে ন্যূনতম হজযাত্রী পাঠাতে ব্যর্থ হচ্ছে, তাদের হজ কার্যক্রম থেকে সম্পূর্ণ ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টানা তিন বছর ৪০ জনের কম হজযাত্রী নিবন্ধন করেছে এবং চলতি ২০২৬ সালে একটিও নিবন্ধন করাতে পারেনি-এমন সব এজেন্সিকে ২০২৭ সালের হজ কার্যক্রম থেকে স্থায়ীভাবে বাদ দেওয়া হবে। এছাড়া প্রতিটি এজেন্সিকে অন্তত একজন গাইড সমসংখ্যক অর্থাৎ ৪৬ জন হজযাত্রী নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে; অন্যথায় ছোট এজেন্সিগুলোকে একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় বা স্থানান্তর করতে হবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ভুয়া ও নিষ্ক্রিয় এজেন্সিগুলোর অসাধু ব্যবসা বন্ধ হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া পেশাদারিত্বের আওতায় আসবে।
হজ অনুবিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মো. আয়াতুল ইসলাম জানান, ‘নিষ্ক্রিয় এবং প্রতারক এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। সৌদি আরব এখন পুরো হজ ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ কম্পিউটারাইজড ও সেন্ট্রাল ‘নুসুক মাসার’ সিস্টেমের আওতায় নিয়ে এসেছে। তারা জুলাইয়ের মধ্যেই তাঁবু বুকিং ও আবাসন চূড়ান্ত করার শর্ত দিয়েছে। ফলে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে স্বচ্ছতার সাথে দ্রুত নিবন্ধন সম্পন্ন করা। যেসব এজেন্সি হাজিদের টাকা আত্মসাৎ করেছে কিংবা সৌদি নিয়ম ভঙ্গ করে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে, তাদের লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর আইনি শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।’
উল্লেখ্য, গত ২৬ মে অনুষ্ঠিত পবিত্র হজে বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৮ হাজার ৫০০ জন হাজি অংশ নেন, যার মধ্যে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন হজযাত্রী পাঠাতে ৭৫৮টি এজেন্সি নিয়োজিত ছিল। তবে অভিযোগ উঠেছে, বেশ কিছু এজেন্সির অতিরিক্ত মুনাফা লাভের মানসিকতায় হাজিরা চরম দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন।
তদন্তে উঠে এসেছে, প্রাক-নিবন্ধিত হজযাত্রীদের অন্য এজেন্সিতে অনিয়মতান্ত্রিক স্থানান্তর, সময়মতো সৌদি পাঠাতে ব্যর্থ হওয়া এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়েছে গ্রিন এভিয়েশন, এয়ার রয়্যাল অ্যাভিয়েশন, নর্দার্ন ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, বাপারি এয়ার সার্ভিস এবং এয়ার স্টেশন ইন্টারন্যাশনাল। এ সমস্ত এজেন্সির কাছে কড়া ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে লাইসেন্স বাতিল হওয়া সত্ত্বেও তিনটি এজেন্সি অবৈধভাবে ৪৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছিল; যা পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় উদ্ধার করে ভুক্তভোগীদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে পাঠায়। পাশাপাশি আনসারি ওভারসিজ, রিলেশন ট্রাভেলস এবং নর্দার্ন ট্যুরসের কাছ থেকে অর্থ জরিমানা আদায় করে ক্ষতিগ্রস্ত হাজিদের হজের ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে ‘হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২১’ অনুযায়ী অভিযুক্ত এসব এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল, স্থগিত ও জামানত বাজেয়াপ্ত করার আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
চলতি মৌসুমে সবচেয়ে বড় প্রতারণা ধরা পড়েছে কোরবানির অর্থ আদায় কেন্দ্র করে। সৌদি সরকারের নিবন্ধিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বাইরে গিয়ে হাজিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কোরবানি না করা এবং কেবল ছাগল কেনার ভুয়া রসিদ দেখানোর অভিযোগে প্রত্যাশা ট্রাভেলস, দৈফুর রহমান ট্রাভেলস, গ্লোবাল ট্রাভেলস, মিডিয়া ট্রাভেলস এবং দারুল ইমান ইন্টারন্যাশনালকে শোকজ করা হয়েছে। এছাড়া লাগেজ হারানো, নিম্নমানের খাবার পরিবেশন এবং অনুমোদিত এয়ারলাইন্সের বাইরে টিকিট কাটার দায়ে লাকি ট্রাভেলস ও খোয়াই এয়ার ট্রাভেলসের কার্যক্ৰম আগামী দুই বছরের জন্য স্থগিতসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
অবশ্য অভিযুক্ত এজেন্সির একাধিক মালিকের দাবি, ‘নুসুক প্ল্যাটফর্মের সাময়িক প্রযুক্তিগত জটিলতা ও স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগের বিলম্বের কারণে কিছু হাজির কোরবানির রসিদ তাৎক্ষণিক হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। আমরা কোনো অনিয়মে যুক্ত নই, শোকজের জবাবে সার্বিক প্রমাণ পেশ করা হবে।’
তবে এজেন্সির এমন দাবিকে মিথ্যা আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চলতি বছর হজ শেষ করে আসা ভুক্তভোগী হাজি মো. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘পবিত্র স্থানে গিয়েও আমাদের অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয়েছে। কোরবানি বাবদ অতিরিক্ত টাকা নিয়েও ভুয়া রসিদ ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা পরে দেখা যায় পুরোপুরি ভুয়া। এসব প্রতারক এজেন্সির লাইসেন্স শুধু স্থগিত নয়, মালিকদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও জেল-জরিমানা নিশ্চিত করা দরকার।’
এই অনিয়মের ওপর নজরদারি জোরদার করার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। সংস্থার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘যেহেতু হাজার হাজার মানুষের বৈদেশিক যাত্রা ও আর্থিক নিরাপত্তা এর সাথে জড়িত, তাই কোনো ভুয়া বা লাইসেন্সহীন এজেন্সিকে মাঠে নামতে দেওয়া হবে না। প্রতারক চক্রের তালিকা প্রস্তুত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে তাদের প্রতিরোধ করতে আমরা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি।’
সার্বিক বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধি বলেন, ‘অনিয়মকারীদের কঠোর শাস্তি না দিয়ে বার বারবার ছাড় দেওয়ার কারণেই হজ এজেন্সিগুলো এমন দুঃসাহস পায়। কেবল কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে সময়ক্ষেপণ না করে ‘হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন’ প্রয়োগ করে প্রতারক এজেন্সিগুলোর জামানত বাজেয়াপ্ত ও স্থায়ীভাবে লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। তবেই সাধারণ হাজিদের অধিকার সুরক্ষিত হবে।’
এদিকে হজ এজেন্সিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)-এর মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার বলেন, ‘আমরা কোনো অনিয়ম বা প্রতারণাকে সমর্থন করি না। তবে সৌদির নতুন রোডম্যাপ ও আধুনিক ই-ওয়ালেট ব্যবস্থার সাথে মানিয়ে নিতে এজেন্সিগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। আমাদের দেশের প্রান্তিক দর্শনের মানুষ শেষ মুহূর্তে হজের সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত। নতুন ডিজিটাল বাস্তবতায় সময়মতো নিবন্ধন নিশ্চিত করতে হাব ও সরকারের পক্ষ থেকে যৌথ সচেতনতামূলক প্রচার চালানো জরুরি।’
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ২০২৭ সালের ১৫ মে পবিত্র হজ অনুষ্ঠিত হবে। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নতুন রোডম্যাপ অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ জুলাই থেকে ২৪ ডিসেম্বরের মধ্যে সৌদি খরচের অর্থ নুসুক ই-ওয়ালেটে স্থানান্তর করতে হবে। এয়ারলাইন্স চুক্তি ও নুসুক ডকুমেন্টেশন ৮ নভেম্বরের মধ্যে এবং ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সার্বিক নিবন্ধন শেষ হবে। আগামী বছরের ২৮ জানুয়ারি থেকে ভিসা ইস্যু এবং ৮ এপ্রিল থেকে হজ ফ্লাইট শুরু হবে।
