ভাওয়ালে বনের জমিতে কারখানা, প্রাণীর খাবারেও ভাগ: ডেপুটি রেঞ্জার মাসুদ রানার বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাহাড়

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: অক্টোবর ১৪, ২০২৬ ১৮:১৪:০৫  আপডেট :  অক্টোবর ১৪, ২০২৬ ১৮:১৪:২৭

যেখানে বনের প্রতিটি গাছ রক্ষা করার কথা ছিল ঢাল হয়ে, সেখানে রক্ষক নিজেই পরিণত হয়েছেন বনের প্রধান খাদক হিসেবে। ভাওয়াল গড়ের শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী শাল-গজারি বন, যা রাজধানী ঢাকা ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের ফুসফুস এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার একমাত্র প্রাকৃতিক প্রাচীর—তা ধ্বংসের নেপথ্যে এক অবিশ্বাস্য অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ ঢাকার অধীন গাজীপুরের একাধিক রেঞ্জে দীর্ঘ অর্ধযুগ ধরে দায়িত্ব পালনকারী ডেপুটি রেঞ্জার মো. মাসুদ রানার বিরুদ্ধে বনভূমি বেহাত, শিল্প-কারখানা স্থাপনে সহায়তা, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্ষমতার দাপটে সরকারি বদলি নীতিকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে রাখার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

​অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর তিনি গাজীপুরের পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ভাওয়াল রেঞ্জ এবং ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান রেঞ্জের দায়িত্ব পালন করেন। এই দীর্ঘ সময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে বনভূমিকে ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক খাতে ছেড়ে দেওয়ার এক স্থায়ী বলয় গড়ে তোলেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, সুকৌশলে ও প্রভাবিত সীমানা নির্ধারণের মাধ্যমে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমি থেকে বনের সাইনবোর্ড সরিয়ে বড় বড় শিল্পপতি ও স্থানীয় প্রভাবশালী দখলদারদের কারখানা স্থাপনের পথ সুগম করে দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাওয়াল গড় কেবল কাঠ উৎপাদনকারী বন নয়; এটি স্থানীয় জলবায়ুর আর্দ্রতা রক্ষা, বায়ুমণ্ডলের ক্ষতিকর কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে অপরিসীম ভূমিকা পালন করে। এছাড়া বনটি লজ্জাবতী বানর, গন্ধগোকুল, বনবিড়াল, শিয়াল এবং বহু প্রজাতির দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির প্রাকৃতিক আবাসস্থল। এই বনভূমি দখল ও শিল্পবর্জ্যের দূষণে পুরো বাস্তুতন্ত্র ও খাদ্যশৃঙ্খল আজ চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

​বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ধ্বংসের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বনভূমি বেহাত ও কারখানা মালিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে মাসুদ রানা কোটি কোটি টাকা উপার্জন করেছেন। সেই অবৈধ অর্থে রাজধানী ঢাকা এবং নিজ জেলায় নিজের নামে ও আত্মীয়-স্বজনের নামে একাধিক ফ্ল্যাট, বাণিজ্যিক প্লট এবং শত শত বিঘা জমি ক্রয় করে এক অঘোষিত সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন।

​বর্তমানে তিনি একই বিভাগের আওতাধীন সদর রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। নতুন কর্মস্থলেও পুরনো কারসাজি থামেনি; বরং রূপ নিয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির। অভিযোগ রয়েছে, বন্যপ্রাণীর নিয়মিত খাবার সরবরাহ, নতুন চারা রোপণ, সামাজিক বনায়ন এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি টাকা আত্মসাৎ করতে তিনি নিকটাত্মীয়দের ঠিকাদারি লাইসেন্স ব্যবহার করে নামমাত্র বা ভুয়া কোটেশন জমা দেন। পরে কাজ সম্পন্ন না করেই অথবা নামমাত্র বাস্তবায়ন দেখিয়ে সাজানো বিল-ভাউচারের মাধ্যমে লাখ লাখ সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ফলে বরাদ্দ থাকলেও খাঁচায় বা অভয়ারণ্যে বন্যপ্রাণীর পুষ্টিকর খাদ্য সংকট তৈরি হচ্ছে এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত শালবনে নতুন চারা রোপণের স্বপ্ন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে।

​সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো তাঁর প্রশাসনিক অবস্থান। বন অধিদপ্তরের বিদ্যমান প্রশাসনিক বদলি নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী একই ডিভিশন বা কর্মস্থলে একটানা তিন বছরের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। উদ্দেশ্য একটাই—এক জায়গায় দীর্ঘদিন থাকলে যেন কায়েমি স্বার্থ ও দুর্নীতির সিন্ডিকেট তৈরি না হয়। কিন্তু মো. মাসুদ রানা টানা ছয় বছর ধরে একই সার্কেল ও ডিভিশনে বহাল তবিয়তে রাজত্ব করছেন। সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে, বন বিভাগের বিধি-বিধান ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরদারির ঊর্ধ্বে কীভাবে তিনি এত বছর একই স্থানে অবস্থান করছেন এবং কার ছত্রছায়ায় তিনি এত অপ্রতিরোধ্য?

​পরিবেশবিদ ও পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলনের কর্মীদের মতে, বন অপরাধ ও প্রশাসনিক দুর্নীতির এই সংযোগ কেবল একজন কর্মকর্তার দুর্নীতির বিষয় নয়, এটি সরাসরি একটি দেশের জলবায়ু নিরাপত্তা ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চরম আঘাত। বেদখল হওয়া বনভূমির প্রতিটি ইঞ্চি পুনরুদ্ধার করা, দায়ীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বন আইনের আওতায় কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং ভাওয়াল গড়কে আগের প্রাকৃতিক রূপ ফিরিয়ে দিতে কার্যকর শালবন পুনরুজ্জীবন প্রকল্প গ্রহণ করা এখন জাতীয় স্বার্থেই জরুরি হয়ে পড়েছে।