ক্ষমতার আড়ালে শত কোটি টাকার সাম্রাজ্য
পরিবেশের নামে রিজওয়ানা-সিদ্দিকী দম্পতির নজিরবিহীন দুর্নীতি

সুশীল সমাজের এক সময়ের আলোচিত ব্যক্তিত্ব, প্রাক্তন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, নজিরবিহীন দুর্নীতি ও বিপুল অর্থ আত্মসাৎ ও অর্থপাচারের ভয়াবহ অভিযোগের সত্যতা প্রকাশ পেয়েছে। একজন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং পরিবেশ আইনজীবী হিসেবে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে ভাবমূর্তি গড়ে তুললেও সাম্প্রতিক একাধিক অনুসন্ধানী তথ্য, নথিপত্র এবং রাজনৈতিক ও আইনি প্রতিক্রিয়া থেকে তাদের শত শত কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্যের একটি সুনির্দিষ্ট ছক উন্মোচিত হয়েছে।ঢাকার গুলশান ক্লাব ও মাদানী অ্যাভিনিউ এলাকার শত কোটি টাকার সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়, পরিবেশ অধিদপ্তরের কোটি কোটি টাকার ক্রয় চুক্তি, ইটভাটা ও পলিথিন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ, সরকারি গবেষণা খাতের অর্থ আত্মসাৎ এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব বিস্তারের নানা অনিয়ম নিয়ে এখন দেশজুড়ে তীব্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিকী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর মালিকানাধীন হামিদ ফ্যাশন নামক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় ধরে কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ২০০৪ সালের দিকে সাবেক এই প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্কের ওপর ভর করে আবু বকর সিদ্দিকী প্রতিষ্ঠানের সাথে সরাসরি জড়িয়ে পড়েন।
বিগত সরকারের ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর এবং রিজওয়ানা হাসান অন্তর্বতীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এই পূর্ব পরিচিতি ও ব্যবসায়িক ঘনিষ্ঠতাকে ভিন্নভাবে ব্যবহার করা হতে থাকে। অনুসন্ধান অনুযায়ী, সাবেক সরকারের পতন ঘটে যাওয়ার পর সাবেক প্রতিমন্ত্রী বিপুর শত শত কোটি টাকার বেআইনি এবং ক্রোকযোগ্য সম্পত্তি আইনি তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য উপদেষ্টা পদ ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সরাসরি অপব্যবহার করেন রিজওয়ানা হাসান এবং তার স্বামী। দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে বিপুর নানা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করার উদ্দেশ্যে আদালতের শরণাপন্ন হলেও অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজধানীর গুলশান ক্লাবের ঠিক উল্টো পাশে অবস্থিত নসরুল হামিদ বিপুর প্রায় ২০০ কোটি টাকা মূল্যমানের এক বিঘা জমির ওপর নির্মিত সম্পদকে সেই আইনি ক্রোক তালিকা থেকে অলৌকিকভাবে বাদ দেওয়া হয়।
অভিযোগ উঠেছে, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সরাসরি হস্তক্ষেপে এবং পূর্ত মন্ত্রণালয়ে তার মৌখিক প্রশাসনিক নির্দেশের মাধ্যমেই সরকারের অনুকূলে এই জমি বাজেয়াপ্ত করার কার্যক্রম আটকে রাখা হয়। এই শত কোটি টাকার সম্পত্তি বিক্রির জন্য রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিকী বেশ কয়েকজন ব্যবসায়িক গ্রাহকের কাছে প্রস্তাব পৌঁছে দিয়েছিলেন বলে অন্তত তিনজন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিশ্চিত করেছেন। একইভাবে রাজধানীর মাদানী অ্যাভিনিউর ১০০ ফুট রাস্তার পাশে থাকা বিপুর প্রায় ৫ বিঘা মূল্যবান জমি বড় আকারে বিক্রি করতে না পেরে ছোট ছোট প্লট বানিয়ে বিক্রির কাজ তদারকি করছেন রিজওয়ানা হাসানের স্বামী। উপরন্তু, নসরুল হামিদ বিপুর ‘হামিদ সোয়েটার লিমিটেড’ নামক বড় একটি পোশাক কারখানা চালু রাখা ও বাজেয়াপ্তকরণ এড়ানোর জন্য কাগজের মালিকানা বদল করে রিজওয়ানা হাসানের স্বামী ও ছেলে আহমেদ জহির সিদ্দিকীর নামে স্থানান্তর করা হয়, যদিও এই কারখানার মূল সুবিধাভোগী ও আসল মালিক হিসেবে সাবেক প্রতিমন্ত্রী বিপুই থেকে যান। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের নীতিগত নানা সিদ্ধান্ত ও তার মন্ত্রণালয়ের অধীনে শত কোটি টাকার অর্থ ছাড় নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগের নথিপত্র বেরিয়ে এসেছে।
অন্তর্বতীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিবেশ রক্ষায় পলিথিন ও অবৈধ ইটভাটা বন্ধে জেহাদ ঘোষণা ও দেশব্যাপী অভিযান শুরুর বার্তা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনুসন্ধানী সূত্রে জানা যায়, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই সেই সমস্ত অভিযান রহস্যজনকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এর পেছনে কাজ করেছে পলিথিন ও ইটভাটা মালিকদের সংগঠনগুলোর সঙ্গে উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীর অনৈতিক সমঝোতা ও কোটি কোটি টাকার অর্থ লেনদেন। পলিথিন উৎপাদকদের সংগঠন আয়োজিত একটি পাঁচ তারকা হোটেলের সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আবু বকর সিদ্দিকী, যার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তাকে এই আসনে বসানো হয় কেবল আর্থিক লেনদেনের বিনিময়ে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার কারণে। পলিথিন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এই রফা হওয়ার পরেই নভেম্বরের পর থেকে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে পলিথিনবিরোধী সকল নিয়মিত অভিযান আকস্মিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। একইভাবে ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী ছাড়পত্র বা লাইসেন্স প্রদানের সর্বময় ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নেন রিজওয়ানা হাসান।
সরকারের নীতিমালা পাশ কাটিয়ে কেবল তাদেরকেই লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে যারা সরাসরি আবু বকর সিদ্দিকীর সাথে যোগাযোগ করে চাহিদামতো মোটা অঙ্কের অর্থ প্রদান নিশ্চিত করেছিলেন। একই ধরণের অনিয়মের রাজত্ব গড়ে তোলা হয়েছিল দেশের পর্যটন ও জাতীয় প্রাকৃতিক সম্পদকে ঘিরে। সিলেটের ভোলাগঞ্জের বিখ্যাত সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্রে ২০২৩-২০২৪ সময়কালের মাঝামাঝি মে থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত নির্বিচারে পাথর লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। তৎকালীন সিলেটের জেলা প্রশাসক পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে লিখিত চিঠি পাঠিয়ে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামিয়ে সরকারি সম্পদ পাথর চুরি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করলেও তৎকালীন উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান কোনো জবাব দেননি। চার মাস ধরে অবাধে সরকারি সম্পদ লুটপাটের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া এবং নীরব থাকার পেছনে রিজওয়ানা হাসান ও তার স্বামী সরাসরি আর্থিক লাভবান হয়েছেন বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। পর্যটন দ্বীপ সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের গমনাগমন দীর্ঘ সময়ের জন্য নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেশের সার্বভৌমত্ব ও বৈদেশিক ষড়যন্ত্রের প্রশ্নও সামনে এসেছে, যা কোনো টেকসই পরিবেশ গবেষণার ভিত্তিতে করা হয়নি।
অন্যদিকে সিলেটের হাওড় ও হাকালুকির পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার নামে আইইউসিএনের তৈরি করা বছরের পুরোনো এক গবেষণাপত্রকে নতুন কাজ হিসেবে দেখিয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে কয়েক শত কোটি টাকা তুলে নিয়ে লোপাট করা হয়েছে। সরকারি ক্রয় বিধি ও টেন্ডার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে নিজের ঘনিষ্ঠজনদের মধ্যে অর্থ বিলিয়ে দেওয়ার অভিযোগগুলোও নথিপত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, রিজওয়ানা হাসান পদে আসার পর অন্তত ৩০০ কোটি টাকার বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের কার্যাদেশ কোনো প্রকার উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিবর্গকে দেওয়া হয়েছিল। শব্দ দূষণ ও বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণের নামে সরকারি অর্থ দিয়ে চালানো প্রচারণা কর্মসূচির অধিকাংশ বিল কাজ না করেই উত্তোলন করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রথমে অর্থ ছাড়ে আপত্তি জানালেও রিজওয়ানা হাসান নিজেই টেলিফোন করে মহা-পরিচালককে বিল পরিশোধের বাধ্যবাধকতা দেন, এবং অধিদপ্তরের হিসাব শাখার নথিতে তা সরাসরি ‘উপদেষ্টা মহোদয়ের নির্দেশে পরিশোধিত’ বলে লিখে রাখা হয়। একই সাথে বন বিভাগের লাভজনক কর্মকর্তা পদে কিংবা প্রধান বন সংরক্ষক পদের পদায়নে শত কোটি টাকার বদলি বাণিজ্যের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছেন তার স্বামী।
অভিযোগের এই ভয়াবহ পরিধি প্রকাশের পর দেশের অর্থনৈতিক গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো নড়েচড়ে বসেছে। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বিএফআইইউ ইতোমধ্যে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নামের সমস্ত ব্যাংকিং হিসাব, লেনদেনের বিস্তারিত স্টেটমেন্ট ও তাদের পরিচালিত পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক দলিল পর্যালোচনার জন্য দেশি-বিদেশি সব ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকে তাদের বিরুদ্ধে সরকারি ক্রয় বিধির ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, সাবেক মন্ত্রীদের অবৈধ সম্পদ আড়াল, বায়ু ও হাওড় গবেষণার নাম করে অর্থ লোপাট এবং ইটভাটা ও পরিবেশ ছাড়পত্রের নামে ঘুসের লেনদেনের অসংখ্য সুনির্দিষ্ট ও লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। দুদক সূত্র জানিয়েছে অভিযোগসমূহ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধানের জন্য তাদের প্রাথমিক যাচাই কাজ চলমান রয়েছে।
বাংলাদেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিবেশেও এই ঘটনা গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীসহ একাধিক রাজপথের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে কেবল অর্থপাচার ও দুর্নীতিই নয়, বরং অন্তর্বতীকালীন সরকারে থেকে একটি সুনির্দিষ্ট দলের পক্ষে অন্যায্য রাজনৈতিক সুবিধা প্রদান এবং জাতীয় নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কারচুপি বা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নীলনকশা বাস্তবায়নের গুরুতর অভিযোগ এনেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ফোরাম, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং টিআইবির মতো স্বনামধন্য দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা একযোগে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও তার স্বামীকে দ্রুত গ্রেপ্তার করার এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করে দোষীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি তুলেছে।
