প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশে নামার আশঙ্কা, মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশের পূর্বাভাস আইএমএফের 

ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) থেকে এস এম সাইফ আলী
ব্যাংকক (থাইল্যান্ড) থেকে এস এম সাইফ আলী
প্রকাশিত: অক্টোবর ১৩, ২০২৬ ২১:১৪:৪৯

*বাজেট লক্ষ্যের অর্ধেকেরও কম প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস;

*চাপে পড়বে নিম্ন আয়ের মানুষ

চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। একই সঙ্গে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে পারেন নিম্ন আয়ের মানুষ।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার দ্বিতীয় দিনে প্রকাশিত সংস্থাটির ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়।

আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি গত এপ্রিলে দেওয়া ৪ দশমিক ৩ শতাংশের পূর্বাভাসের তুলনায় ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট কম হতে পারে। জুলাইয়ে সংস্থাটি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করেছিল। এবার তা আরও কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে।

অন্যদিকে, মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে সংস্থাটি। এপ্রিলে চলতি অর্থবছরের জন্য ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দেওয়া হলেও নতুন হিসাবে তা বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির চাপও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা করছে আইএমএফ।

পূর্বাভাস নিয়ে বিতর্কে যেতে চায় না সরকার

আইএমএফের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সংস্থাটির দেওয়া পূর্বাভাস নিয়ে সরকার বিতর্কে যেতে চায় না। তবে বাজেটে নির্ধারিত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বিষয়ে সরকার আশাবাদী।

ব্যাংককে আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা কারও পূর্বাভাস নিয়ে বিতর্ক করতে চাই না। তারা তাদের হিসাব দিয়েছে, আমরা আমাদের কাজ করে যাচ্ছি। আমরা আশা করি, বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করতে পারব।’

সরকারের চলতি অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। বিপরীতে আইএমএফের পূর্বাভাস ৩ দশমিক ২ শতাংশ। ফলে সরকারের লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সংস্থাটির পূর্বাভাসের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট।

অর্থমন্ত্রী জানান, বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।

আইএমএফের ঋণ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় আইএমএফের নতুন ঋণসহায়তা পাওয়ার বিষয়টিও বার্ষিক সভার আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে চলছে।

বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থায়নের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে। এসব পরিস্থিতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনা ও সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে আলোচনা ইতিবাচক হওয়া মানেই নতুন ঋণ অনুমোদন বা অর্থ ছাড়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে, এমন নয়। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনার প্রক্রিয়া আরও এগোবে এবং এ পর্যায়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না।

ব্যাংকিং খাত ও বিনিয়োগে দুর্বলতা

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বেসরকারি বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ঘাটতি এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো চাপ সৃষ্টি করছে।

বিশ্বব্যাংকও সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার পেছনে জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা, ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি, ঋণপ্রবাহের দুর্বলতা এবং সরকারি অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছে।
ব্যাংকিং খাতে দুর্বলতা থাকলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণপ্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে নতুন শিল্প স্থাপন, উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকলে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে দিতে পারেন।
জ্বালানি ও কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধি উৎপাদন খরচ বাড়াতে পারে। পরিবহন ও ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়ে গেলে তার একটি অংশ পণ্যের দামে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি চাপ

আইএমএফের ১০ দশমিক ৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও চিকিৎসার ব্যয় বাড়লে পরিবারগুলোকে অন্যান্য খাতে খরচ কমাতে হতে পারে। আয় একই হারে না বাড়লে সঞ্চয় কমে যেতে পারে এবং সংসার চালাতে ঋণনির্ভরতা বাড়তে পারে।

তবে মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছানো এখনো আইএমএফের পূর্বাভাস; এটি বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার নয়। একইভাবে, এই পূর্বাভাসের অর্থ প্রতিটি পণ্যের দাম সমান হারে বাড়বে, এমনটিও নয়।

অন্য সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসও সতর্কতামূলক

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও (এডিবি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। এডিবির পূর্বাভাস ৪ শতাংশ।

আইএমএফের পূর্বাভাস এ দুটি সংস্থার তুলনায় কম। বিশ্বব্যাংকও জ্বালানি ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতাকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে গুরুত্বপূর্ণ বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

আইএমএফের হিসাবে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের ৩ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে সামান্য বেশি। নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ—দুটি লক্ষ্যই এখন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক সংঘাত, বৈদেশিক মুদ্রার পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ নীতির কার্যকারিতার ওপরও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।