ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে ঢাকা কর অঞ্চল-৫, ৯৯ সার্কেলের ইউডি সাইফুলের ২০ কোটি টাকার সম্পদের পাহাড়

ঢাকা কর অঞ্চল-৫ সার্কেল-৯৯’র উচ্চমান সহকারী সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ দুর্নীতি করদাতাদের ব্ল্যাকমেইলিং করে লাখ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। কর কমিশনার, ডেপুটি কর কমিশনার প্রত্যেকের নামেই বিভিন্ন অজুহাত সৃষ্টি করে করদাতাদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত বিপুল অংকের টাকা ঘুষ গ্রহন অব্যাহত থাকলেও দেখার কেউ নেই। চাকুরী জীবনে এহেন ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে ১৩ কোটি টাকার দৃশ্যমান সম্পদ সহ ব্যাংকে স্ত্রী ও নিকটজনদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে আরো ৫ কোটি টাকার এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র ও নগদ অর্থের সন্ধান পাওয়া গেছে।
প্রাপ্ত প্রাপ্ত তথ্য মতে, টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর থানাধীন পলশিয়া পশ্চিমপাড়াস্থ মো: ছোবহানের পুত্র এই সাইফুল ইসলাম (৪৫)। মাত্র ১ যুগ এই লোভনীয় পদে চাকুরির সুবাদে তিনি এই বিশাল বিত্ত বৈভবের মালিক বনে গেছেন। তার বিরুদ্ধে টাঙ্গাইল অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট গোপালপুর থানা আমলি আদালতে পৃথক ২টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। পৃথক ২টি মামলায় বাদী জনৈক হাফিজুর রহমান তাঁর বিরুদ্ধে জবরদখল করে সম্পত্তি দখলের অভিযোগ এনেছেন। আদালতেও আয়কর বিভাগের উচ্চমান সহকারী পরিচয় দিয়ে মোটা অংক খরচা করে মামলা ২টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন বলেও বাদী হাফিজুর রহমান জানিয়েছেন।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, তাঁর নিজের, পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা এবং কথিত বেনামি সম্পদের জমি, বাড়ি ও গরুর খামারসহ মোট সম্পদের মূল্য প্রায় ১৩ কোটি ৭ লাখ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, নিজ বাড়ির পাশে প্রায় ১১ শতাংশ জমিতে রয়েছে গরুর খামার। বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে আরও জমি। এর মধ্যে ভারারিয়ায় প্রায় এক বিঘা, মাইজবাড়ীতে দুই বিঘা, বাড়ির আশপাশে ২০ শতাংশ, কবরস্থানসংলগ্ন ১০ শতাংশ এবং পলশিয়া বাজারের প্রধান সড়কের পাশে প্রায় ১৬ শতাংশ জমির পাশাপাশি প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের একটি বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে।
এত বিপুল সম্পদের অর্থের উৎস কোথায়—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। চাকরিজীবনের আয়, আয়কর নথিতে ঘোষিত সম্পদ এবং অভিযোগে উঠে আসা সম্পদের মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ১১ শতাংশ জমিতে গরুর খামার সাইফুল ইসলামের নিজ বাড়ির পাশে প্রায় ১১ শতাংশ জমি রয়েছে। জমিটির আনুমানিক মূল্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ওই জমিতেই পরিচালিত হচ্ছে গরুর খামার। খামারে চারজন কর্মচারী কাজ করেন এবং তাঁদের পেছনে মাসে প্রায় ১ লাখ টাকা ব্যয় হয়। খামার, জমি ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আয়-ব্যয়ের বিষয়টিও অভিযোগের অন্যতম অংশ। ২ কোটি টাকার বাড়ি সাইফুল ইসলামের একটি বাড়ির মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। বাড়িটির নির্মাণ ব্যয়, জমির মালিকানা এবং নির্মাণে ব্যবহৃত অর্থের উৎস নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর চাকরিজীবনের আয় ও ঘোষিত সম্পদের সঙ্গে বাড়িটির মূল্য ও নির্মাণ ব্যয়ের হিসাব মিলিয়ে দেখা দরকার। ভারারিয়ায় এক বিঘা, মাইজবাড়ীতে দুই বিঘা অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ভারারিয়া এলাকায় প্রায় এক বিঘা জমি রয়েছে সাইফুল ইসলামের। এর আনুমানিক মূল্য ৫০ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মাইজবাড়ীতে রয়েছে প্রায় দুই বিঘা জমি—এমন অভিযোগও রয়েছে। ওই জমির মূল্যও প্রায় ৫০ লাখ টাকা বলে জানা গেছে। এ ছাড়া বাড়ির আশপাশে প্রায় ২০ শতাংশ, কবরস্থানসংলগ্ন প্রায় ১০ শতাংশ এবং পলশিয়া বাজারের প্রধান সড়কের পাশে প্রায় ১৬ শতাংশ জমির তথ্য দেওয়া হয়েছে অভিযোগপত্রে। অভিযোগে এসব জমির মালিকানা ও মূল্য পৃথকভাবে উল্লেখ করা হলেও সব মিলিয়ে সম্পদের মূল্য ১৩ কোটি ৭ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সম্পদের পাশাপাশি জমি দখলের অভিযোগ সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে শুধু বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগই নয়, জমি দখল ও জোরপূর্বক জমি নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগপত্রে কবরস্থানের পাশে থাকা একটি জমি জোরপূর্বক নেওয়ার দাবি করা হয়েছে। অন্য একটি ঘটনায় অভিযোগ করা হয়েছে, তিন ভাইকে বঞ্চিত করে তাঁদের বাবার কাছ থেকে জমি লিখে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মৃত ছামান আলীর ছেলে মো. দেলোয়ার হোসেনের প্রায় ৬ শতাংশ জমি জোরপূর্বক দখল বা নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। ১৪ শতাংশ জমি নিয়ে আদালতে মামলা জমি নিয়ে বিরোধের একটি ঘটনা আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে।
গোপালপুর থানার আমলি আদালতে মো. হাফিজুর রহমান বাদী হয়ে মো. সাইফুল ইসলামসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মামলার নথিতে অন্য যাঁদের নাম রয়েছে, তাঁরা হলেন—রুহুল আমিন, আবু বকর মিয়া ও শাহজাহান। মামলার নথি অনুযায়ী, মাইজবাড়ীর ১৪ শতাংশ জমির মালিকানা ও দখলকে কেন্দ্র করে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিরোধের পর আদালতের নোটিশে উভয় পক্ষকে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নালিশি ভূমিতে যে যার দখল বজায় রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ১৩ কোটি ৭ লাখ টাকার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন অভিযোগপত্রে জমি, বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে আলাদা আলাদা মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৩ কোটি ৭ লাখ টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—এই বিপুল সম্পদের অর্থের উৎস কী? সাইফুল ইসলামের চাকরিজীবনের আয় কত এবং সেই আয়ের সঙ্গে এত সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—এ বিষয়টি নিয়েই মূলত প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমির দলিল, নামজারি এবং বাড়ি নির্মাণের ব্যয়ের তথ্য সামনে এলে সম্পদের উৎস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তদন্তের দাবি অভিযোগে উল্লিখিত সম্পদ ও জমি-সংক্রান্ত বিষয়গুলো তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কর গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের হস্তক্ষেপ দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, শুধু সম্পদের পরিমাণ নয়—এসব সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে এবং এর পেছনে অর্থের উৎস কী, সেটিই তদন্তের মূল বিষয় হওয়া উচিত।
তা ছাড়াও স্ত্রী পরিজনের নামে থাকা বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের এফডিআর ও পোস্ট অফিসে থাকা কোটি টাকার সঞ্চয়পত্রের বিষয়টি তার স্ত্রীর এনআইডি নাম্বারের মাধ্যমে সনাক্ত করলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে বলেও সূত্র জানায়। পর্যবেক্ষক মহলের মতে এই দুর্নীতিবাজ কর কর্মচারীর বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় তদন্ত গ্রহণপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
