বিশেষ সুবিধা নিয়ে গণপূর্তের প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ

আশরাফুল ইসলাম ইমন
আশরাফুল ইসলাম ইমন
প্রকাশিত: জুলাই ২৫, ২০২৬ ১৭:০২:৪৯

২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার বিরুদ্ধে কমিশনের বিনিময়ে এপিপি বরাদ্দের কাজ সম্পন্ন না করিয়েই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করার অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকার এপিপি বরাদ্দের কাজের দরপত্র আহবান করে কমিশনের বিনিময়ে পূর্ণ বিল পরিশোধ করেছেন বলে জানা যায়।

অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে দরপত্রে আহবান করা কাজগুলো পরিদর্শন করে সত্যতা পাওয়া গিয়েছে। মো. মাসুদ রানা ৫টি ভিন্ন ভিন্ন দরপত্রে এই এপিপি বরাদ্দের কাজের আহবান করেন। দরপত্র আইডি নং ১২৩৬২৩৯ এ তিনি ইস্কাটন গার্ডেন সরকারি অফিসার্স কোয়ার্টার্সের অরুণিমা-নিহারিকা ক্যাম্পাসের উত্তর ও দক্ষিণ দিকের ঝুঁকিপূর্ণ ও জরাজীর্ণ সীমানা প্রাচীর পুনর্নির্মাণ ও উচ্চতা বৃদ্ধি জন্য প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার দরপত্র আহবান করেন। দরপত্র নোটিশ অনুযায়ী কাজটি গত ২৩ জুন ২০২৬ তারিখের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু গত অর্থ বছর ক্লোজিং এর পরে এই দরপত্রের কাজের স্থানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় যে কাজটি অসম্পন্ন। অথচ গত জুন ক্লোজিং এ মাসুদ রানা কাজটি সরকারি নথিপত্রে কাজটি সম্পন্ন দেখিয়ে কমিশনের বিনিময়ে সম্পূর্ণ বিল ঠিকাদারকে পরিশোধ করে দিয়েছেন।

একইভাবে দরপত্র নং ১২৩৬১৩০ এ তিনি ইস্কাটন গার্ডেন সরকারি কর্মকর্তা কোয়ার্টারের সোনালী-রূপালী ক্যাম্পাসের সামনের দিকের জরাজীর্ণ সীমানা প্রাচীর পুনর্নির্মাণ এর জন্য প্রায় ৪০ লাখ টাকার কাজের দরপত্র আহবান করেছেন। এই কাজটিও গত ২৩ জুন ২০২৬ তারিখের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা। কিন্তু এই কাজটিও সম্পন্ন হয়নি গত অর্থ বছর ক্লোজিং পর্যন্ত। এখানেও মাসুদ রানা সরকারি নথিপত্রে কাজটি সম্পন্ন দেখিয়ে সম্পুর্ণ বিল ঠিকাদারকে দিয়ে দিয়েছেন। তার কমিশন বাণিজ্য ছিল এখানেও।

এছাড়া মুগদা সরকারি হাসপাতালেরও গত ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে কিছু এপিপি বরাদ্দের কাজের দরপত্র আহবান করেছেন মো. মাসুদ রানা। এই কাজগুলোও আংশিক সম্পন্ন বা কোন কাজ না করিয়েই সম্পূর্ণ বিল দিয়ে দিয়েছেন তিনি। মুগদা হাসপাতালের দরপত্র নং ১২৭৫৪০২ এ মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ম ও ম তলার কলামে থাকা ক্ষতিগ্রস্ত এসএস (SS) কলাম গার্ড ও ভাঙা টাইলস পরিবর্তন করে নতুনগুলো স্থাপন করার জন্য ১০ লাখ টাকার কাজের আহবান করেছেন মাসুদ রানা। সরেজমিনে মুগদা হাসপাতালের ৮ম ও ম তলার কলামগুলো পরিদর্শন করে দেখা যায় যে, কলামের সকল ভাঙ্গা টাইলস এখনো ভাঙ্গাই রয়েছে। এছাড়া এসএস (SS) কলাম গার্ডগুলোতে মরিচা পড়ে আছে। অভিযোগে এই কাজের বিলও মাসুদ রানা সম্পন্ন দিয়ে দিয়েছেন বলে জানা যায়। দরপত্র নোটিশ অনুযায়ী এই কাজটি শেষ হতে হবে ১৪ জুন ২০২৬ তারিখের মধ্যে। কিন্তু এই কাজটি একেবারে না করেই বিল দিয়েছেন তিনি। 

মুগদা হাসপাতালের আরেকটি দরপত্র ১২৭৫৪৭৮ এ ঢাকা-র মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু বিস্তার রোধে উপরিভাগের ড্রেন মেরামত ও সংস্কার; সেপটিক ট্যাংক, সোক-ওয়েল ও ইন্সপেকশন পিট পরিষ্কার ও মেরামত; সয়েল পাইপ পরিষ্কার; এবং ভবনের আশপাশের আবর্জনা ও আগাছা পরিষ্কারের জন্য প্রায় ১৪ লাখ টাকার কাজের আহবান করেছেন। এই কাজের বিলও মো মাসুদ রানা জুন ক্লোজিং এ সম্পূর্ণ পরিশোধ করেছেন। কিন্তু হাসপাতাল ভবনের আশপাশে ময়লা ও আবর্জনার স্তুপ এখনো স্পষ্ট বিরাজমান রয়েছে।

ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানা মুগদা ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সামনের দিকের ক্ষতিগ্রস্ত ও জলমগ্ন বিটুমিনাস কার্পেটিং সড়ক এবং পার্কিং এলাকার মেরামত এর জন্য প্রায় ২৪ লাখ টাকার ১২৭৫৬৩৮ আইডি নং এর একটি দরপত্র আহবান করেছেন। তিনি গত জুন ক্লোজিং এ কাজটি সরকারি নথিতে সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারকে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করেছেন। কিন্তু এই কাজটিও সরেজমিনে পরিদর্শন করে অসপূর্ণ অবস্থায় পাওয়া গেছে। মুগদা হাসপাতালের পার্কিং এলাকা পরিদর্শন করে বেশ কিছু জায়গা বিটুমিনাস কার্পেটিং ছাড়া পাওয়া গেছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয় যে মো. মাসুদ রানা এই সব কাজের বিল অগ্রীম দিয়ে ঠিকাদারকে বিশেষ সুবিধা দিয়েছেন। আর এই সুবিধা দেওয়ার জন্য তিনি মোটা অংকের কমিশন নিয়েছেন। পিপিআর (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস) অনুযায়ী কাজ সম্পাদন না করে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করার ফলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও ঠিকাদার উভয়ের বিরুদ্ধেই বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং আর্থিক ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। এর মধ্যে চাকরি থেকে বরখাস্ত বা সাময়িক বরখাস্ত, আর্থিক জরিমানা, এবং সরকারের রাজস্ব ক্ষতিপূরণ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

এইসব বিষয়ে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার বক্তব্যের জন্য তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কলটি রিসিভ করেননি। তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি কোনো প্রতিউত্তর দেননি।