চট্টগ্রামে বদলি নীতিমালার চরম অবমূল্যায়ন: দুই বিতর্কিত রেঞ্জারের খুঁটির জোর কোথায়?

চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন বিভাগে প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার এক নজিরবিহীন চিত্র ফুটে উঠেছে। তৎকালীন বন সংরক্ষক ড. মোল্যা রেজাউল করিম কর্তৃক গত ৪ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে ৬ জন ফরেস্ট রেঞ্জারকে বদলি করা হলেও, ৬ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও মো: বাচ্চু মিয়া ও মো: ফিরোজ আল আমিন নামক দুই বিতর্কিত রেঞ্জার নতুন প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় বহাল তবিয়তে রয়ে গেছেন। ড. মোল্যা রেজাউল করিম বরিশাল অঞ্চলে বদলি হওয়ার পর চট্টগ্রাম অঞ্চলের নতুন বন সংরক্ষক (সিএফ) হিসেবে মিহির কুমার দো দায়িত্ব গ্রহণ করলে এই দুই কর্মকর্তার অবৈধ কার্যক্রম আরও বেপরোয়া রূপ নেয়। রেঞ্জার বাচ্চু মিয়া প্রকাশ্যে নিজেকে নতুন সিএফ-এর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট ভাই দাবি করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আসছেন, অন্যদিকে ইনানি রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার ফিরোজ আল আমিনের বিরুদ্ধে বন উজাড়, বনভূমি বিক্রি, সুফল প্রকল্পের বাগান না করে অর্থ আত্মসাৎ এবং বর্তমানে 'হেল্প' প্রকল্পের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। একাধিক গণমাধ্যমে ফিরোজের দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হলেও বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আব্দুল্লাহ আল মামুন অজ্ঞাত কারণে কোনো ব্যবস্থা নেননি, যা পুরো বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন মহলের রহস্যজনক নীরবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
একই সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের শহর রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ বাচ্চু মিয়ার বিরুদ্ধে চলছে নজিরবিহীন চাঁদাবাজি ও লুটপাট। খোদ বাচ্চু মিয়া ৩০ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে এই পোস্টিং বাগিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন, যা তিনি তৎকালীন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পেছনে বিনিয়োগ করেছিলেন। সেই বিনিয়োগের টাকা তুলতে তিনি এখন মরিয়া। তার কর্মক্ষেত্র শুধু শহর এলাকা হলেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি মিরসরাই, ফটিকছড়ি, সীতাকুন্ডসহ বিস্তীর্ণ গ্রামীণ এলাকায় অবৈধ হাইস গাড়ি ও ইউনিফর্ম ছাড়াই বন বিভাগের বিশেষ পোশাক (FD লেখা শর্ট পোশাক) ব্যবহার করে ডিবি পুলিশের স্টাইলে গভীর রাত পর্যন্ত চাঁদাবাজি চালাচ্ছেন। মধুনাঘাট ব্রিজ, হেয়াকো, কয়লা ও মিরসরাইয়ের মতো পয়েন্টগুলোতে ব্যক্তিগত সংগ্রাহক নিয়োগ করে তিনি দৈনিক কয়েক লক্ষ টাকা তুলছেন। পাশাপাশি হাটহাজারী ও ফৌজদারহাট চেক স্টেশন থেকে প্রতিদিন স্লিপের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা তার কাছে পৌঁছায়। শহর এলাকায় মোটরসাইকেল বাহিনীর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত আসবাবপত্র ও কাঠ আটকে অর্থ আদায়, বলিরহাট, বহদ্দারহাট ও হালিশহরের কাঠ ব্যবসায়ী সমিতি এবং শতাধিক অবৈধ স-মিল থেকে প্রতি মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি অফিসের সরকারি উন্নয়নমূলক কাজ কোনো ঠিকাদারকে না দিয়ে কোটি কোটি টাকা তিনি একাই আত্মসাৎ করছেন।
প্রশাসনিক এই বিশৃঙ্খলা আরও প্রকট রূপ নেয় যখন বদলির ৬ মাস পর সিএফ মিহির কুমার দো-র পরামর্শে বাচ্চু মিয়া গত ৪ মে ২০২৬ তারিখে পূর্বের বদলি আদেশ স্থগিত ও পুনর্বহালের জন্য প্রধান বন সংরক্ষক (সিসিএফ) বরাবর আবেদন করেন। ক্ষমতার চরম দম্ভ দেখিয়ে আবেদনটি যথাযথ প্রক্রিয়ার তোয়াক্কা না করে সরাসরি সিসিএফ-এর টেবিলে পৌঁছে দেওয়া হয় এবং পরদিনই অর্থাৎ ৫ মে ২০২৬ তারিখে তদন্ত দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক মো: হুমায়ুন কবির গত ১২ মে ২০২৬ তারিখে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করে উক্ত আদেশটি বাতিল ও স্থগিত করার বিষয়ে সিএফ মিহির কুমার দো-র মতামত চান। অথচ নিয়মানুযায়ী বাচ্চু মিয়া বর্তমানে কর্মরত আছেন চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) সফিকুল ইসলামের অধীনে। বিধি মোতাবেক ডিএফও-র মতামত না চেয়ে সরাসরি বন সংরক্ষকের কাছে মতামত চাওয়া সুস্পষ্ট প্রশাসনিক অবমূল্যায়ন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, বন অধিদপ্তরের সুনির্দিষ্ট বদলি নীতিমালা ও সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা আজ কুচক্রী কর্মকর্তাদের প্রভাব ও বিপুল অবৈধ অর্থের শক্তির কাছে সম্পূর্ণ জিম্মি হয়ে পড়েছে।
