ঋণ খেলাপি ওরিয়নের বন্ধ প্রতিষ্ঠানকে ইসলামী ব্যাংকের অর্ধশত কোটি টাকা ঋণ প্রদান

ঋণ জালিয়াতি, প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, টাকা পাচারসহ নানা অপরাধের অভিযোগ থাকার পরও ওবায়দুল করিমের ওরিয়ন গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ওরিয়ন নিট টেক্সটাইলকে ঋণ মঞ্জুর করেছে ইসলামী ব্যাংক। এ ঋণের পরিমান প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা। অথচ দুর্নীতির মামলা বিচারাধীন ও বিদেশ গমনে দুই দফা নিষেধাজ্ঞা থাকা অবস্থায় দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ফাঁকি দিয়েই দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিম। এছাড়া ঋণ মঞ্জুর হওয়া প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৪ মাস যাবত বন্ধ। মালিকবিহীন অবস্থায় কিভাবে এই ঋণ মঞ্জুর হলো তার সদুত্তর দিতে পারেনি ঋণ প্রদানকারী ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, ওরিয়ন গ্রুপের টাকা পাচারের অন্যতম গেটওয়ে হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ওরিয়ন নিট টেক্সটাইল। প্রতিষ্ঠানটি বৈদেশিক বানিজ্যের সুবিধার অপব্যবহার করে বিগত বছরগুলিতে ইসলামী ব্যাংক এর মাধ্যমে ব্যাংক থেকে শত শত কোটি টাকা পাচার করে আসছে। ওরিয়ন নিট টেক্সটাইল শুধুমাত্র ইসলামী ব্যাংক ফার্মগেট শাখা থেকে আগষ্ট ২০২৪ পর্যন্ত টাকা বের করে নিয়েছে প্রায় ২৩০ কোটি ১৫ লক্ষ টাকা। ডিসেম্বর ২০২৫ ভিত্তিক ওরিয়ন টেক্সটাইলের ঋনস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে প্রতিষ্ঠানটির এইচপিএসএম (ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড) ঋন স্থিতি ৮৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল (ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড) ঋন স্থিতি ১০৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, স্পেশাল (ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড) ঋণ স্থিতি ৪০ কোটি ২ লাখ হিসেবে মোট ঋন স্থিতি ২৩০ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এছাড়াও ফোর্স ইনভেস্টমেন্ট বাবদ ওভারডিউ ৩০ লাখ টাকা। এসব ঋন স্থিতির মেয়াদ মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এইচপিএসএম ৩০ অক্টোবল ২০২৩, ওয়ার্কি ক্যাপিটাল ১৮ নভেম্বর ২০২৫, স্পেশাল ২৪ অক্টোবর ২০২৪ ও ৩ ডিসেম্বর ২০২৫। এইচপিএসএম লিমিট ২০২৩ সালের অক্টোবর ও স্পেশাল ঋনের লিমিট ২০২৪ সালের অক্টোবরে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় নিয়মানুযায়ী প্রতিষ্ঠানটিন ঋনসমুহ মন্দ ও কুঋণে পরিনত হয়েছে।
বিগত হাসিনা সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠানটিকে ইসলামী ব্যাংক শত শত ভূয়া কন্ট্রাক এর বিপরীতে বৈদেশিক বাণিজ্যের অযুহাতে হাজার হাজার ব্যাক টু ব্যাক এলসি খুলে লুটপাটের সুযোগ তৈরী করে দেয়। ওইসব ব্যাক টু ব্যাক এলসি হাতে পেয়ে বিভিন্ন সাপ্লাইয়ার্স প্রতিতিষ্ঠান ওরিয়নকে সুতা সহ রপ্তানি প্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত বিভিন্ন কাঁচামাল সরবরাহ করে। ওরিয়ন এসব কাঁচামাল খোলা মার্কেটে বিক্রী করে হাতিয়ে নেয় শত শত কোটি টাকা। অন্যদিকে পন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক এর বিআরপিডি সার্কুলার নম্বর ১০ ও ১৩ এর কোনরুপ তোয়াক্কা না করে সরেজমিনে পন্য যাচাই ছাড়াই ওরিয়ন টেক্সটাইলের সাথে যোগসাজোস করে একসেপটেন্স প্রদান করেছিল। পরবর্তিতে একসেপটেন্স দেওয়া ব্যাক টু ব্যাক এলসির বিপরীতে রপ্তানী না থাকায় ইসলামী ব্যাংক ফোর্স লোন সৃষ্টি করে পেমেন্ট করতে বাধ্য হয়। এভাবেই বৈদেশিক বানিজ্যের সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার করে ওরিয়ন নিট টেক্সটাইল ইসলামী ব্যাংকের সাথে যোগসাজসের মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় শত শত কোটি টাকা।
সর্বশেষ ৫ আগষ্ট এর পূর্বে ইসলামী ব্যাংক ওরিয়ন টেক্সটাইলকে ভূয়া কন্ট্রাক্ট এর বিপরীতে ৫০-৬০ লাখ ডলার সমমূল্যের ব্যাক টু ব্যাক এলসি খুলে দিয়ে পন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সুতাসহ এক্সেসরিজ সংগ্রহের সুযোগ তৈরী করে দেয়। ওরিয়ন টেক্সটাইন ওইসব পন্য হাতে পেয়ে খোলা মার্কেটে বিক্রী করে দেয় এবং ব্যাংকের সাথে যোগসাজস করে ২৬ লাখ ডলারের একসেপটেন্স প্রদান করে বলে জানা গেছে। ৫ আগষ্টের পর ফ্যাসিস হাসিনার অন্যতম সহযোগী ওরিয়ন গ্রুপের এমডি ওবায়দুল করিম পালিয়ে গেলে ওরিয়ন টেক্সটাইল বন্ধ হয়ে যায়। যেহেতু ওইসব একসেপটেড ও নন-একসেপটেড বিলের বিলের বিপরীতে ওরিয়নের কোন রপ্তানি না থাকায় এবং ওরিয়ন এর ফ্যাক্টরিতে কোন মালামাল না থাকার কারনে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ৫ আগষ্টের পর থেকে ব্যাংক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে ধর্না দিয়ে তাদের পন্যের মূল্য আদায়ে কোন কুল-কিনারা করতে পারেনি। দীর্ঘদিন পর পলাতক অবস্থানে থেকে ওবায়দুল পুনরায় ইসলামী ব্যাংকের সাথে যোগসাজস করে অর্ধশত কোটি টাকার ঋন মঞ্জুর করে ওইসব সাপ্লাইয়ার্স প্রতিষ্ঠান গুলোর টাকা পরিশোধের উদ্যোগ গ্রহন করেছে। টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে ইসলামী ব্যাংক প্রায় ১.৫% টাকা কমিশন হিসেবে কাটার কথা উল্লেখ করে একসেপ্টেন্স প্রাপ্ত সাপ্লায়ারদের ব্যাংকে চিঠি পাঠিয়েছে। যা দেয়ার কথা ওরিয়ন টেক্সটাইলের। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ এবং তাদের একাউন্টে কোন টাকা নেই সেজন্য এই কমিশন সাপ্লায়রদের কাছ থেকেই কর্তন করা হচ্ছে যা সম্পুর্ণ অবৈধ। সেক্ষেত্রে কেউ রাজি না হলে তার পেমেন্ট দেয়া হবে না বলেও জানায় ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে ভূক্তভোগী সাপ্লাইয়ার্সরা একপ্রকার ব্লাকমেইলিং এর শিকার হয়ে বাধ্য হয়ে ইসলামী ব্যাংককে ডিসকাউন্ট দিয়ে পেমেন্ট গ্রহন করছে।
এ ব্যাপারে ইসলামী ব্যাংক ফার্মগেট শাখার ম্যানেজার ফারুক আল মামুনের কাছে জানতে চাইলে তিনি ঋন মঞ্জুর ও টাকা ছাড়ের বিষয়টি প্রথমে অস্বীকার করেন। পরে প্রমান থাকার কথা জানালে তিনি বলেন আমরা কিছু ক্যাশ পেমেন্ট করেছি। তবে যা-ই করেছি ব্যাংকিং নিয়ম মেনেই করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
