স্বর্ণ চুরি মামলায় অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে অনিয়মতান্ত্রিক পদোন্নতি নিয়ে এনবিআর এ তোলপাড়

কাস্টমস গোডাউনে স্বর্ণ চুরি মামলায় অভিযুক্ত বর্তমানে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের যুগ্নু পরিচালক ছালাউদ্দিন রিপনকে আবারো অনিয়মতান্ত্রিকভাবে অতিরিক্ত কমিশনার পদে পদোন্নতির অপতৎপরতাকে কেন্দ্র করে চলছে এনবিআরে কর্মরতদের মধ্যে চরম অসন্তোস। শুধুমাত্র এনবিআর চেয়ারম্যান’র দেশি লোক অর্থাৎ বৃহত্তর নোয়াখালীর বাসিন্দা হবার সুবাদে আদালতে দুর্নীতি মামলা বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও মাত্র ১ বছরের মধ্যে তাকে সহকারি কমিশনার থেকে অতিরিক্ত কমিশনার পদে পদোন্নতি দিয়ে ভারপ্রাপ্ত কমিশনারের দায়িত্ব দেয়ার পাঁয়তারা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিতর্কিত কাস্টমস কর্মকর্তা ছালাউদ্দিন রিপন এর বিরুদ্ধে সহকারি কমিশনার থাকাকালিন ঢাকা আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দরে স্বর্ণ চুরির অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় তাকে ২০১২ সালে চাকুরি থেকে অপসারণ করা হয়। এই বিষয়ে দুদক থেকেও মামলা করা হয় ২০১০ সালে এবং থানায় এজাহার দায়ের করা হয় ২০১০ সালে, যা এখনও চলমান। এর মধ্যে ছালাউদ্দিন রিপন অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ আপিল ট্রাইবুনাল এর আদেশে চাকুরি ফিরে পান এবং সহকারি কমিশনার হিসাবে পুনরায় যোগদান করেন। ট্রাইবুনালের আদেশে বলা হয় তার যোগদান হবে as per admissible by law তথাপি যথাযথ ফিডার পদ পূর্ণ না করা সত্বেও সচিব মো: আব্দুর রহমান খান নিজ এলাকার কর্মকর্তাকে ভুতাপেক্ষ জ্যেষ্ঠ্যতা দিয়ে পদোন্নতি প্রদান করেন, যা নিয়মের ব্যত্যয়। কিন্তু একইসাথে তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা চলমান থাকায় তিনি পদোন্নতি বিধিমালা অনুযায়ী পদোন্নতির যোগ্য নন। দুদক হতে তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা নং cr appeal ১২৩৭৬/২০১৬, তারিখ ১৫/১২/২০১৬ বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগে চলমান আছে। দুদক থেকে সংশ্লিষ্ট মামলার বিষয়টি উল্লেখ করে পত্রও দেয়া হয়েছে। তুঘলিক কান্ড হলো দুদক ১৭/১১/২০২৫ তারিখের দুদকের পত্রে মামলা বিচারাধীন বলা হলেও ২৫/১১/২০২৫ পত্রে দুদক আপীল করে নাই উল্লেখ করা হয়। তবে দুইটি পত্রেই দুদকের মামলা হাইকোর্ট বিভাগে চলমান উল্লেখ আছে, সেহুতু প্রমোশন পাবার যোগ্য না।
পদোন্নতি বিধিমালা অনুযায়ী দুদক এর এরূপ মামলা চলমান থাকাবস্থায় পদোন্নতির কোন বিধান নাই। কিন্তু NBR এর বর্তমান চেয়ারম্যান ড. মো: আব্দুর রহমান খান ঘটিয়েছেন এক তুঘলকি কান্ড।
শুধমাত্র তার সিন্ডিকেট ভুক্ত কর্মকর্তা হওয়ার কারণে ছালাউদ্দিন রিপনকে গত ৩০/০৯/২৪ তারিখে উপকমিশনার পদে পদোন্নতি আবার ৮/১০/২৪ তারিখে উপকমিশনার পদে জ্যেষ্ঠ্যতা, ১৮/১১/২৪ তারিখে যুগ্ম কমিশনার পদে পদোন্নতি, ২৮/১১/২৪ তারিখে যুগ্ম কমিশনার পদে জ্যেষ্ঠ্যতা দেয়া হয়। অথচ যে সকল কর্মকর্তা বিগত সরকার আমলে রাজনৈতিক কারনে পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন তাদেরকেই শুধুমাত্র ভুতাপেক্ষ জেষ্ঠ্যতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু ছালাউদ্দিন রিপন দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে চাকুরীচ্যুত হন। তিনি তো ভুতাপেক্ষা জেষ্ঠতা পাবার যোগ্য নন বলে ক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের অভিযোগ। তাকে আবারও অতিরিক্ত কমিশনার পদে পদোন্নতি দিয়ে এবং কমিশনার (চলতি দায়িত্বে) হিসাবে নিয়োগের পায়তারা চলছে।
এনবিআরের একজন সাবেক সদস্য আক্ষেপ করে বলেন কাস্টমস গোডাউন থেকে স্বর্ণ চুরির প্রথম নথিভুক্ত ঘটনা ঘটে ২০১০ সালে। এ ঘটনায় ২৪তম ব্যাচের কাস্টমস ক্যাডার কর্মকর্তা ছালাউদ্দিন রিপন অভিযুক্ত হন। বিভাগীয় তদন্তে দোষী প্রমাণিত হওয়ায় তিনি ২০১৩ সালে চাকরি থেকে অপসারিত হন। পরে দুদকের অনুসন্ধানেও তাঁর বিরুদ্ধে স্বর্ণ আত্মসাত ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়, যার ভিত্তিতে মামলা নং–১৪ (০৪/০৫/২০১০) রুজু এবং চার্জশীট নং ৮৩৩ (২৮/১০/২০১০) আদালতে দাখিল করা হয়।
পরবর্তীতে প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনাল procedural mistake উল্লেখ করে ২০১৮ সালে বিভাগীয় মামলায় তাঁকে অব্যাহতি দেয় এবং ২০১৬ সালে আদালত সাক্ষ্যসংক্রান্ত ঘাটতির কারণে দুদকের মামলায় খালাস প্রদান করে। তবে মামলার অপর এক আসামির করা ক্রিমিনাল আপিল নং ১২৩৭৬/২০১৬ এখনো বিচারাধীন রয়েছে—যা সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার দপ্তর ১৮/১১/২০২৫ তারিখে নিশ্চিত করেছে।
এ অবস্থায়, পদোন্নতি সম্পর্কিত আইআরডির পত্রের প্রেক্ষিতে দুদক ১৭/১১/২০২৫ তারিখে মামলাটি বিচারাধীন বলে দুদক স্পষ্ট উল্লেখ করলেও, মাত্র আট দিনের ব্যবধানে ২৫/১১/২০২৫ তারিখে ভিন্ন ভাষায় নতুন সংশোধিত পত্র ইস্যু করে। এই পরিবর্তন উদ্দেশ্যমূলক কিনা তা তদন্তযোগ্য। তবে, দ্বিতীয় পত্রেও দুদক স্পটত: মামলা বিচারাধীন মর্মে স্বীকার করে নেয়, কেননা সংশোধীত পত্রের ছকের ঠিক পূর্বের লাইনে ছালাউদ্দিন রিপন ব্যাতিত কর্মকর্তাদের বিপরীতে দুদক মামলা তদন্তাধীন বা বিচারাধীন নেই উল্লেখ আছে।
প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী, দুদক মামলা বিচারাধীন থাকলে কোনো কর্মকর্তা পদোন্নতির যোগ্য নন। এই একই কারণে ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তা সাজেদুল ইসলাম পদোন্নতি পাননি। তবুও ২০২৪ সালে পরপর দুই মাসে একটি নির্দিষ্ট এলাকার একই কর্মকর্তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা প্রদান গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। আসন্ন ডিপিসি বোর্ডে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ বিভাগের প্রতিনিধিদের এ বিষয়ে সম্যক সতর্কতা ও ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করেছেন এনবিআর এর ঐ অবসর প্রাপ্ত সদস্য।
তার মতে, স্বর্ণ চুরি মামলার প্রকৃত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করাই হবে প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য। নিয়মবহির্ভূত পদোন্নতি নয়। ২০১০ সালের স্বর্ণ চুরির মামলার আসামী খালাশ পাওয়ায় ২০১৯ সালে ১৯ কেজি এবং ২০২৩ সালে ৫৫ কেজি স্বর্ণ নিখোঁজ/চুরি যাওয়ার ঘটনা সংগঠিত হয়েছে। এ ধরনের পদোন্নতি ভবিষ্যতে আরো বড় অপরাধ সংগঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। এই ২০২৪, ২০২৫ এর পদোন্নতি প্রদানে ভূমিকা পালনকারী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
