কেরানী থেকে শত কোটি টাকার মালিক

দুদকের ‘দায়মুক্তিতে’ বহাল তবিয়তে দুর্নীতিবাজ কাস্টমস কর্মকর্তা আলতাফ

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: জুন ৯, ২০২৬ ১৬:৪৪:২২

কেরানী হিসেবে চাকরিতে যোগ দিয়ে অবসরে যাওয়ার আগে হয়েছেন সহকারী কাস্টমস কমিশনার। আর এই দীর্ঘ চাকরি জীবনে বেপরোয়া ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে রাজধানীতেই গড়ে তুলেছেন অর্ধশত কোটি টাকাসহ দেশজুড়ে শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়। তিনি হলেন বাংলাদেশ কর কমিশন কার্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী কাস্টমস কমিশনার মো. আলতাফ হোসেন মিয়া।

২০০৯ সালে অবসরে যাওয়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ২০২৩ সালেও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য লিখিত আবেদন করা হয়েছে। এমনকি উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না দুদক। উল্টো অভিযোগ আমলে না নিয়ে তাকে একপ্রকার ‘দায়মুক্তি’ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি ২০২৩ সালে করা সর্বশেষ আবেদনটিও দুদক কার্যালয় থেকে গায়েব করে ফেলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতিবাজ এই কর্মকর্তার সঙ্গে দুদকের একাংশের যোগসাজশ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

রাজধানীতে ৬ বহুতল ভবন ও ৩ দোকান অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে রাজধানীর কদমতলী থানাধীন নূরপুর দক্ষিণ দনিয়ার (ওয়ার্ড নং-৬০) ৮২৬ নম্বর বাসায় বসবাস করছেন আলতাফ হোসেন। এই এলাকায় এবং এর আশেপাশে তার নামে অন্তত ৬টি বহুতল বাড়ির সন্ধান পাওয়া গেছে। দাগ ও প্লট নম্বরসহ তার দৃশ্যমান সম্পদগুলো হলো: নূরপুর ১ নম্বর রোডস্থ প্লট নং- ৮২৬, দক্ষিণ দনিয়া, ঢাকা। দক্ষিণ দনিয়ার নূরপুরে প্লট নং- ১৩৩৮/৪, ঢাকা। পলাশপুর ১ নম্বর রোডের প্লট নং- ৩৪/১৪, কদমতলী, ঢাকা। পলাশপুরের ৫ নম্বর রোডের প্লট নং- ৩/৮ (বা ৩৮), কদমতলী, ঢাকা। পলাশপুর জিয়া সরণি রোডের প্লট নং- ২১, কদমতলী, ঢাকা। পলাশপুর ১ নম্বর রোডের প্লট নং- ৩৪/১৫, কদমতলী, ঢাকা। এছাড়াও রাজধানীর তোপখানা রোডস্থ বিএমএ ভবনের মেডিকেল সামগ্রী মার্কেটে এই কর্মকর্তার নামে ৩টি দোকান রয়েছে।

স্ত্রী-সন্তান ও ভাইয়ের নামে বেনামে সম্পদের পাহাড় শুধু ঢাকাতেই নয়, আলতাফ হোসেনের নিজ জেলা শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মান্ডা গ্রামে স্ত্রী, তিন পুত্র—মোঃ রাশেদুল ইসলাম (রাশেদ), মোঃ মাহমুদুল হাসান (শাহেদ), মোঃ মেহেদী হাসান (মেহেদী), একমাত্র কন্যা তাহমিনা খাতুন (আখি), মেয়ের জামাই এবং ছোট ভাই হাজী আলাউদ্দিন ঢালীর নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ দোকানপাট, প্লট ও শতাধিক বিঘা কৃষি জমি ক্রয় করেছেন। সরকারি প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দিষ্ট স্কেলে বেতন পাওয়ার নিয়ম থাকলেও, আলতাফ হোসেন রাষ্ট্রীয় অর্থ নিজের মনে করে লুটপাট করেছেন।

এলাকায় পরিচিত ‘ঘুষখোর আলতাফ’ নামে, মসজিদ কমিটি থেকে বহিষ্কার দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত এই বিপুল সম্পদের কারণে স্থানীয় চা দোকানদার থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষের কাছে তিনি ‘ঘুষখোর আলতাফ’ নামে পরিচিতি পেয়েছেন। তার এই কলঙ্কিত অধ্যায়ের কারণে স্থানীয় সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও তাকে বয়কট করেছে। জানা গেছে, তীব্র সমালোচনার মুখে তাকে স্থানীয় এলাকার মসজিদ কমিটি থেকেও বের করে দেওয়া হয়েছে।

যেখানেই পোস্টিং, সেখানেই দুর্নীতির সিন্ডিকেট তার চাকরি জীবনের পোস্টিংয়ের তালিকা দেখলে বোঝা যায় দুর্নীতির পরিধি কতটা বিস্তৃত ছিল। এনবিআর প্রধান কার্যালয়, ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম পোর্ট, বেনাপোল বন্দর এবং বংশাল কর কমিশন কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও লোভনীয় স্থানে কর্মরত ছিলেন তিনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত ১০-১২ বছরেই এই কর্মকর্তারা অবৈধ পথে উপার্জনের মাধ্যমে কোটিপতি বনে গেছেন। নিজেকে কলুষমুক্ত রাখতে অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে এই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।

বক্তব্য দিতে অপারগ অভিযুক্ত কর্মকর্তা এসব অঢেল ধন-সম্পদ ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে সাবেক কাস্টমস সহকারী কমিশনার মোঃ আলতাফ হোসেন মিয়ার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজেকে অসুস্থ দাবি করেন। এই সংক্রান্ত কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে বা কোনো মন্তব্য করতে তিনি সম্পূর্ণ অপারগতা প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে তাকে আবারও ফোন করা হলে আর পাওয়া যায়নি। ক্ষুব্ধ বিশেষজ্ঞরা, নিষ্ক্রিয় দুদক উচ্চ আদালতের নির্দেশ ও সুনির্দিষ্ট দাগ নম্বরসহ ২০২৩ সালের জুনে জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশের পরও দুদকের এই উদাসীনতা ও আবেদন গায়েবের ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

দুদকের সাবেক এক কর্মকর্তা এই বিষয়ে বলেন, যেকোনো কর্মকর্তা পারিবারিকভাবে সম্পদের মালিক থাকতেই পারেন বা বৈধভাবে সম্পদ অর্জন করতে পারেন, সেটি অপরাধ নয়। তবে যারা পারিবারিকভাবে সম্পদশালী নন এবং সরকারি চাকরিতে থেকে দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন, সেটি অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দুদকে অসংখ্য অভিযোগ আসে এবং একটি নির্দিষ্ট কমিটি তা পর্যালোচনা করে দেখে। তবে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও যদি তদন্ত না হয় বা ব্যবস্থা গ্রহণে উদাসীনতা দেখানো হয়, তবে তা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল অবিলম্বে এই শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দুদকের বর্তমান চেয়ারম্যানের সুদৃষ্টি ও জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।