ডিসি জাহিদের নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসায় ব্যবসায়ী, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্লা বাহিনী

উৎসব এলেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ে—বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের এই বাস্তবতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ‘উৎসবে কমবে দাম, বাড়বে আনন্দ’ স্লোগানে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার নেতৃত্বে বাস্তবায়িত ‘Festive Sale’ কর্মসূচি শুধু বাজারে স্বস্তিই ফেরায়নি, ব্যবসায়ী, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গণমাধ্যমের সমন্বিত অংশগ্রহণে একটি নতুন সামাজিক ও ব্যবসায়িক সংস্কৃতিরও সূচনা করেছে।
এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়নের পর শনিবার (২৭ জুন) চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আয়োজিত সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান পরিণত হয় জেলা প্রশাসকের নেতৃত্ব, ব্যবসায়ীদের সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত কাজের এক স্বীকৃতির মঞ্চে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তারা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রশংসা করেন এবং তাঁর হাত ধরে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন। সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
জেলা প্রশাসকের প্রশংসায় বক্তারা: অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, বাংলাদেশে সম্ভবত এই প্রথম ব্যবসায়ীদের পণ্যের দাম কমানোর জন্য সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি একটি নতুন সংস্কৃতির সূচনা। ভবিষ্যতে এই ধারা অব্যাহত থাকলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা এই উদ্যোগের পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’
র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, প্রতিটি ভালো কাজেই অনেক মানুষ অংশ নেন, কিন্তু উদ্যোগটি কাউকে না কাউকে নিতে হয়। জেলা প্রশাসক সেই উদ্যোগ নিয়েছেন বলেই সবাই একসঙ্গে এই সফলতা উদযাপন করতে পারছেন। তিনি বলেন, এই উদ্যোগ শুধু চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা দেশের জেলা ও উপজেলায় ছড়িয়ে দেওয়া উচিত।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার আমিরুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে প্রশাসন ও ব্যবসায়ীরা জনকল্যাণমূলক একটি প্ল্যাটফর্মে একসঙ্গে কাজ করেছেন। এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত।
রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ের পুলিশ সুপার চাউলাউ মারমা বলেন, বাজারকে শুধু আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ব্যবসায়ীরা যদি দায়িত্ববোধ থেকে মানুষের পাশে দাঁড়ান, তাহলেই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে। জেলা প্রশাসকের উদ্যোগ সেই পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করেছে।
ডিজিএফআইয়ের উপ-পরিচালক
নরুল হক বলেন, খাতুনগঞ্জে আদার সংকট নিরসনে জেলা প্রশাসকের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রমাণ করেছে—রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধ থাকলে সংকট দ্রুত সমাধান করা সম্ভব।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার ইমরান হোসেন বলেন, জেলা প্রশাসকের অনুরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ফলেই ৪১টি কনটেইনারের আদা বাজারে আসে এবং বাজারে স্বস্তি ফিরে আসে। ভবিষ্যতেও জনগণের স্বার্থে কাস্টমস একইভাবে কাজ করবে।
কোস্ট গার্ড পূর্ব জোনের কমান্ডার আবু নেছার সালেহ আহমেদ বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সমুদ্রে কোস্ট গার্ড নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করেছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের জনস্বার্থমূলক উদ্যোগে তাঁরা জেলা প্রশাসনের পাশে থাকবেন।
আনসার ও ভিডিপির প্রতিনিধি ইসমাইল হোসেন বলেন, মানবিক জেলা প্রশাসক হিসেবে জাহিদুল ইসলাম মিঞা আগেই পরিচিত ছিলেন। এবার তিনি উৎসবকেন্দ্রিক মূল্যছাড়ের মাধ্যমে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। শুধু ঈদ নয়, সব জাতীয় উৎসবেই এই উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আবু হায়দার বলেন, বাংলাদেশে এই প্রথম বাজারদর নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার জন্য ব্যবসায়ীদের সম্মাননা দেওয়া হলো। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র ব্যবসায়ীদের ভালো কাজের স্বীকৃতি দিয়েছে।
চট্টগ্রামের একটি সুপারমার্কেটের কর্মকর্তা আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, তাঁরা কোরবানিসংশ্লিষ্ট ৮৭টি পণ্যের মূল্য কমিয়েছেন। খুলশি মার্টের মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান ৮৩টি পণ্যে ৫ থেকে ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যছাড় দিয়েছে। সাধারণ মানুষের ইতিবাচক সাড়া তাঁদের ভবিষ্যতেও এমন উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত করবে।
অনুষ্ঠানের শেষে ‘Festive Sale’ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নে বিশেষ অবদান রাখায় ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিভিন্ন সংস্থা ও গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বক্তাদের অভিন্ন মত ছিল, চট্টগ্রামে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ শুধু একটি সফল কর্মসূচি নয়; এটি একটি নতুন সামাজিক দর্শন। মূল্যবোধ, আন্তরিকতা ও জনকল্যাণকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতি একদিন সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়বে।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘ক্ষমতা কিংবা শক্তি প্রয়োগ করে কোনো ব্যবস্থা দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা যায় না। একটি সংস্কৃতি তখনই যুগ যুগ ধরে টিকে থাকে, যখন মানুষ সেটিকে মূল্যবোধ দিয়ে ধারণ করে।’
তিনি বলেন, এবারের ‘Festive Sale’ কর্মসূচি শুধু পণ্যের মূল্য কমানোর উদ্যোগ নয়; এটি ব্যবসায়িক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনকল্যাণের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার একটি প্রয়াস।
জেলা প্রশাসক বলেন, চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ব্যবসা ও অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের জিডিপিতে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই চট্টগ্রাম যদি ইতিবাচক ব্যবসায়িক সংস্কৃতির নেতৃত্ব দেয়, তার প্রভাব সারা দেশেই পড়বে।
তিনি আরও বলেন, ‘এই সফল কর্মসূচির মাধ্যমে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা আবারও প্রমাণ করেছেন, তাঁরা কোনো সিন্ডিকেট সংস্কৃতির প্রতিনিধি নন। তাঁরা মূল্যবোধকে ধারণ করেন, জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেন এবং ব্যবসাকে একটি পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে দেখেন।’
জেলা প্রশাসক বলেন, কোনো ব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে সেটি ক্ষমতা দিয়ে নয়, মূল্যবোধ, আন্তরিকতা ও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হয়। তাই চট্টগ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগকে তিনি একটি স্থায়ী সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত করতে চান।
তিনি জানান, নারায়ণগঞ্জে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রথম তাঁর মাথায় উৎসবকেন্দ্রিক মূল্যছাড়ের ধারণাটি আসে। তবে সেখানে তা বাস্তবায়নের সুযোগ হয়নি। পরে চট্টগ্রামে যোগ দিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকের মাধ্যমে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সেই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসক বলেন, উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উৎসব মানেই মূল্যছাড়। অথচ বাংলাদেশে উৎসব এলেই বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। সেই বাস্তবতা বদলাতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঈদের আগে বাজার পরিদর্শনের সময় আদার বাজারে সংকট দেখা দিলে জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। আটকে থাকা কনটেইনারের আদা দ্রুত বাজারে আসায় শুধু চট্টগ্রাম নয়, সারা দেশের বাজারেই আদার দাম কমে আসে। জেলা প্রশাসক এ ঘটনাকে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের সফল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, আজকের সম্মাননা কোনো পুরস্কার নয়; এটি কৃতজ্ঞতার প্রতীক। এর মধ্যে রয়েছে আন্তরিকতা, শ্রদ্ধা ও ভালো কাজের স্বীকৃতি।
