বদলি বৈষম্যে বন বিভাগের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ
টাকার জোর ও তদবিরে একের পর এক ‘প্রাইজ পোস্টিং অভিজিতের

বন বিভাগে যাদের কোনো তদবিরকারী ‘মামা-খালু’ কিংবা কোটি টাকার জোর নেই, সৎভাবে দায়িত্ব পালন করেও বছরের পর বছর অবহেলিত ও দুর্গম এলাকায় পড়ে থাকাই যেন তাদের একমাত্র নিয়তি; অথচ এর সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে ডেপুটি রেঞ্জার অভিজিত বড়ুয়ার ক্ষেত্রে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে একের পর এক লোভনীয় ও আকর্ষণীয় ‘প্রাইজ পোস্টিং’ বাগিয়ে নেওয়া এই কর্মকর্তার খুঁটির জোর কোথায়—তা নিয়ে দফতরটির সাধারণ ও অসহায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, অভিজিত বড়ুয়া চট্টগ্রাম অঞ্চলের লোভনীয় কর্মস্থলগুলোতে বহাল তবিয়তে থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে ম্যানেজ এবং ক্ষমতার নগ্ন অপব্যবহার করে অবৈধভাবে কয়েক কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।
এর সূচনা হয়েছিল চট্টগ্রাম অঞ্চলের তৎকালীন বন সংরক্ষক বিপুল কৃষ্ণ দাসের আমলে, যখন অভিজিতকে পাল্পউড প্লান্টেশন ডিভিশনে পোস্টিং দেওয়া হয়; পরবর্তীতে তিনি ডিএফও-কে নানামুখী চাপ প্রয়োগ ও মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে ফরেস্টার পদে থাকা অবস্থাতেই একাধারে সদর ও চেমী রেঞ্জের দায়িত্ব কব্জা করে নেন। বান্দরবান পাল্পউড প্লান্টেশন বিভাগের সদর ও চেমী রেঞ্জে দুই বছরেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালনকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ভুয়া ‘এ’ ফরম বের করে গাছপালাহীন শূন্য বাগান এলাকায় স্থানীয় পাহাড়িদের নামে সাজানো জোত পারমিট দেখিয়ে ভুয়া ‘ডি’ ফরম এবং পরবর্তীতে মনগড়া চলাচল পাশ (টিপি) ইস্যুর এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি।
সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মূল্যবান কাঠ নির্বিচারে কেটে ঢাকায় পাচারের নিরাপদ পথ করে দেওয়ার বিনিময়ে কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায় করা হতো বস্তাভর্তি টাকা, আর সেই অবৈধ উপার্জনের ভাগ ঘনফুট হিসাবে নিয়মিত ঊর্ধ্বতন মহলে পাঠিয়ে তাদের তুষ্ট রাখতেন তিনি। এভাবে প্রায় শতাধিক অবৈধ ‘টেবিল জোত পারমিট’ দিয়ে তিনি নিজে যেমন কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, তেমনি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছেন সরকারি ও সংরক্ষিত বিশাল বনাঞ্চল। প্রাতিষ্ঠানিক সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী বান্দরবান ও পাল্পউড প্লান্টেশন ডিভিশনে দায়িত্ব পালনের পর কক্সবাজার উত্তর/দক্ষিণ বন বিভাগ কিংবা উপকূলীয় বন বিভাগে বদলি হওয়ার কথা থাকলেও, ঊর্ধ্বতন মহলের সুনজরে থাকায় সাবেক বন সংরক্ষক তার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে নিয়ম ভেঙে তাকে পদায়ন করেন চট্টগ্রামের অন্যতম আকর্ষণীয় কর্মস্থল ‘বন ব্যবহারিক’ রেঞ্জে, বন ব্যবহারিক বন বিভাগ, চট্টগ্রাম।
সেখানেও একটানা দুই বছরের বেশি সময় এই লোভনীয় প্রাইজ পোস্টিং ভোগ করার পর এবারও তার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি; বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো গত ২৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে অফিস আদেশের মাধ্যমে তাকে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে পদায়ন করেছেন, যা বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে সবসময়ই এক বিশেষ মোহনীয় ও লোভনীয় পোস্টিং হিসেবে পরিচিত। তদবির ও টাকার জোরে অভিজিত বড়ুয়ার এই অবিরাম রাজকীয় পোস্টিং সুবিধা পাওয়ার বিপরীতে কোনো প্রভাবশালী খুঁটির জোর না থাকা সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাগ্যবঞ্চিত হওয়ার এই চরম বৈষম্যে পুরো বিভাগে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে, যার সত্যতা স্বীকার করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অসহায় কর্মকর্তা আক্ষেপ করে জানিয়েছেন যে অভিজিত বড়ুয়ারা সবসময়ই এমন ভালো ভালো পোস্টিং ভোগ করবেন আর বহাল তবিয়তে থাকবেন—কারণ তাদের রয়েছে টাকার ক্ষমতা এবং ঊর্ধ্বতন অফিসারদের বিশেষ ভালোবাসা, যা সাধারণ ও সৎ কর্মচারীদের কপালে কখনোই জোটে না।
