নতুন আইএমএফ কর্মসূচির পথে বাংলাদেশ, সামনে বড় অর্থনৈতিক সংস্কারের চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ, দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের সংকট এবং সীমিত আর্থিক সক্ষমতার মধ্যে বাংলাদেশের সামনে এখন নতুন করে অর্থনৈতিক সংস্কারের বড় চ্যালেঞ্জ। এসব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে নতুন একটি অর্থনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ। আইএমএফ বলছে, নতুন কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করতে কাঠামোগত সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
গত জুলাইয়ে আইএমএফ-এর একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় পাঁচ দিনের সফর করে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও সরকারের সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছে। ১২ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ওই সফরের পর আইএমএফ জানায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে রাজস্ব, আর্থিক খাত ও মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব সমস্যার সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবও যুক্ত হয়েছে।
আইএমএফ -এর বাংলাদেশ মিশনপ্রধান আইভো ক্রজনার সফর শেষে জানান, নতুন একটি আইএমএফ- সাপোর্টেড প্রোগ্রাম-এর সম্ভাব্য কাঠামো, অর্থের পরিমাণ এবং এর সঙ্গে যুক্ত সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আগামী মাসগুলোতে আলোচনা হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নতুন অর্থায়ন কর্মসূচির জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আগ্রহ প্রকাশ করেছে এবং আইএমএফ-এর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে যাচ্ছে।
এর আগে গত ৩ জুন বাংলাদেশ সরকার নতুন একটি আইএমএফ-সাপোর্টেড প্রোগ্রাম-এর জন্য অনুরোধ জানায়। আইএমএফ তখন জানায়, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদিত বর্তমান ইসিএফ, ইএফএফ ও আরএসএফ কর্মসূচির সময় থেকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং রাজস্ব আহরণের নিম্ন হার নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফ-এর সাম্প্রতিক পূর্বাভাসও উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। জুলাইয়ের সফর শেষে আইএমএফ জানিয়েছে, ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। কার্যকর সংস্কার না হলে মধ্যমেয়াদে প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচেও নেমে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
এর আগে জানুয়ারিতে প্রকাশিত আইএমএফ-এর ২০২৫ আর্টিকেল ফোর কন্সালটেশন-এ বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের অর্থনীতি সাম্প্রতিক সময়ে মন্থর হয়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে, যেখানে ২০২৪ অর্থবছরে তা ছিল ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৩ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। আইএমএফ তখন ধারণা করেছিল, সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশে ফিরতে পারে।
তবে প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ঝুঁকিও রয়েছে। আইএমএফ-এর মতে, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আহরণের ঘাটতি এবং বৈদেশিক খাতের চাপ একসঙ্গে কাজ করলে অর্থনীতিতে আরও চাপ তৈরি হতে পারে। সংস্কার বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে আছে মূল্যস্ফীতি। আইএমএফ-এর জানুয়ারির আর্টিকেল ফোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৯ শতাংশের মতো থাকতে পারে। পরে জুলাইয়ের মূল্যায়নে আইএমএফ আবারও মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হওয়ার কথা জানায়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক পণ্যের দাম এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
বিশেষ করে জ্বালানি ও অন্যান্য আমদানি পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির কারণে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বেশি আমদানি ব্যয় বৈদেশিক লেনদেনের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। আইএমএফ মনে করে, এমন পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি এবং সতর্ক রাজস্বনীতি বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত দুর্বলতা হলো কম রাজস্ব আহরণ। আইএমএফ-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোর একটি হিসেবে উঠে এসেছে।
আইএমএফ মনে করে, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে রাজস্ব ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ, ন্যায্য ও কার্যকর করার পাশাপাশি করের আওতা বাড়ানো এবং রাজস্ব প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
রাজস্ব আহরণ বাড়াতে না পারলে সরকারের উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সরকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
আইএমএফ-এর মতে, রাজস্ব সংস্কারের মাধ্যমে যে অতিরিক্ত আর্থিক সক্ষমতা তৈরি হবে তা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক উন্নয়ন খাতে ব্যয় করা যেতে পারে। তবে রাজস্ব সংস্কারের ফলে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর যেন অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সে জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করার পরামর্শও দিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশের নতুন আইএমএফ কর্মসূচির আলোচনায় ব্যাংকিং খাত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে। আইএমএফ-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং আর্থিক খাতের চাপকে অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সংস্থাটি মনে করে, ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য ও সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন। দুর্বল ব্যাংকগুলোতে সুশৃঙ্খলভাবে সংস্কার, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
জানুয়ারির আর্টিকেল ফোর প্রতিবেদনেও আইএমএফ ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়।
বৈদেশিক মুদ্রাবাজারও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। আইএমএফ জানিয়েছে, ২০২৫ সালে চালু হওয়া ক্রাউলিং পেগ বিনিময় হার ব্যবস্থার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এর মাধ্যমে বিনিময় হারকে আরও নমনীয় করা এবং বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
অন্যদিকে, শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতের জন্য কিছুটা স্বস্তি তৈরি করছে। আইএমএফ-এর জানুয়ারির মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, চলতি হিসাবের উন্নতির সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তবে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তার কারণে বৈদেশিক খাতের ওপর চাপ পুরোপুরি কমেনি।
নতুন আইএমএফ কর্মসূচির আকার এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আইএমএফ জানিয়েছে, কর্মসূচির সম্ভাব্য অর্থের পরিমাণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কার নিয়ে আগামী মাসগুলোতে বিস্তারিত আলোচনা হবে। এরপর একটি স্টাফ-লেভেল এগ্রিমেন্ট হলে তা আইএমএফ-এর নির্বাহী বোর্ডে উপস্থাপন করা হবে।
আইএমএফ-এর যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক জুলি কোজ্যাক জুনে এক ব্রিফিংয়ে বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আগের কর্মসূচির সময়ের তুলনায় পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার ও সংস্কার পরিকল্পনাকে ভিত্তি করে নতুন কর্মসূচি তৈরি করাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
এর অর্থ হলো, নতুন কর্মসূচি কেবল অর্থায়ন পাওয়ার একটি মাধ্যম হবে না; বরং বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার জন্য একটি বড় সংস্কার কাঠামো হিসেবেও কাজ করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে আইএমএফ-এর সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন কর্মসূচির শর্তগুলো বাস্তবসম্মতভাবে বাস্তবায়ন করা। রাজস্ব বাড়ানো, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিময় হার ব্যবস্থার সংস্কার এবং সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ একই সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।
একই সঙ্গে সংস্কারের সামাজিক প্রভাবও বিবেচনায় রাখতে হবে। কর ও ভর্তুকি ব্যবস্থায় পরিবর্তন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আইএমএফ-এর দৃষ্টিতে বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য শুধু সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনলেই হবে না; প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো, সুশাসন ও স্বচ্ছতা শক্তিশালী করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতির বহুমুখীকরণেও অগ্রগতি করতে হবে।
সব মিলিয়ে, নতুন আইএমএফ কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। নতুন অর্থায়ন বৈদেশিক লেনদেন ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল নির্ভর করবে সংস্কারগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপর। রাজস্ব ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে পারলে নতুন কর্মসূচি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
