বিশ্ব শরণার্থী দিবস ২০২৬
রোহিঙ্গা সংকট, জাতীয় বাজেট এবং বিপন্ন খাদ্য অধিকার

২০ জুন বিশ্ব শরণার্থী দিবস। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর চরম নির্যাতন ও জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। বর্তমানে এই সংকট নবম বছরে পদার্পণ করেছে এবং এটি বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশের কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্প এবং ভাসানচরে বর্তমানে প্রায় ১.৩ মিলিয়ন (১৩ লাখ) জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক বা রোহিঙ্গা অবস্থান করছে, যা এটিকে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী বসতিতে পরিণত করেছে ।
এবারের বিশ্ব শরণার্থী দিবস এমন একটি সময়ে পালিত হচ্ছে যখন বৈশ্বিক তহবিলের তীব্র সংকট এবং বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনীতির ওপর এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান চাপ প্রকট আকার ধারণ করেছে। একইসাথে, ক্যাম্পগুলোতে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার, বিশেষ করে 'খাদ্য অধিকার' চরম হুমকির মুখে পড়েছে। বিগত বছরের বাজেট, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা হ্রাসের এই প্রেক্ষাপটে, রোহিঙ্গা সংকটের বর্তমান চিত্র ও ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গভীর পর্যালোচনা এখন সময়ের দাবি।
বাজেটের আয়নায় রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনা: অতীত ও বর্তমান একটি দেশের জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং এটি সরকারের নীতি, অগ্রাধিকার ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। বাংলাদেশ সরকার তার সীমিত সম্পদ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১০ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৬৯ কোটি টাকা। এই বাজেট বৃদ্ধির একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হলো দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ১১ লাখেরও বেশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা।
তবে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ভার বহন করতে গিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ছে। উদাহরণস্বরূপ, কক্সবাজারের ওপর চাপ কমাতে বিগত সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৩৫ কোটি ডলার) ব্যয় করে ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের জন্য একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছিল কিন্তু এই স্থানান্তর প্রক্রিয়াটি বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের মূল ক্যাম্পগুলোর তুলনায় ভাসানচরে মানবিক কার্যক্রম পরিচালনার ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। এছাড়া, সেখানে নিয়মিত যাতায়াত ব্যবস্থার অভাব এবং জীবিকার সুযোগ না থাকায় অনেক রোহিঙ্গা স্বেচ্ছায় সেখানে যেতে আগ্রহী নয় । বর্তমানে ভাসানচরে প্রায় ২৯ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছে এবং প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা ইতিমধ্যে সেখান থেকে কক্সবাজারে ফিরে এসেছে। অতিরিক্ত ব্যয় এবং প্রকল্পের অকার্যকারিতার কথা বিবেচনা করে বর্তমান সরকার ভাসানচরে নতুন করে রোহিঙ্গা স্থানান্তর প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, কেবল অবকাঠামো নির্মাণ করলেই সংকটের সমাধান হয় না; দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।
ক্যাম্পের ভেতরের মানুষের বেঁচে থাকার সবচেয়ে মৌলিক অধিকার হলো খাদ্য। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা বর্তমানে একটি নীরব মহামারীতে রূপ নিয়েছে। জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের (JRP) তথ্য অনুযায়ী, ৯৫ শতাংশ রোহিঙ্গা পরিবার মাঝারি থেকে চরম মাত্রায় অরক্ষিত এবং তারা সম্পূর্ণভাবে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, মাত্র ৬ শতাংশ রোহিঙ্গা পরিবারের গ্রহণযোগ্য মাত্রায় খাদ্য গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে সবচেয়ে বেশি ভুগছে শিশু ও নারীরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, কোনো জনগোষ্ঠীর অপুষ্টির হার ১৫ শতাংশ ছাড়ালে তা জরুরি অবস্থা হিসেবে গণ্য হয়, অথচ রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এই হার অনেক আগেই বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ক্যাম্পগুলোতে ২৫ শতাংশেরও বেশি শিশু অপুষ্টির শিকার এবং ১২ শতাংশেরও বেশি শিশু মারাত্মক খর্বকায়তায় ভুগছে, যা মূলত দীর্ঘমেয়াদী অনাহার ও অপুষ্টির ফল। খাদ্যের অভাবে মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানোর ক্ষমতা কমে যাচ্ছে, ফলে ৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে অপুষ্টির হার প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং প্রায় ৬০ শতাংশ রোহিঙ্গা শিশু দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির শিকার।
এই খাদ্য সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর। প্রতি বর্গ কিলোমিটারে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ এই ক্যাম্পগুলোতে পুষ্টিহীনতার কারণে সহজেই সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে। একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১০.৩ শতাংশ রোহিঙ্গা জানিয়েছেন যে তারা প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ ৮০ শতাংশেরও বেশি স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চনার ঘটনা ঘটছে ডায়রিয়ার মতো তীব্র অসুস্থতার ক্ষেত্রে। পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন এবং পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবই এই রোগের প্রধান কারণ।
আন্তর্জাতিক তহবিলের পতন: খাদের কিনারে মানবিক সহায়তা রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও অন্যান্য অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক তহবিলের ভয়াবহ পতন। ২০২৬ সালের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (JRP) অনুযায়ী, ১.২৫ মিলিয়ন রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় ৩ লাখ ৭ হাজার বাংলাদেশিসহ মোট ১.৫৬ মিলিয়ন মানুষের সহায়তার জন্য ৭১০.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের আবেদন করা হয়েছে। যা গত ২০২৫ সালের ৯৬৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের চাহিদার তুলনায় ২৬ শতাংশ কম।
তহবিলের এই ঘাটতি ক্যাম্পের সার্বিক অবস্থার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। স্বাস্থ্য, খাদ্য ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। খাদ্য ও ত্রাণ সহায়তা কমে যাওয়ার ফলে অনেক পরিবার বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছে। খাদ্যাভাব ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে যুবসমাজের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। ক্যাম্পের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩২ শতাংশই যুবক। কর্মসংস্থান ও খাদ্যের অভাবে এই তরুণ সমাজ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। ফলস্বরূপ, ক্যাম্পে বাল্যবিবাহ, শিশু পাচার, নারী নির্যাতন (GBV) এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা জোরপূর্বক নিয়োগের মতো নেতিবাচক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এছাড়া, বাংলাদেশে ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ১৫.৪ মিলিয়ন (১ কোটি ৫৪ লাখ) মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হয়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে আরও প্রকট হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশ, যারা নিজেদের নাগরিকদের খাদ্য ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে প্রতিনিয়ত লড়াই করছে, তাদের পক্ষে আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই বিশাল শরণার্থী জনগোষ্ঠীর ভার বহন করা অসম্ভব।
নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তহবিল হ্রাসের কারণে ক্যাম্পের ভেতরের সামাজিক কাঠামো যেমন ভেঙে পড়ছে, তেমনি তা ক্যাম্পের বাইরের পরিবেশ ও বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি তৈরি করছে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, বিশেষ করে আরাকান আর্মির সাথে জান্তা সরকারের চলমান যুদ্ধের কারণে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত নতুন সরকার এই প্রত্যাবাসন নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। মিয়ানমারে চলমান এই সহিংসতার কারণে সীমান্ত দিয়ে এখনও অনুপ্রবেশের চেষ্টা চলছে এবং নতুন করে আগত রোহিঙ্গারা আরও বেশি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।
ভবিষ্যৎ করণীয়: এই বাস্তবতাকে স্বীকার করতে হবে যে, রোহিঙ্গা সংকট কেবল বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়। বাংলাদেশ মানবিকতার খাতিরে তাদের সীমান্ত খুলে দিয়েছিল এবং বিগত বছরগুলোতে জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশ এই খাতে ব্যয় করে চলেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ এখন ইউক্রেন বা গাজার মতো অন্যান্য বৈশ্বিক সংকটের দিকে সরে যাওয়ায়, রোহিঙ্গারা 'ভুলে যাওয়া এক জনগোষ্ঠীতে' পরিণত হতে চলেছে।
বাজেট কাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশ সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বরাদ্দ বাড়িয়ে তার সদিচ্ছার প্রমাণ দিয়েছে। কিন্তু বিপুল সংখ্যক মানুষের খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করা, শিশুদের অপুষ্টির হাত থেকে বাঁচানো এবং ক্যাম্পের নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য এই বরাদ্দ কখনোই যথেষ্ট নয়।
এই মানবিক বিপর্যয় রোধে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি:
১. আন্তর্জাতিক তহবিল বৃদ্ধি: দাতা সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের (JRP 2026) ৭১০.৫ মিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এগিয়ে আসতে হবে। খাদ্য সহায়তা হ্রাস কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
২. খাদ্য ও পুষ্টি অধিকার নিশ্চিতকরণ: শিশুদের অপুষ্টি এবং স্টান্টিং রোধে ক্যাম্পগুলোতে বিশেষ পুষ্টি কার্যক্রম ও মায়েদের জন্য সহায়তা বৃদ্ধি করতে হবে।
৩. টেকসই প্রত্যাবাসন: মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, সম্মানজনক ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনই এই সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান। এর জন্য মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখতে হবে।
৪. দায়িত্বের সুষম বণ্টন: বাংলাদেশ এককভাবে এই বোঝা আর টানতে পারবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কেবল ত্রাণ দিয়ে নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে হবে।
বিশ্ব শরণার্থী দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রতিটি মানুষের সম্মানজনক জীবনযাপন ও খাদ্য লাভের অধিকার রয়েছে। রোহিঙ্গা শিশুদের অপুষ্টির শিকার হয়ে ধুঁকে ধুঁকে মরা বা বেঁচে থাকার তাগিদে অপরাধের দিকে পা বাড়ানো কোনোভাবেই আধুনিক বিশ্বের কাম্য হতে পারে না। এই সংকট সমাধানে বিশ্ব বিবেককে আরও একবার জাগ্রত হতে হবে। লেখক: নুরে আলম সিদ্দিকী, মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশন অফিসার, বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক–খানি।
