উত্তাল সমুদ্রের বিস্তারে বাড়ছে উপকূলবাসীর শঙ্কা

মো. আশরাফুল ইসলাম
মো. আশরাফুল ইসলাম
প্রকাশিত: জুন ২৫, ২০২৬ ১৮:৫৮:৩৭

একসময় জীবিকা, বাণিজ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত সমুদ্র এখন বিশ্বের বহু উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের কাছে উদ্বেগের আরেক নাম হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন জলোচ্ছ্বাস, উপকূল ভাঙন এবং লবণাক্ততার বিস্তার বহু জনপদকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতির এই পরিবর্তন কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা বদলে দিচ্ছে না, মানুষের জীবনযাত্রা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।

জলবায়ু বিজ্ঞানী ডক্টর রাশেদা মাহিন জানান, বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে এবং সমুদ্রের পানি উষ্ণ হয়ে আয়তনে প্রসারিত হচ্ছে। তিনি বলেন, “সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির হার গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে ক্ষয়, বন্যা ও ভূমি হারানোর প্রবণতা বাড়ছে।” তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকে বহু নিম্নাঞ্চল স্থায়ীভাবে পানির নিচে চলে যেতে পারে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে এই প্রভাব আরও স্পষ্ট। সাতক্ষীরা, ভোলা, কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় নদী ও সাগরের আগ্রাসনে বসতভিটা হারানোর ঘটনা বাড়ছে। ভোলার বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেন, “যেখানে আগে ধানক্ষেত ছিল, এখন সেখানে শুধু পানি। কয়েকবার বাড়ি সরিয়েছি, কিন্তু নদী থামছে না।” পটুয়াখালীর গৃহিণী রোকেয়া বেগম জানান, “জোয়ারের পানি আগের চেয়ে অনেক ভেতরে আসে। পানির লবণ বেড়ে যাওয়ায় রান্না আর চাষাবাদ দুটোই কঠিন হয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি শুধু ভূমি হারানোর ঝুঁকি তৈরি করছে না, এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে খাদ্য ও পানির সংকটও। কৃষিজমিতে লবণাক্ততা বাড়ায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে। মৎস্যসম্পদেও পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে, কারণ অনেক মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল বদলে যাচ্ছে। পরিবেশ গবেষক ডক্টর সায়েম কবীর বলেন, “উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য এটি বহুমাত্রিক সংকট। তারা একদিকে জমি হারাচ্ছে, অন্যদিকে জীবিকার উৎসও সংকুচিত হচ্ছে।”

উপকূলীয় দুর্যোগের তীব্রতা বৃদ্ধির ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। সুপেয় পানির সংকট, পানিবাহিত রোগ এবং লবণাক্ততার কারণে উচ্চ রক্তচাপ ও চর্মরোগের প্রবণতা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ডক্টর নুসরাত জাহান বলেন, “উপকূলের মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে আগে ও সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভব করছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

সাধারণ মানুষের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কক্সবাজারের জেলে মোহাম্মদ ইলিয়াস বলেন, “আগে সাগরকে জীবিকার জায়গা মনে হতো, এখন ভয় লাগে। কখন ঝড় আসে, কখন পানি বাড়ে বোঝা যায় না।” খুলনার কলেজশিক্ষার্থী মুনতাহা ইসলাম মনে করেন, “আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বইয়ে পড়েছি, কিন্তু এখন নিজেরাই বাস্তবে দেখছি। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় হওয়াটা স্বাভাবিক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন, ম্যানগ্রোভ বন সম্প্রসারণ, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, লবণসহনশীল ফসল উদ্ভাবন এবং পুনর্বাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছেন তাঁরা। পাশাপাশি বৈশ্বিক পর্যায়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ আরও জোরদার না হলে দীর্ঘমেয়াদে সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে।

পরিবেশবিদ ডক্টর মাহমুদুল আরেফিন বলেন, “সমুদ্র আমাদের শত্রু নয়, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এর আচরণ বদলে যাচ্ছে। মানুষ যদি প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করে, প্রকৃতিও তার প্রতিক্রিয়া দেখাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, উপকূলের পরিবর্তিত বাস্তবতা মানবজাতিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। উত্তাল সমুদ্রের বিস্তার এখন শুধু প্রাকৃতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত নয়, বরং টিকে থাকার লড়াইয়েরও প্রতীক। প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে না পারলে ভবিষ্যতের পৃথিবী আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।