ঋতুচক্রের অস্থিরতায় খাদ্য উৎপাদনে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পৃথিবীর ঋতুচক্রে যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি উৎপাদনে। কখনো অকাল বৃষ্টি, কখনো দীর্ঘ খরা, আবার কখনো অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ-এসব কারণে ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়ার এই অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর দেশগুলোতে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষিবিজ্ঞানী ডক্টর সুমাইয়া রহমান জানান, একসময় যে মৌসুমে নির্দিষ্ট ধরনের ফসল ভালো হতো, এখন সেই পূর্বাভাস আর কার্যকর থাকছে না। তিনি বলেন, “ঋতুচক্রের পরিবর্তনের কারণে বীজ বপন, সেচ এবং ফসল কাটার সময়সূচি এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। এতে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।” তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করতে পারে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকেরা ইতোমধ্যে এই পরিবর্তনের প্রভাব টের পাচ্ছেন। রাজশাহীর কৃষক সোহেল রানা বলেন, “আগে কখন বৃষ্টি হবে তা কিছুটা আন্দাজ করা যেত। এখন বীজ বপনের পর দীর্ঘদিন বৃষ্টি নেই, আবার হঠাৎ অতিবৃষ্টিতে জমি ডুবে যায়।” দিনাজপুরের কৃষক জয়নাল আবেদীন জানান, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ধান ও গমের ফলন আগের তুলনায় কমে গেছে। তিনি বলেন, “মাটি আগের মতো উর্বর মনে হয় না। খরচ বাড়ছে, কিন্তু ফলন সেই তুলনায় বাড়ছে না।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ফসলের বৃদ্ধির সময় কমিয়ে দেয় এবং পরাগায়নের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ধান, গম, ভুট্টা ও শাকসবজির মতো প্রধান খাদ্যশস্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কৃষি গবেষক ডক্টর রাশেদুল করিম বলেন, “যখন তাপমাত্রা সহনীয় সীমার বাইরে চলে যায়, তখন ফসলের গুণগত মান ও উৎপাদন দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণও বেড়ে যায়।”
খাদ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, ফসলের উৎপাদন কমে গেলে এর প্রভাব কেবল কৃষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; পুরো অর্থনীতি এর চাপ অনুভব করে। বাজারে খাদ্যের সরবরাহ কমলে মূল্যবৃদ্ধি হয়, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তোলে। অর্থনীতিবিদ ডক্টর নাজমুল ইসলাম বলেন, “খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি সামাজিক বৈষম্য বাড়াতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষিকে জলবায়ু সহনশীল করে তুলতে হবে।”
সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। গাজীপুরের গৃহিণী রোকসানা বেগম বলেন, “সবজির দাম এত দ্রুত বাড়ে যে সংসার চালানো কঠিন হয়ে যায়। আগে মৌসুমে অনেক কিছু সস্তা পাওয়া যেত, এখন সেটাও হয় না।” বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সাবিহা নওরীন মনে করেন, “খাদ্য সংকট শুধু কৃষকের সমস্যা নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। তরুণদেরও পরিবেশ ও কৃষি নিয়ে সচেতন হতে হবে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন কৃষি প্রযুক্তি ও অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা জরুরি। জলবায়ু–সহনশীল বীজ উদ্ভাবন, আধুনিক সেচব্যবস্থা, আবহাওয়া–ভিত্তিক কৃষি পরামর্শ এবং ফসলের বহুমুখীকরণকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন গবেষকেরা। কৃষি সম্প্রসারণ বিশেষজ্ঞ ডক্টর মাহবুব হোসেন বলেন, “কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কৃষকের হাতে সময়মতো তথ্য পৌঁছাতে পারলে ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।”
সরকারি পর্যায়ে কৃষি সহায়তা বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য সহজ ঋণ এবং ফসল বীমার মতো উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করছেন নীতিনির্ধারকেরা। একই সঙ্গে বৃক্ষরোপণ, পানি সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি জনপ্রিয় করাও জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা।
বিশ্লেষকদের মতে, ঋতুচক্রের অস্থিরতায় কমে যাওয়া ফসলের ফলন শুধু কৃষি খাতের সমস্যা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে খাদ্য সংকট আরও তীব্র হতে পারে। প্রকৃতির পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারলেই কেবল টেকসই কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
