লোনা পানির আগ্রাসনে হুমকির মুখে উপকূলীয় ধান চাষ

মো. আশরাফুল ইসলাম
মো. আশরাফুল ইসলাম
প্রকাশিত: জুলাই ৬, ২০২৬ ১৬:৪১:৫৬

উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার ক্রমবর্ধমান বিস্তার ধান উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়ুপরবর্তী জলোচ্ছ্বাস এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন-সব মিলিয়ে লোনা পানি ধীরে ধীরে কৃষিজমির ভেতরে প্রবেশ করছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশের খাদ্য উৎপাদনের একটি বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়বে।

কৃষিবিজ্ঞানী ডক্টর নাসিরা খাতুন জানান, লবণাক্ততা মাটির উর্বরতা নষ্ট করে এবং ধানের বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। তিনি বলেন, “ধান একটি সংবেদনশীল ফসল। নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি লবণাক্ততা হলে গাছের শিকড় ঠিকভাবে পানি ও পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে না। ফলে ফলন কমে যায় বা অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হয়ে যায়।” তাঁর মতে, উপকূলীয় অঞ্চলে এই সমস্যা এখন আর মৌসুমভিত্তিক নয়, বরং স্থায়ী সংকটে রূপ নিচ্ছে।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকেরা এই বাস্তবতা প্রতিদিন অনুভব করছেন। সাতক্ষীরার কৃষক মোহাম্মদ হান্নান বলেন, “আগে যে জমিতে দুইবার ধান হতো, এখন একবারও ভালোভাবে ফলন পাওয়া যায় না। পানি লোনা হয়ে গেছে।” পটুয়াখালীর কৃষক রাশেদুল ইসলাম জানান, জলোচ্ছ্বাসের পর জমিতে লবণাক্ত পানি থেকে যায়, যা অনেক দিন পর্যন্ত চাষাবাদের অযোগ্য করে রাখে। তিনি বলেন, “আমরা জমিতে বীজ ফেলি, কিন্তু গাছ ঠিকভাবে বড় হয় না।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, লবণাক্ততার প্রভাব শুধু ধান উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি পুরো কৃষি অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কৃষি অর্থনীতিবিদ ডক্টর ফারহানা হক বলেন, “লবণাক্ততা বাড়ার কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু আয় কমছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে জমি অনাবাদি রেখে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।”

জনস্বাস্থ্য ও পানির সংকটও এই সমস্যার সঙ্গে যুক্ত। উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির উৎসে লবণাক্ততা প্রবেশ করায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনও প্রভাবিত হচ্ছে। পরিবেশ গবেষক ডক্টর মাহবুবুর রহমান বলেন, “লবণাক্ত পানি শুধু কৃষিজমিই নষ্ট করছে না, মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।”

সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়ছে। খুলনার গৃহিণী সালমা বেগম বলেন, “আমরা আগে নিজের জমির ধান খেতাম, এখন অনেক সময় বাজার থেকে কিনতে হয়। জমি থাকলেও তা আর আগের মতো ফল দেয় না।” বরগুনার শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ মনে করেন, “লবণাক্ততা শুধু কৃষকের সমস্যা নয়, এটি পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সমস্যা।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট মোকাবিলায় জলবায়ু–সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন ও বিস্তার অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান লবণসহনশীল ধানের নতুন জাত নিয়ে কাজ করছে। কৃষি গবেষক ডক্টর সাইফুল ইসলাম বলেন, “উপকূলীয় এলাকায় টেকসই কৃষির জন্য নতুন জাত, উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা এবং মাটির লবণ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি একসঙ্গে ব্যবহার করতে হবে।”

এছাড়া বাঁধ উন্নয়ন, মিঠা পানির সংরক্ষণ, খাল–নদী পুনঃখনন এবং বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার ওপর জোর দিচ্ছেন নীতিনির্ধারকেরা। তাদের মতে, শুধু কৃষি প্রযুক্তি নয়, সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনাই এই সংকট মোকাবিলার মূল চাবিকাঠি।

বিশ্লেষকদের মতে, লোনা পানির আগ্রাসন উপকূলীয় কৃষিকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ধান উৎপাদন কমে গিয়ে খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই এখনই বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে উপকূলীয় কৃষিকে রক্ষা করা জরুরি হয়ে উঠেছে।