ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন
সুন্দরবন ও টাঙ্গাইল বন বিভাগে লুণ্ঠন শেষে এবার লক্ষ্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, শত কোটি টাকার টেন্ডার জালিয়াতি, বন্যপ্রাণী পাচার ও সরকারি সম্পদ আত্মসাতের এক নজিরবিহীন দুর্নীতির খতিয়ান উন্মোচিত হয়েছে। বর্তমানে এই কর্মকর্তার বিশাল অবৈধ সম্পদের খোঁজে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গভীর তদন্তে নেমেছে এবং একাধিক গুরুতর অভিযোগের সত্যতা পেয়ে মামলা দায়েরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, বিগত সরকারের পতনের পর এবং একাধিক গণমাধ্যমে তার দুর্নীতির খবর প্রকাশের পরও এই কর্মকর্তা দমে যাননি, বরং মোটা অঙ্কের অর্থ ছড়িয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে 'প্রাইজ পোস্টিং' বাগিয়ে নিতে বন অধিদপ্তরের একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে জোর লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন, যা নিয়ে সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, সুন্দরবনে থাকাকালীন ড. নাসেরের দুর্নীতির মূল সহযোগী ছিলেন প্রধান সহকারী কামরুল এবং তার ভায়রা ভাই পলাশ নামক এক ঠিকাদার। নিয়ম অনুযায়ী উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কাজ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, কামরুলের কারসাজিতে ভায়রা ভাই পলাশের কয়েকটি লাইসেন্স ব্যবহার করে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন ও পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ কোটেশনের মাধ্যমে ভাগিয়ে নেওয়া হয়। ঠিকাদার পলাশকে মাত্র ৫ শতাংশ কমিশন দিয়ে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে বাকি কোটি কোটি টাকা ডিএফও ও তার চক্র আত্মসাৎ করেছে। এই সিন্ডিকেটের বাইরে কোনো পুরোনো ও বৈধ ঠিকাদার কাজ পেলে তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি ও হয়রানি করে বিতাড়িত করা হতো। অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও চরম অনিয়ম করা হয়েছে। আন্দার মানিক, বজবজা, গেওয়াখালী, ভোমরখালী, কাঠেশ্বর, টেংরাখালী, শরবৎ খালি, নলিয়ান রেঞ্জ সদর, হড্ডা, শাকবাড়িয়া এবং কলাগাছিয়া টহল ফাঁড়ির ভবন ও অন্যান্য নির্মাণ কাজে সুন্দরবনের নিষিদ্ধ ও লবণাক্ত নদীর পানি ও বালু ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি নলিয়ান পুকুর ঘাটের সিঁড়ি নির্মাণে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহার করার মতো ভয়ানক জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, যেখানে এস্টিমেটের মাত্র ৫০ শতাংশ সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া রাসেল পার্কের বালু ভরাটের ৪০ শতাংশ কাজই করা হয়েছে পার্শ্ববর্তী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে। বনায়ন ও পার্কের এস্টিমেটে ভালো মানের চারার কথা উল্লেখ থাকলেও নামমাত্র মূল্যের অতি নিম্নমানের চারা রোপণ করা হয়েছে, এবং চারার গোড়ায় কোনো সার প্রয়োগ না করেই এবং কৃত্রিম সেচ না দিয়ে সরকারি তহবিল লুট করা হয়েছে।
সুন্দরবনের নিরাপত্তার জন্য কেনা বা মেরামত করা জলযানগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশই বর্তমানে অকেজো, কারণ স্টাফদের দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করিয়ে সরকারি ভাউচারের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা পকেটেস্থ করা হতো। ডলফিন প্রজেক্টের ক্ষেত্রেও কোনো বাস্তব কাজ না করে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে পুরো অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। এমনকি বনের বাঘ গণনার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক প্রকল্পের বরাদ্দের মাত্র ৩০ শতাংশের ক্যামেরা কেনা হয়। এই বিশাল চুরির ঘটনা ধামাচাপা দিতে বনের নিরীহ জেলেদের আটকে রেখে মিথ্যা মামলায় চালান দেওয়ার মতো নাটক সাজানো হয়েছিল। অবকাঠামো, জেটি ও ফুটরেল নির্মাণের নামে সুন্দরবনের সংরক্ষিত ও নিষিদ্ধ এলাকার মূল্যবান কাঠ বেআইনিভাবে কেটে ব্যবহার করা হয়েছে। করাতকলে চেরাইয়ের সময় এই কাঠ গড়ইখালী নামক স্থানে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে তা ছাড়িয়ে আনা হয় এবং বড় একটি অংশ কালোবাজারে বিক্রি করা হয়। জলযানের জন্য বরাদ্দকৃত হাজার হাজার লিটার সরকারি জ্বালানি তেল বিক্রি করে দিয়ে ক্যাম্প ও স্টেশন কর্মকর্তাদের জোরপূর্বক লগবইয়ে স্বাক্ষর করাতে বাধ্য করা হতো। এর বিনিময়ে ওই কর্মকর্তাদের বনে অবৈধভাবে জ্বালানি কাঠ পাচার ও নিষিদ্ধ অভয়ারণ্যে বিষ দিয়ে মাছ শিকারের সুযোগ করে দেওয়া হতো। বন অপরাধ দমনে যেখানে ফৌজদারি বিধি অনুযায়ী পিওআর মামলা করার নিয়ম, সেখানে লাখ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে আসামি ও ট্রলার ছেড়ে দিয়ে লঘু ধারার সিওআর মামলা রুজু করা হতো, যা সম্পূর্ণ বেআইনি। ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে স্মার্ট টহল দল কর্তৃক বুড়িগোয়ালিনী ও দোবেকী টহল ফাঁড়ির মধ্যবর্তী এলাকা থেকে সুপারি ও কোটি টাকার অবৈধ কাপড় বোঝাই দুটি বড় ট্রলার জব্দের পর, ডিএফও, এসিএফ ও স্টেশন অফিসাররা মিলে ৬০ লক্ষ টাকার রফা করেন; যার ফলে কাপড় ভর্তি ট্রলারটি সম্পূর্ণ গায়েব করে দেওয়া হয় এবং সুপারি ভর্তি ট্রলারটিকে সিওআর করিয়ে ১৫ লক্ষ টাকায় রফা করা হয়।
এই বিশাল সিন্ডিকেটের মাসোহারা আদায়ের পদ্ধতিও ছিল প্রাতিষ্ঠানিক। প্রতি মাসে প্রতিটি ক্যাম্প কর্মকর্তার কাছ থেকে ১০ হাজার এবং স্টেশন অফিসারের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা নির্ধারিত ঘুষ নেওয়া হতো। কর্মকর্তা ও বনপ্রহরীদের পছন্দসই ও লোভনীয় জায়গায় বদলির জন্য ২ লক্ষ থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত রেট নির্ধারিত ছিল। গোলপাতা মৌসুমে নৌকা প্রতি বিএলসি নবায়নের জন্য ৫ হাজার টাকা করে ঘুষ নেওয়া হতো কোনো রকম পরিমাপ ছাড়াই, যার আড়ালে প্রতিটি নৌকায় ১৫০০ মণ গোলপাতা এবং ৩০০টি মূল্যবান গেওয়া গাছ পাচার হতো। এভাবে আইন বহির্ভূত অফিশিয়াল পারমিশনের নামে নলিয়ান ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ থেকে সাড়ে তিন লক্ষাধিক গেওয়া গাছ উজাড় করা হয়েছে। ড. নাসের নিজে সরকারি কর্মচারী হয়েও ক্ষমতার দাপটে অধস্তনদের দিয়ে ব্যক্তিগত ঠিকাদারি ব্যবসা চালাতেন, যার অকাট্য প্রমাণ মেলে ২০২২ সালের ২ অক্টোবর রূপসা ব্রিজের কাছে নির্মাণ সামগ্রী বোঝাই একটি সরকারি ট্রলার ডুবির ঘটনায়, যেখানে মাহতাব নামের এক বনকর্মী প্রাণ হারান এবং ঘটনাটি খুলনার আঞ্চলিক পত্রিকায় চাঞ্চল্য তৈরি করে। এছাড়া খুলনার রহিম নগর নার্সারিতে সাবমার্সিবল টিউবওয়েল বসানোর নামে সাধারণ টিউবওয়েল বসিয়ে ডিপ টিউবওয়েলের ভুয়া ভাউচার পাস করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ড. নাসেরের এই সিন্ডিকেটের সংগৃহীত ঘুষের টাকার ২০ শতাংশ নিয়মিত পৌঁছাত তৎকালীন সিএফ মিহির কুমার দো এর কাছে, যিনি ড. নাসেরের যাবতীয় অপরাধের ছাতা হিসেবে কাজ করতেন এবং তার সুপারিশে স্থানীয় একজন সংসদ সদস্যকে ভুল বুঝিয়ে ডিএফও-র পক্ষে ডিও লেটার ইস্যু করানো হয়েছিল। সিএফ-এর প্রচ্ছন্ন মদদেই ড. নাসেরের সামান্যতম বিরোধিতা করায় একজন সৎ কর্মচারীকে বিনা অপরাধে চাকরিচ্যুত করা হয়, অথচ হরিণ শিকার করে ভোজ খাওয়া অপরাধীদের মোটা অঙ্কের বিনিময়ে খালাস দেওয়া হয়েছে। ড. নাসেরের নিজেরই অবৈধ সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫০ কোটি টাকা, যা তার স্ত্রী ও সন্তানের নামে বিভিন্ন ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্রে ছড়িয়ে আছে। বিগত ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর ক্ষুব্ধ বাওয়ালী, মৌয়ালী ও স্থানীয় জেলেরা সুন্দরবন ডিভিশন অফিসে ঢুকে এই দুর্নীতিবাজ ডিএফও-কে গণধোলাই ও অপদস্ত করে। পরবর্তীতে তিনি পরিচালন ও সুফল প্রকল্পের বাগান ও রক্ষণাবেক্ষণ এর অর্থ আত্মসাৎ, সামাজিক বনায়নের টেন্ডার এ জালিয়াতি ও বনের জমি বড় বড় শিল্পগ্রুপের কাছে ইজারা দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মিশন জারি রাখতে সাবেক এক উপদেষ্টার স্বামীকে ৪০ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে টাঙ্গাইল বন বিভাগে পোস্টিং নেন। সেখানেও তার বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য ও অর্থ লোপাটের পাহাড়সম অভিযোগ ওঠার পর বর্তমানে তিনি আইনগত শাস্তি থেকে বাঁচতে এবং পুনরায় অবৈধ আয়ের স্বর্গরাজ্য গড়তে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগে পদায়নের জন্য সরকারের উচ্চমহলে দৌড়ঝাঁপ করছেন, যা বন অধিদপ্তরের ডিএফওদের কধ্যে চরম সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
