গঙ্গা চুক্তি ও পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পে নজর সংসদীয় কমিটির

গঙ্গা চুক্তির ধারাবাহিকতা, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প, নদীভাঙন প্রতিরোধ ও পুনঃখনন এবং সীমান্ত এলাকার পোল্ডার পুনর্বাসনসহ পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ একাধিক বিষয়ে নজর দিয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি।
বিশেষ করে গঙ্গা চুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ জড়িত থাকার বিষয়টি কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তবে, বিদ্যমান গঙ্গা চুক্তির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, নাকি নতুন করে চুক্তি নবায়ন করা হবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ সংক্রান্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়েছে। গত ১৪ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনে কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলনের সভাপতিত্বে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং এর আওতাধীন বিভিন্ন সংস্থার চলমান কার্যক্রম ও প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়।
গঙ্গা চুক্তির দিকে নজর
পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর মধ্যে গঙ্গা অন্যতম। এ নদীর পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে দেশের কৃষি, সেচ, নদী ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থের বিষয়টিও যুক্ত। ফলে গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আলোচনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বৈঠকে গঙ্গা চুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ জড়িত থাকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। বিদ্যমান চুক্তির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, নাকি নতুন করে চুক্তি নবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানানো হয়। তবে, এ বিষয়ে কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
কমিটির বৈঠকে বিষয়টি আলোচনায় আসার মধ্য দিয়ে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আন্তঃসীমান্ত নদীর বিষয়টি সংসদীয় নজরদারির আওতায় থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
ফেব্রুয়ারিতে পদ্মা ব্যারাজ উদ্বোধনের আশা
বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পও। প্রকল্পের অংশ হিসেবে আগামী ২৫ অক্টোবর পাবনার সুজানগরে কমিটির পরিদর্শন কার্যক্রমের বিষয়ে আলোচনা হয়। পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রকল্পের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখার বিষয়টি বৈঠকে উঠে আসে।
একই সঙ্গে কমিটি আশা প্রকাশ করেছে, ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প উদ্বোধন করা সম্ভব হবে। পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে কমিটির এমন আগ্রহের ফলে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও পরবর্তী কার্যক্রম সংসদীয় পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকছে বলে সংশ্লিষ্ট বৈঠকের আলোচনায় প্রতিফলিত হয়েছে।
নদীভাঙন প্রতিরোধে দুটি প্রকল্প
স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে জামালপুরের নদীভাঙন প্রতিরোধে নেওয়া দুটি প্রকল্পের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়। প্রথম বৈঠকে গৃহীত ‘জামালপুর জেলার ব্রহ্মপুত্র নদ এবং জিঞ্জিরাম নদীর ভাঙন প্রতিরোধ’ এবং ‘জামালপুর জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত যমুনা নদীর বামতীর, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ ও আলাই নদীর তীর প্রতিরক্ষা কাজ’ শীর্ষক প্রকল্প দুটি নিয়ে আলোচনা হয়।
নদীভাঙন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সম্পদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের মতো নদীগুলোর তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধে তীর সংরক্ষণ ও প্রতিরক্ষা কাজের বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ। সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এসব প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কাজের ওপর নজরদারি অব্যাহত রাখার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
বারনই নদী পুনঃখনন ও দখলমুক্তকরণ
রাজশাহী ও নাটোর জেলার অন্তর্গত বারনই নদী নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। ‘রাজশাহী ও নাটোর জেলার অন্তর্গত বারনই নদী পুনঃখনন, দূষণমুক্ত ও দখলমুক্তকরণ প্রকল্প’-এর প্রতিবেদন বৈঠকে উপস্থাপন করা হয়। নদী পুনঃখননের পাশাপাশি দূষণ ও দখলমুক্ত করার কার্যক্রমকে একই প্রকল্পের আওতায় রাখা হয়েছে। বৈঠকে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং নদীকেন্দ্রিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পুনঃখনন, দূষণমুক্তকরণ ও দখলমুক্তকরণ- তিনটি বিষয়ই প্রকল্পটির আলোচনায় রয়েছে।
নাফ নদীর পোল্ডার পুনর্বাসন
বৈঠকে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় নাফ নদী বরাবর পোল্ডার পুনর্বাসন প্রকল্পের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়। ‘কক্সবাজার জেলার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত নিরাপত্তা উন্নত করার জন্য উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় নাফ নদী বরাবর পোল্ডারসমূহ (৬৭/এ, ৬৭, ৬৭/বি এবং ৬৮) পুনর্বাসন প্রকল্প (২য় সংশোধিত)’-এর প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় নাফ নদীর তীরবর্তী এসব পোল্ডারের পুনর্বাসন প্রকল্পকে পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে। কমিটির বৈঠকে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে।
গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পেও নজর
বৈঠকে ‘গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন’ কার্যক্রমের প্রতিবেদনও উপস্থাপন করা হয়। এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতিও পর্যালোচনা করেছে কমিটি। গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের মতো দীর্ঘদিনের সেচ অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চলমান কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনার মাধ্যমে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন পরিস্থিতির ওপর সংসদীয় কমিটি নজর রাখছে। দ্বিতীয় বৈঠকের শুরুতে স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকের কার্যবিবরণী সংশোধনী সাপেক্ষে নিশ্চিত করা হয়। এরপর প্রথম বৈঠকে গৃহীত প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়। এতে কমিটির কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি আগের বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়।
বৈঠকে কমিটির সদস্য ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সংসদ সদস্য এ. ই. সুলতান মাহমুদ বাবু, সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম, সংসদ সদস্য মো. ফরিদুল কবীর তালুকদার, সংসদ সদস্য মো. ইজ্জত উল্লাহ, সংসদ সদস্য মো. অলি উল্লাহ এবং সংসদ সদস্য মো. মশিউর রহমান খান অংশ নেন।
এবিষয়ে কমিটির এক সদস্য জানান, দ্বিতীয় বৈঠকের আলোচনায় পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক একসঙ্গে উঠে এসেছে। একদিকে রয়েছে দেশের জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট গঙ্গা চুক্তি; অন্যদিকে রয়েছে পদ্মা ব্যারাজের মতো বড় প্রকল্প।
তিনি জানান, একই সঙ্গে নদীভাঙন প্রতিরোধ, নদী পুনঃখনন, দূষণ ও দখলমুক্তকরণ, সীমান্ত এলাকার পোল্ডার পুনর্বাসন এবং সেচ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসনের মতো বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। এতে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের চলমান কার্যক্রমের বিস্তৃত পরিসর এবং এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতির ওপর সংসদীয় কমিটির নজরদারির চিত্র পাওয়া যায়।
তিনি বলেন, বিশেষ করে গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও কার্যক্রম চলমান থাকার বিষয়টি বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়ে উঠেছে। আগামী ২৫ অক্টোবর সুজানগরে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প পরিদর্শন এবং ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পটির উদ্বোধনের প্রত্যাশা পানি সম্পদ খাতের চলমান কার্যক্রমে নতুন গুরুত্ব যোগ করেছে।
এবিষয়ে কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ শফিকুল হক মিলন বলেন, “দেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। গঙ্গা চুক্তি, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং নদী পুনঃখননসহ চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।” প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের স্বার্থ রক্ষা এবং পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
