চট্টগ্রামে সম্প্রীতির পরিবেশে প্রতিমা বিসর্জন

ধর্মের শিক্ষা প্রতিফলিত হোক কর্মেও: ডিসি জাহিদ

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
প্রকাশিত: অক্টোবর ২১, ২০২৬ ২০:৫১:২১

ধর্মের শিক্ষা শুধু উৎসব উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের কর্ম ও আচরণে প্রতিফলিত করার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেছেন, ধর্মের প্রকৃত সৌন্দর্য শান্তি ও মানবিকতায়। ধর্মের আদর্শ দৈনন্দিন জীবনে ধারণ করতে পারলেই ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন সার্থক হবে।

বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে বিজয়াদশমী উপলক্ষে প্রতিমা বিসর্জন কার্যক্রম পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন জেলা প্রশাসক। জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ধর্ম সব সময় চায়, পৃথিবীটা শান্তিতে থাকুক। আমরা ধর্ম পালন করি, উৎসব করি। কিন্তু আমরা যেন শুধু উৎসবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকি। ধর্মের আদর্শগুলো যদি আমাদের কর্মের মধ্যে প্রকাশ করতে পারি, তাহলে আমাদের এসব আয়োজন আরও সার্থক হবে।’

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এবার চট্টগ্রামে ২ হাজার ৫৯৩টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়েছে, যা দেশের জেলাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। গত বছরের তুলনায় জেলায় প্রায় ৪০০টি পূজামণ্ডপ বেড়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরে পূজা হয়েছে ২৭১টি মণ্ডপে। এসব মণ্ডপের অধিকাংশ প্রতিমা পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে বিসর্জন দেওয়া হয়। পূজা চলাকালে জেলার কোথাও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

এবারের দুর্গাপূজায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিত্র তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, বিভিন্ন পূজামণ্ডপে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পাশাপাশি মুসলিমসহ অন্য ধর্মের মানুষও উৎসবে অংশ নিয়েছেন। অনেকে পূজামণ্ডপ পাহারা দিয়েছেন, ভক্তদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করেছেন। তিনি বলেন, ‘উৎসবটি হয়তো সনাতনীদের, কিন্তু সেখানে মুসলিম ও অন্য ধর্মের লোকজন তাঁদের সঙ্গে বসে একসঙ্গে উৎসব উদযাপন করছেন, পাহারা দিচ্ছেন। এটাই আসলে আমাদের বাংলাদেশ।’

দুর্গাপূজা উপলক্ষে গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা, বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও অতীতে সহিংসতার শিকার এলাকার পূজামণ্ডপগুলো পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসন।

জেলা প্রশাসক বাঁশখালীর পশ্চিম চাম্বল বাংলাবাজার সর্বজনীন বুড়া কালী মন্দির, শ্রীশ্রী অদ্বৈতানন্দ ঋষিমঠ ও মিশন, সাধনপুর পল্লিমঙ্গল সমিতি এবং বাণীগ্রাম জগন্নাথধাম পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন।

জেলা প্রশাসন জানায়, অতীতে বাঁশখালীর পশ্চিম চাম্বল বাংলাবাজার জলদাশপাড়াসহ উপজেলার কয়েকটি মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল। এসব ঘটনায় অনেকে আহত হন এবং একাধিক মামলা হয়। সেই অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এবার এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পূজামণ্ডপগুলোতে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পুলিশ, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হয়।

বোয়ালখালীর ঐতিহাসিক মেধসমুনি আশ্রম ও লোহাগাড়ার প্রাচীন গুপ্তবাড়িসহ জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপও পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক। এসব সফরে আয়োজক ও ভক্তদের সঙ্গে কথা বলে নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করেন তিনি। এ ছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নারী পুণ্যার্থীদের শাড়ি উপহার এবং আর্থিকভাবে অসচ্ছল কয়েকটি পূজামণ্ডপে অনুদান দেওয়া হয়।

প্রতিমা বিসর্জনের তাৎপর্য তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, দুর্গাপূজার অন্যতম শিক্ষা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সমাজে শান্তি ও মঙ্গল প্রতিষ্ঠা। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে মানবিক সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করতে হবে। জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আজ প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাজ থেকে সব ধরনের অশুভ শক্তি দূরীভূত করে একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’

বাঁশখালীর প্রত্যন্ত জেলেপল্লি থেকে শুরু করে বোয়ালখালী ও লোহাগাড়ার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভক্তদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং অন্য ধর্মের মানুষের সহযোগিতা তাঁকে মুগ্ধ করেছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রামে দুর্গাপূজার অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশকে সবার উল্লেখ করে সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা একটি শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, একটি মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, একটি নিরাপদ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যেখানে আমি, আপনি এবং আপনার সন্তানেরা নিরাপদে থাকবেন।’ বিসর্জনস্থলে ভক্তদের বিপুল উপস্থিতি ও সুশৃঙ্খল আয়োজনের প্রশংসা করেন জেলা প্রশাসক। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন, পতেঙ্গা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহিদ ইসরাক এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের চট্টগ্রাম মহানগর শাখার নেতারা।

পূজার আয়োজন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে সহযোগিতা করায় পূজা উদযাপন কমিটি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান জেলা প্রশাসক। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রেখে মানবিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।